শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সামাল দেওয়া যাবে না

গত ১৭ জানুয়ারি নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটাই বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি। আমাদের অর্থনীতিতে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা সমস্যা বিরাজ করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন মুদ্রানীতি কেমন হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একধরনের আগ্রহ ও প্রত্যাশা লক্ষ করা যাচ্ছিল। আমাদের দেশের অর্থনীতিকে চারটি জিনিস কুরে কুরে খাচ্ছে—খেলাপি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, টাকা পাচার এবং ডলারের সংকট। এর সঙ্গে আছে ঋণখেলাপি সমস্যা, যা আমরা কোনোভাবেই সমাধান করতে পারছি না। আমরা খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে কতটা আন্তরিক, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। আর একটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। বিশ্বের অনেক দেশই মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাফল্য প্রদর্শন করতে পারলেও আমরা এ ক্ষেত্রে সফল হতে পারছি না। সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষগুলো উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে খুবই দুর্দশার মধ্যে রয়েছে। আয় বণ্টনের সমস্যাও আমাদের অর্থনীতিতে ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে। সমাজে ধনবৈষম্য বাড়ছে। সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে অসন্তোষ। এছাড়া অর্থনীতিতে রয়েছে মার্কিন ডলারের সংকট। বাংলাদেশ ব্যাংক নানাভাবে চেষ্টা করেও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ বাড়াতে পারছে না। এই চার সমস্যা দাহ্য বস্তুর মতো একে অপরের পরিপূরক। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি দিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সমাধানের যে কথা ভাবছে, তা একটি বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা মাত্র। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অতীতেও কোনো ফল দেয়নি, ভবিষ্যতেও কোনো কার্যকর ফল দেবে বলে মনে হয় না। মূল্যস্ফীতির কারণ যদি হয় সুশাসনের অভাব।

কিছুদিন আগে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনসি বলেছিলেন, ‘আমরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। কারণ বাজারে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তত্পর আছে। এখন নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী এসেছেন। তিনি কি বলবেন, বাজারে কোনো সিন্ডিকেট নেই? তিনিও হয়তো বলবেন, বাজারে সিন্ডিকেট আছে, কিন্তু আমরা তাকে শায়েস্তা করতে পারছি না। মুদ্রানীতি দিয়ে তো বাজারে তত্পর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে শায়েস্তা করা যাবে না। মুদ্রানীতি ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানো বা কমানোর ব্যবস্থা করতে পারবে। ব্যাংক যদি আমানতের ওপর প্রদেয় সুদের হার বাড়ায়, তাহলে অনেক মানুষই তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ নিজেদের কাছে সংরক্ষণ না করে ব্যাংকে রাখতে পারে অধিক মুনাফা পাওয়ার আশায়। আর ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানো হলে ঋণগ্রহণ আগের তুলনায় ব্যয়বহুল হবে। উচ্চ সুদ দিয়ে অনেকেই ব্যাংক ঋণ নিতে আগ্রহী হবেন না। কিন্তু ঋণগ্রহীতাদের মাঝে যদি এমন কোনো ধারণার সৃষ্টি হয় যে, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা ফেরত না দিলেও কিছু হবে না, তাহলে এই উদ্যোগ কার্যকর হবে না। মানুষ আগের মতোই বেশি করে ঋণ গ্রহণ করতে চাইবে। বাজারে জিনিসপত্র একই রকম থাকা অবস্থায় মুদ্রা সরবরাহ কমে গেলে বর্ণিত পণ্যের মূল্য কমে যাবে, এটাই হচ্ছে মুদ্রা সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যুক্তি। কিন্তু এই যুক্তি আমাদের দেশে কাজ করবে না। কারণ মুদ্রা থাকুক আর না-ই থাকুক, কিছু জিনিস আছে, যা আমাদের কিনতেই হবে। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা জানেন, কোনো পণ্যের চাহিদা কখনোই কমবে না। তারা সেই পণ্যই মজুত করেন। পণ্যের প্রকৃত মূল্য যতই হোক, ব্যবসায়ীরা সবাই মিলে জিনিসটি কত টাকায় বিক্রি করবেন, তা নির্ধারণ করে নেন। যেহেতু ব্যবসায়ীরা খুবই ঐক্যবদ্ধ, তাই তারা তাদের স্বার্থে যা করার তাই করতে পারেন। তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা সুপার প্রফিট করে নিচ্ছেন। এতে দুটি ঘটনা ঘটে—দুর্বল ভোক্তা বেশি দাম দিয়ে একটি পণ্য কিনতে বাধ্য হন। এতে তার প্রকৃত আয় আরো কমে যায়। তিনি দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হন। এ কারণে সমাজে অসমতা বাড়ে। মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ে। আবার কিছু মূল্যস্ফীতি আছে, যাকে আমরা ‘কস্টপুশ ইনফ্লেশন বলতে পারি। যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল বা অন্য কোনো আমদানি পণ্যের দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারে পণ্যটির দাম নিশ্চিতভাবেই বাড়বে। আর এসব আমদানি পণ্য ব্যবহার করে যেসব পণ্য উত্পাদিত হয়, তাদের মূল্যও বাড়বে। মুদ্রানীতি বা সুদের হার হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে তো এসব সমস্যার সমাধান করা যাবে না। বাজারে তত্পর ব্যবসায়ী সিন্ডেকট ও কষ্টপুশ মূল্যস্ফীতির জন্য তাই মুদ্রানীতি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এজন্য আমাদের বিকল্প আরো বেশি প্রত্যক্ষ ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে।

মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার ১ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণভাবে উত্পাদনশীল ঋণ কমলে উত্পাদন কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে। ব্যক্তি খাতে সুদের হার বাড়িয়ে তা কমানো যেতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে যদি সরকারি খাতের অনুত্পাদনশীল বা অদক্ষ ঋণের প্রবৃদ্ধি না কমে, তাহলে মোট ঋণের প্রবাহ তো কমল না। এতে পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হবে না। উচ্চ সুদের কারণে ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তারা হয়তো ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিলেন। কিন্তু সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে যে ঋণ নেবে, সেই ঋণের সুদের টাকা তো সরকারই পাবে। কাজেই সরকারের বেশি পরিমাণে ঋণ গ্রহণে কোনো অসুবিধা হবে না। কারণ সরকার নিজের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে নিজেকেই বেশি সুদ দিচ্ছে। কাজেই সুদের হার বাড়িয়ে-কমিয়ে মোট ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সার্বিকভাবে ঋণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নির্ভর করবে সরকার কী পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করে তার ওপর। সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বা মাত্রা অনেকখানিই নির্ভর করবে বাজেট ঘাটতির ওপর। সরকারের বাজেট ঘাটতির পরিমাণ নির্ভর করবে সরকার কতটা রাজস্ব আদায় করতে পারছে এবং কতটা ব্যয় করছে তার ওপর। সরকারের ব্যয়ের ক্ষেত্রে অদক্ষতা আছে। এক টাকার কাজ তিন টাকা দিয়ে করানো হচ্ছে। ধনিক শ্রেণির কাছ থেকে কর আদায়ে সরকারের সক্ষমতা কমে গেছে। কাজেই ভবিষ্যতে সরকারের বাজট ঘাটতি কমার কোনো কারণ দেখছি না। বাজেট ঘাটতির পরিমাণ যদি জিডিপির ৫ শতাংশের ওপরে চলে যায়, তাহলে সরকারকে অবশ্যই বর্ধিত হারে ঋণ গ্রহণ করতে হবে। অথবা টাকা ছাপিয়ে সরকারকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। সরকার যদি টাকা ছাপাতে থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। আমি মনে করি, উপযুক্ত ফিস্ক্যাল পলিসি ছাড়া শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে ঋণের ওপর সুদের হার বাড়িয়ে ঋণ ততটা কমানো যাচ্ছে না। আমাদের দেশে যারা ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ করেন, তারা সুদের হার কত তা বিবেচনায় নেন না। তাদের কাছে ঋণ গ্রহণটাই বড় ব্যাপার, সুদের হার নয়। একবার ঋণ গ্রহণ করা গেলে ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ করে বা অন্য উপায়ে টিকে থাকা যায়। আর ঋণ গ্রহণ করতে গেলে আমাদের দেশে দুর্বল বা অঘনিষ্ঠদের ঘুষ প্রদান করতে হয়। সে ক্ষেত্রে সুদের হার তাদের মূল খরচ নয়। তাদের মূল ব্যয় হয় ঋণ পাওয়ার সময় প্রদেয় ঘুষ ও অন্যান্য খরচা বাবদ। কাজেই সুদের হার কমল কি বাড়ল, এটা ঋণ গ্রহণকারীদের জন্য তেমন কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়।

আমদানি কমানো বা সুদের হার বাড়ানো—এগুলোর নেতিবাচক প্রভাবও আছে বা থাকতে পারে। প্রথমেই প্রশ্ন উঠবে, আপনি আমদানি কমাবেন, কিন্তু কী ধরনের পণ্যের আমদানি কমাবেন? যেমন আপনি যদি চাল বা গম আমদানি কমিয়ে দেন, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। অবশ্য চাল আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে রুপি ব্যবহার করতে পারলে কিছুটা সুবিধা হবে। আবার কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ অথবা জ্বালানি তেলের আমদানি কমিয়ে দিলে শিল্পসহ সব ক্ষেত্রেই উত্পাদন কমে যাবে। কিছু কিছু পণ্য আছে, যা আপনাকে আমদানি করতেই হবে। তবে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে বিকল্প মুদ্রায় আমদানি করা গেলে রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। বৈদিশক মুদ্রা ব্যবহার করলেন না, বিকল্প মুদ্রাও ব্যবহার করলেন না, আপনি সরাসরি আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দিলেন, তাহলে পণ্যভেদে কম-বেশি রাজনৈতিক সংকটে পড়তে পারেন। যেমন—চাল মানুষের জন্য আবশ্যিক একটি পণ্য। যতই দাম বাড়ুক মানুষকে চাল কিনতেই হবে। আপনি যদি চালের আমদানি কমিয়ে দেন, তাহলে চালের বাজারমূল্যে আগুন লেগে যাবে। আপনার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কমে যাবে আপনি যদি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে না পারেন, এলএনজি গ্যাসও সরবরাহ করতে না পারেন। স্থানীয়ভাবেও গ্যাসের জোগান বাড়াতে না পারেলে অর্থনীতিতে ধারাবাহিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। এতে আমদানি কমিয়ে যেটকু মুদ্রা বাঁচাবেন, তার চেয়ে বেশি ব্যয় হয়ে যাবে জনগণের অসন্তোষ সামাল দিতে গিয়ে। এমনকি আখেরে প্রবৃদ্ধি ও রপ্তনিও কমে যেতে পারে। এর পরেও বলব, চ্যালেঞ্জ বেশি হলেও সমাধান এখনো হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়নি।

লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন: এম এ খালেক