ভূরাজনীতির পুনর্গঠনে ডোনাল্ড ট্রাম্প

২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চরম বেকায়দায় ফেলা আর্থিক সংকটের কথা মনে আছে নিশ্চয়? আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ আগেকার সেই মহামন্দার সময় টালমাটাল হয়ে পড়া মার্কিন অর্থনীতির হাল ধরেন ফেডারেল রিজার্ভের তত্কালীন চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিন্সপ্যান। খাদের কিনারা থেকে আমেরিকার অর্থব্যবস্থা টেনে তুলে ‘ত্রাতা’ উপাধিতে ভূষিত হন এই প্রখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ। ১৯৮৭ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ফেডের চেয়ারম্যান থাকাকালে গ্রিন্সপ্যান মার্কিন অর্থনীতিতে রাখেন অসামান্য অবদান। তার সময়ে অর্থনীতির গতি ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত হয়, যেখানে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আর্থিক বাজার ঢেলে সাজাতে গ্রিন্সপ্যান যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন, তা ‘ফেড পুট’ নামে পরিচিতি। ফেড পুটের কার্যকাররিতা এতটাই ফলপ্রসু ছিল যে, তা বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আস্থা অর্জন করে। ফেড পুটের ওপর ভর করেই একটা সময়ে আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠে আমেরিকা। মহামন্দার হাত থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করতে মার্কিন ট্রেজারি এ অবদান রেখেছিল, যার নেপথ্যে ছিল গ্রিন্সপ্যানের ‘ফেড পুট’ সিস্টেম।

গ্রিন্সপ্যানের ফেড পুটের কথা কেন বলছি? বলছি এই কারণে যে, আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, আমেরিকার অর্থনীতি ঘিরে শঙ্কা ততই বাড়ছে! ২০২৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন ঘিরে ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচন ঘিরে বিশ্বনেতারা এখন থেকেই চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ক্ষমতায় এলে হোয়াইট হাউজের ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনীতির হিসাবনিকাশে নানা পরিবর্তন আসতে পারে। বিশ্বনেতাদের ‘নতুন চিন্তাভাবনা’ মূলত সে কারণেই।

বিশ্বনেতাদের ধারণা, আসছে নির্বাচনে ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে তিনি হয়তো ‘ট্রাম্প পুট’ নীতির ভিত্তিতে কাজ করবেন! সেক্ষেত্রে আগামী এক বছর পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভালো ভালো চুক্তি করতে হলে এখন থেকেই বুঝেশুনে পা ফেলতে হবে বলে মনে করছে সরকারগুলো।

বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে একধরনের মন্দাভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এর কারণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধবিগ্রহ। ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের পর অতি সম্প্রতি ইরান-পাকিস্তান সংঘর্ষসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এসব যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অচলাবস্থা চলছে, তার শুরুটা হয় মূলত ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এ কারণে ইউক্রেন যুদ্ধের দিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতি। এই যুদ্ধ বন্ধ হওয়া-না হওয়ার ওপরেই নির্ভর করছে বড় ধরনের হিসাবনিকাশ।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় এলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এ কারণে যুদ্ধের হিসাব কষছেন নতুন সমীকরণের আলোকে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন যুদ্ধে একধরনের ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। যুদ্ধে অচলাবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে বলতে হবে। যুদ্ধ শেষ করার প্রশ্নে পুতিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েও বাড়ছে জল্পনাকল্পনা। এক বক্তৃতায় ট্রাম্প বলেছেন, ‘মাত্র এক দিনের মধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়া যায়।’ ট্রাম্পের এ ধরনের কথা যুদ্ধের ময়দানকেই কেবল নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অঙ্গনকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।

ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে বলব, আর কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে না ইউক্রেনকে। কাজেই আপনাকে চুক্তি করার পথে হাঁটতে হবে অবধারিতভাবে।’ ট্রাম্পের এজাতীয় কথা নিছক কথার কথা হলেও এর একটা তাত্পর্য রয়েছে বইকি। রুশ প্রেসিডেন্ট হয়তো এ কারণেই অপেক্ষা করে আছেন ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য। এক দিনের ব্যবধানেই যদি যুদ্ধ বন্ধ করা যায়, তবে অহেতুক অর্থ ব্যয় করে লাভ কী—পুতিনের ভাবনা সম্ভবত এরকমটাই।

চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটোর জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এখনো দূর করা যায়নি। ন্যাটোর নিয়ম অনুযায়ী, এই জোটের কোনো একটি সদস্যের ওপর আক্রমণ হলে তা জোটভুক্ত সব দেশের ওপর আক্রমণের শামিল হিসেবে গণ্য হবে। ট্রাম্প বরাবরই ন্যাটোকে শক্তিশালী করা বা এর সম্প্রসারণের বিপক্ষে। এই অর্থে, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার অর্থ হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধের সব হিসাবনিকাশ পালটে যাওয়া। মূলত এ কারণেই বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করে চলেছে দেশগুলো।

ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ফিরতে পারেন—এমন চিন্তা থেকে বিশ্বনেতারা আসলেই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। এর প্রভাব লক্ষ করা গেছে সম্প্রতি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত কপ২৮ জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনেও। কপ২৮ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। এ নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে। কারণ তেল, গ্যাস ও কয়লার প্রধান উত্পাদক ও ভোক্তা দেশগুলো এসবের ব্যবহার বাড়াচ্ছে বই কমাচ্ছে না। ফলে এই খাতে বিনিয়োগও ওঠানামা করছে।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল উত্পাদনকারী দেশ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত এক দশক ধরে বার্ষিক উত্পাদন ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়িয়ে আসছে দেশটি। শুধু তাই নয়, ২০২৩ সালে উত্পাদনের নতুন রেকর্ড গড়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী তৃতীয় বৃহত্তম দেশ হচ্ছে ভারত। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নে বেশ উন্নতি করেছে। তবে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের প্রশ্নে দেশটির অবস্থান ওপরের দিকেই দেখা যাচ্ছে। একই অবস্থা চীনেরও। নবায়নযোগ্য শক্তির বদলে কালো ধোঁয়া নির্গমনই দেশটিতে বেশি চোখে পড়ে। কয়লা উত্পাদন ও ব্যবহারে এক নম্বরে অবস্থান করছে বেইজিং। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ২০২৩ সালে বেশি সৌর প্যানেল স্থাপন করেছে চীন। তবে পিছিয়ে নেই নতুন কয়লা প্ল্যান্ট স্থাপনের ক্ষেত্রেও। বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ছয় গুণ বেশি কয়লা প্ল্যান্ট তৈরি করছে দেশটি।

এই যখন অবস্থা, তখন বিশ্বনেতারা বেশ ভালোমতোই বুঝতে পারছেন, ট্রাম্প যদি আবারও ফিরে আসেন, তাহলে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাওয়ার  পরিকল্পনা নতুন মোড় নেবে। এর কারণ জলবায়ু তহবিল এবং এই খাতে বিনিয়োগকে আদৌ পাত্তা দিতে চান না তিনি।

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায়ও নতুন পরিবেশ বিরাজ করবে। ট্রাম্পের আগের সময়কার অবস্থা বিবেচনায় এক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলাই বেশি হবে বলে মনে করা হয়। মনে থাকার কথা, ২০১৭ সালে অফিসের প্রথম দিনেই ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বাণিজ্য চুক্তি থেকে বের হয়ে যান ট্রাম্প। পরের সপ্তাহগুলোতে এর রেশ বয়ে যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলোতে। এসব ক্ষেত্রে আলোচনা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। সব থেকে বড় ব্যাপার হয়ে ওঠে চীনা পণ্যের ওপর ‘মার্কিন শুল্ক আরোপ’। ৩০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের চীনা পণ্য আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে বসেন ট্রাম্প।

নতুন করে ক্ষমতায় এলে চীনের পণ্যের ওপর আবারও নতুন করে শুল্ক বসাবেন  ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান বাণিজ্য উপদেষ্টা রবার্ট লাইথাইজারের সাম্প্রতিক প্রকাশিত ‘নো ট্রেড ইজ ফ্রি’ বইতে সেরকমটাই আভাস পাওয়া যায়। এই বইয়ে বলা হয়েছে, শুল্ক আরোপের প্রশ্নে দ্বিতীয় মেয়াদ আরো আগ্রাসি হবেন ট্রাম্প। বাস্তবতাও বলে সে কথাই। নির্বাচনি প্রচারণায় ট্রাম্প নিজেকে ‘ট্যারিফ ম্যান’ হিসেবে অভিহিত করছেন বারবার। বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য বা সেবা আমদানির ওপর ১০ শতাংশ হারে সার্বজনীন শুল্ক আরোপ করার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। তার পরিষ্কার কথা, ‘চাখের বদলে চোখ, শুল্কের বদলে শুল্ক’।

বাইডেন প্রশাসন এশিয়া-প্যাসিফিক দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা চুক্তি বজায় রেখে চলেছেন। এতে করে ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক কাঠামো সমৃদ্ধ হয়েছে বলে মনে করে বাইডেন প্রশাসন। তবে ট্রাম্প হাঁটতে চান ভিন্ন পথ ধরে। তার ভাষায়, ‘প্রথম দিনেই এই সংস্কৃতি বাদ দেওয়া হবে।’ ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্ত এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর বাণিজ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।

ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় এলে তার প্রশাসন প্রথম দিন থেকেই কাজে হাত দেবে। এক্ষেত্রে প্রথম কাজ হবে সীমান্ত বন্ধ করা। বর্তমানে দৈনিক ১০ হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিক মেক্সিকো থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকছে। বাইডেন প্রশাসন চেষ্টার ত্রুটি না রাখা সত্ত্বেও এটা আটকাতে পারছে না। অন্যদিকে, ট্রাম্প সীমান্ত একদম সিল করে দেওয়ার মিশনের কথা বলছেন। বিশ্বরাজনীতির পাশাপাশি এর একটা প্রভাব যে অর্থনৈতিক অঙ্গনকেও ছুঁয়ে যাবে, তা বলাই বাহুল্য।

ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা জুড়ে থাকছে ইসরাইল ও ইউক্রেনকে অর্থসহায়তার প্রসঙ্গও। এসব দেশকে নতুন করে আর্থিক সহায়তা করা হবে না বলে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন। আমেরিকার অন্যতম মিত্র এই দুই দেশকে অর্থসহায়তা বন্ধ করে দিলে যুদ্ধ নুতন মোড় নেবে। সেক্ষেত্রে ব্লকের রাজনীতির চেহারাও পালটে যাবে, যার একটা ঢেউ বয়ে যাবে রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে।

যাহোক, নতুন মেয়াদে আরো চার বছর মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসলে ট্রাম্প প্রশাসনের হাত ধরে বিশ্বরাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন চোখে পড়বে। পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। এসব বিষয় মাথায় রেখেই নিজেদের নীতি ও পলিসি ধরে এগোচ্ছে বিভিন্ন দেশ। সব মিলিয়ে একধরনের ভয়, অবিশ্বাস ও আশার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে বিশ্বরাজনীতি।

লেখক : হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের সরকার বিভাগের অধ্যাপক

ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে ভাষান্তর: সুমৃত খান সুজন