জি-২০ সম্মেলনে কার কতটা লাভ হলো?

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর মিলনমেলা হিসেবে সমধিক পরিচিত জি-২০ সম্মেলন। প্রতি বছর একবার করে বিশ্বের মোড়ল দেশগুলো এক জায়গায় জড়ো হয় এই সম্মেলনের সুবাদে। অর্থনীতি ও বাণিজ্য নিয়ে বৈঠকের পাশাপাশি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের অনেকেই এই সম্মেলনকে নিজেদের পুরনো বন্ধুত্বকে ঝালিয়ে নেয়া, নতুন সম্পর্ক তৈরি করা, বিরাজমান সম্পর্কের বাস্তব অবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন। সামষ্টিকভাবে জি-২০ তে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোই বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। পৃথিবীর মোট জাতীয় উত্পাদনের শতকরা ৮৫ ভাগ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের শতকরা ৮০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে এই জি-২০ ভুক্ত দেশগুলো। ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র দূরত্ব এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বিরোধকে সামনে রেখে শুরু হওয়া সম্মেলনের সাফল্য নিয়ে আগে থেকেই সংশয় ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যের সৌহার্দপূর্ণ বৈঠকের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির পরিবেশ ফেরার ইঙ্গিত মিলেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত বহুল প্রতীক্ষিত ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকটি বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে গত বছরই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ছাড়া বাকিরা একটা যৌথ ঘোষণায় রাজি হয়েছেন।

এ বছরের প্রথমভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ দানা বাধে। আর জুলাইতে এসে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝে চীনা পণ্যে নতুন শুল্ক কার্যকর করে ট্রাম্প প্রশাসন। চীন থেকে আমদানি করা ১ হাজার ৬শ কোটি ডলার মূল্যের পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক চালু করে যুক্তরাষ্ট্র। চীনও তাত্ক্ষণিকভাবে একই পরিমাণ মার্কিন পণ্যের ওপর একই হারে শুল্ক কার্যকর করে। দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ আরো ঘনীভূত হওয়ায় শঙ্কার মেঘ তেরি হয় বিশ্ব অর্থনীতিতেও। অর্থনীতিবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধে মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব বাড়বে। তবে এসব শঙ্কাকে পাশ কাটিয়ে বাণিজ্য যুদ্ধের ইতি টানার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের দুই প্রেসিডেন্ট। দুই নেতার মধ্যে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠক হয়েছে। চীনের টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, চীনের ওপর বাড়তি ট্যাক্স আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ১ জানুয়ারি থেকে অনেক পরিবর্তন আসতে পারে চলমান বাণিজ্য বিরোধের শুল্ক আরোপ প্রতিযোগিতায়ও। তবে এ সংক্রান্ত আলোচনা চলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ট্রাম্প। ইতোমধ্যে চীনের তরফ থেকে বাণিজ্য যুদ্ধের ইতি টানার ঘোষণাও এসেছে। বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম বৈঠকেই এক প্রকার সমাধানের সুর শোনা গেল দুই নেতার মুখ থেকে। এবারের জি-২০ সম্মেলনে ট্রাম্প-শি কিংবা ট্রাম্প-পুতিন দুটি হাই ভোল্টেজ বৈঠকের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছিল সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উপস্থিতিকে কীভাবে নেবেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যার পর পশ্চিমা নেতৃবৃন্দের মুখোমুখি হওয়াটা যুবরাজের জন্য ‘এসিড টেস্টের’ মতো ছিল। জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টসহ অনেকেই সৌদি যুবরাজের সমালোচনা করে আসছেন। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জামাল খাশোগিকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করা হলেও বারবারই সৌদি কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় যুবরাজের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করছে। সম্মেলন চলাকালেই ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, খাশোগির হত্যার সময় তার সহকারীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করেছেন যুবরাজ। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সাথে যুবরাজের এই সহকারীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এ খবরটি সৌদি যুবরাজের জন্য রীতিমতো বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। তবে যুবরাজ সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাতের সুযোগটাকে ব্যবহার করতে দুই দিন আগেই পৌঁছে যান আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ারসে। সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক না হলেও সৌজন্য বিনিময় হয়েছে। সৌদি যুবরাজের সাথে কথা হয়েছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সাথে সৌদি যুবরাজের কথোপকথন নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। যুবরাজ ফরাসি প্রেসিডেন্টকে বলেন, ‘চিন্তা করবেন না’। জবাবে তিনি যুবরাজকে বলেন, ‘আমি চিন্তিত। আপনি কখনোই আমার কথা শোনেননি। আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল’। জবাবে যুবরাজ বলতে থাকেন, ‘হ্যাঁ, আপনি আগেই বলেছিলেন। আমি অবশ্যই আপনার কথা শুনবো। ঠিক আছে, আমি বিষয়টি সামলাতে পারবো।’ থেরেসা মের সাথে সাক্ষাতেও যুবরাজকে কিছু কথা শুনতে হয়েছে। থেরেসা মে তাকে সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। মে’র কথায় সায় দিয়ে এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সেদিকে মনোযোগী হওয়ার আশ্বাস দেন যুবরাজ। তবে সৌদি যুবরাজের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির কথা, সম্মেলন চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পিও এক বিবৃতিতে বলেন, খাশোগি হত্যাকাণ্ডে সৌদি যুবরাজের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।