অযোধ্যা: যেভাবে সেজে উঠছে ‘হিন্দু ভ্যাটিকান’

এক হাড় কাঁপানো শীতের সকালে যোগেন্দ্র গুরু এত জনস্রোতের মধ্যে দিয়ে ফিরছিলেন কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা একটা অস্থায়ী মন্দির দেখে। হিন্দুরা মনে করেন ঠিক ওই জায়গাতেই জন্মেছিলেন ভগবান রামচন্দ্র।

উত্তর ভারতীয় শহর অযোধ্যায় তখন নির্মাণ কাজের চরম ব্যস্ততা। সেখানেই যে গোলাপি বেলেপাথরের সিংহদরজা পার করে এক বিশাল প্রাঙ্গণে ১ হাজার ৮০০ কোটি ভারতীয় টাকার বেশী খরচ করে হিন্দু দেবতা রামচন্দ্রের মন্দির গড়ে উঠছে।

কয়েকজন হিন্দুত্ববাদী নেতারা যে শহরকে বলছেন, 'হিন্দুদের ভ্যাটিকান', সেই শহরকে সম্পূর্ণভাবে সাজিয়ে তুলতে বুলডোজার চালিয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে অনেক এলাকা, আর যে কর্মকাণ্ডে খরচ হচ্ছে কয়েক হাজার কোটি ভারতীয় টাকা।

মধ্য প্রদেশের মোরেনা জেলার একটা গ্রাম থেকে পরিবারের আরও জনা কুড়ি সদস্যর সঙ্গে গুরু প্রায় ১৪ ঘণ্টার কষ্টকর বাস যাত্রা করে অযোধ্যায় পৌঁছিয়েছিলেন।

হিন্দুত্ববাদীরা যে মন্দির স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন কয়েক দশক ধরে, আগামী সপ্তাহে সেটারই উদ্বোধন করবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

যেখানে একসময়ে বাবরি মসজিদ ছিল

মন্দিরটি যেখানে তৈরি হয়েছে, সেটা ভারতের সবথেকে বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানগুলির অন্যতম। ওখানেই একসময়ে ছিল ষোড়শ শতাব্দীতে তৈরি বাবরি মসজিদ।

রাম মন্দির ধ্বংস করে ওই মসজিদ গড়া হয়েছিল, এই দাবি তুলে উন্মত্ত হিন্দু জনতা ১৯৯২ সালে মসজিদটি ভেঙ্গে দিয়েছিল। তারপরে সারা দেশে শুরু হয়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মারা গিয়েছিলেন প্রায় দুই হাজার মানুষ।

বহু বছর ধরে হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে যে জমি নিয়ে বিবাদ চলে আসছিল, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৯ সালে দেওয়া এক রায়ে তার মালিকানা হিন্দুদের দিয়ে দেয়। যদিও সর্বোচ্চ আদালত এটাও স্পষ্ট করে বলেছিল যে মসজিদ ধ্বংস করাটা ছিল ‘আইনের শাসনের জঘন্য লঙ্ঘন’। মসজিদ বানানোর জন্য মুসলমানদের অযোধ্যাতেই অন্য একটি জমিও দেয় আদালত।

মোদি এমন একটা সময়ে এই মন্দিরের উদ্বোধন করতে চলেছেন, যখন লোকসভা ভোটের আর কয়েক মাস বাকি আছে। ওই নির্বাচনে তৃতীয়বার জয়ের দিকে তাকিয়ে আছে তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি। মোদি বলছেন, এই মন্দিরটি ‘জাতিকে এক করবে’। বর্ষীয়ান মন্ত্রী রাজনাথ সিং মনে করেন রামমন্দির ‘ভারতের সাংস্কৃতিক পুণর্জাগরণ ঘটাবে আর জাতীয় গর্ব ফিরিয়ে আনবে।’

অযোধ্যার ভোল বদল

আর এই সব কিছুর জন্য মোদির সরকার কোনও ত্রুটি রাখছে না। গঙ্গার উপনদী সরযূর তীরে শান্ত তীর্থযাত্রীদের শহর অযোধ্যাকে পুরোপুরি বদলিয়ে দিচ্ছে। কর্মকর্তারা যে রূপান্তরিত শহরটিকে অভিহিত করছেন "বিশ্বমানের এক নগরী, যেখানে তীর্থযাত্রী আর পর্যটক" উভয়ই আসবেন।

শহরের ভোল বদলিয়ে দেওয়ার জন্য কয়েক হাজার কোটি ভারতীয় টাকার যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে রাস্তাঘাটের সম্প্রসারণ, একটি ঝাঁ চকচকে নতুন বিমানবন্দর, একটি বিশাল রেলস্টেশন এবং একটি বহুতলীয় গাড়ি পার্কিং রয়েছে। এর জন্য তিন হাজারের বেশি বাড়ি, দোকান এবং ‘ধর্মীয় কাঠামো’ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে। চারটি প্রধান রাস্তা প্রশস্ত করে ১৩ কিলোমিটার লম্বা ‘রাম পথ’ বানানোও এই সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত। সব বাড়িগুলোকে একই রকম হালকা হলুদ রঙ করা হয়েছে।

র‍্যাডিসন ও তাজের মতো হোটেল চেইনগুলি ছাড়াও আরও ৫০টি নতুন হোটেল আর হোমস্টে তৈরির পরিকল্পনা হচ্ছে। বহু পুরণো অপরিচ্ছন্ন অতিথিশালাগুলিকে নতুন করে সাজানো হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই জমির দাম ইতিমধ্যে তিনগুণ বেড়ে গেছে।

অযোধ্যার ভবিতব্য ঠিক করে বহিরাগতরা

অযোধ্যার ভবিতব্য নানাভাবে শহরটির বাইরে থেকে আসা মানুষদের হাতেই নির্ধারিত হয়েছে। এই শহরে হিন্দু আর মুসলমানরা একই সঙ্গে, একই পাড়ায় থেকে এসেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। সেই ট্র্যাডিশন বজায় থেকেছে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পরে ১৯৯২-র ডিসেম্বরে শহরের মুসলমানদের ওপরে আক্রমণ, অন্তত ১৮ জন মুসলমান নিহত হওয়া, তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও।

তথ্য সূত্র- বিবিসি বাংলা