সম্প্রতি বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এই নির্বাচনে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। ফলে সাধারণভাবে আমাদের দেশে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়, তার কিছুটা ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। তার অর্থ এই নয় যে, অনুষ্ঠিত নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থ বারসহ স্বাধীনতার পর থেকে মোট ছয় বার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা টানা চতুর্থ বার এবং সর্বমোট পাঁচ বার ক্ষমতাসীন হলেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য রেকর্ড বটে। কারণ এর আগে বাংলাদেশের আর কোনো রাজনৈতিক নেতার পক্ষে এতবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা ধরনের সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কোনো কোনো দেশ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক এবং স্বচ্ছ হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সমালোচকদের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। তাহলে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত্ কী হবে? এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমেই যে কথাটি পরিষ্কার করা দরকার তা হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক হচ্ছে বহুমাত্রিক। কাজেই কোনো একটি ইস্যুতে মতান্তর সৃষ্টি হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করবে এমনটা ভাবার কোনো অবাকাশ নেই। বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বহু স্তর আছে। বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শুধু দুটি দেশের সরকারের সম্পর্কমাত্র নয়। শুধু যে রাজনৈতিক সম্পর্ক, তা-ও নয়। এ দুটি দেশের মধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির একক বৃহত্তম গন্তব্য হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক এমনকি মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কও আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বছর দেড়েক ধরে কতগুলো ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলছিল। যেমন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয়, সে ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেনদরবার করছিল। বাংলাদেশ এসব বিষয়কে একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মনে করে। বাংলাদেশের বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তোমরা এতটা হস্তক্ষেপ করছ কেন?
এটা স্বাভাবিক যে বাংলাদেশে বিরোধী দলের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর বন্ধুবান্ধব থাকতে পারে। তাদের ওপর ভরসা করেই হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝিয়েছে, তোমরা যদি বড় ধরনের হস্তক্ষেপ করি, তাহলে বাংলাদেশ সরকার হয়তো নমনীয় হবে। তারা বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হবে। অথবা সরকারের ওপর চাপ দিয়ে কিছু স্বার্থ আদায় করে নিতে পারবে। আর একটি বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে অনেক দিন ধরেই বিভাজনের রাজনীতি চলছে। এ কারণে বাইরের শক্তিগুলো বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ পায়। রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি হয়তো লক্ষ করেছে, তাদের আন্দোলনের প্রতি জনগণের সমর্থন সেভাবে বড় আকারে নেই। কথাটি অন্যভাবে বলা যায়, সরকারের পতনের জন্য যে আকারের জনসমর্থন প্রয়োজন হয়, তা বিরোধী দল সংগঠিত করতে পারছে না। কাজেই তারা যদি বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করে কিছু একটা করতে পারে, তাহলে মন্দ হয় না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যদি আপনি পর্যালোচনা করেন তাহলে দেখবেন, সাধারণ মানুষ যখন মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে রাস্তায় নেমে এসেছে, তখনই একটি সরকারের পতন হয়েছে। আমরা ১৯৯০ সালে এটা প্রত্যক্ষ করেছি। বিরোধী দল বুঝতে পেরেছে, মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে জনগণ রাস্তায় নেমে আসবে তেমন জনসমর্থন তাদের নেই। তার অর্থ এই নয় যে বিরোধী দলের প্রতি মানুষের সমর্থন নেই। সমর্থন আছে, তবে তা সবকিছু উজাড় করে দিয়ে আন্দোলন সফল করার মতো জনসমর্থন তাদের নেই। সবকিছু অচল করে দেওয়ার মতো জনসমর্থন শুধু রাজধানীতে থাকলেই চলবে না, এটা থাকতে হবে দেশব্যাপী। যেহেতু সরকারকে অচল করে দেওয়ার মতো জনসমর্থন বিরোধী দলের নেই, তাই তারা চেষ্টা করেছে কীভাবে বাইরের শক্তির মাধ্যমে সরকারকে অচল করে দেওয়া যায়।
অনেকেই মনে করেন, বিএনপির যতই জনপ্রিয়তা থাকুক না কোন, তারা নেতৃত্বের ঝামেলায় পড়ে গেছে। বিএনপির দুই জন শীর্ষ নেতা, যারা একই পরিবার থেকে আগত এবং দুজনই আদালতের মাধ্যমে শাস্তিপ্রাপ্ত আসামি। তাই তারা মনে করেন, বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্ব পায়, তাহলে দলের নেতৃত্ব তাদের পরিবার থেকে অন্যের হাতে চলে যাবে। সমস্যাটি এখানেই। গত কয়েক বছর ধরে বিএনপির আন্দোলন লক্ষ করলে দেখা যাবে, তারা মূলত শীর্ষ দুই নেতার সাজা মুক্তির দাবি করছে। তারা কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করছে না। তারা মনে করেছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি চাপ দেয়, তাহলে সরকারও হয়তো বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের শাস্তি মওকুফ করার বিষয়ে নমনীয় হতে পারে। কিন্তু সরকার এটা কেন করবে? বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক সরকার তখনই নড়েচড়ে বসে, যখন দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সরকার হঠানোর জন্য মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসে। শুধু দলীয় কর্মীদের রাস্তায় নামিয়ে দাবি আদায় করা যাবে না। আর জনগণও রাস্তায় নামে তখনই, যখন তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মুক্তির মধ্যে জনগণের কী স্বার্থ আছে? পুরো দেশের মানুষ ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামলেই একটি সরকারের পরিবর্তন হতে পারে। ১৯৯০ সালে ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছিল। এমনকি ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দেশের সব মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। ফলে সরকার সেই সময় দাবি মানতে বাধ্য হয়েছিল। বিরোধী দল যখন দেখতে পেল সরকার পরিবর্তনের মতো জনসমর্থন তাদের নেই, তখন তারা বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করতে শুরু করে।
বিদেশি শক্তি সরকারের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের পর একটা সময় তারা প্রত্যক্ষ করে যে বিরোধি দলের আন্দোলনের প্রতি জনগণ তেমন একটা সাড়া দিচ্ছে না। বিরোধি দলের ডাকে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে না—এটা বিদেশি শক্তির কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। তারা আরো একটি বিষয় লক্ষ করে, পৃথিবী এখন আর এককেন্দ্রিক নেই। পৃথিবী এখন বহুমাত্রিক কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। তারা প্রত্যক্ষ করে যে, অন্যান্য দেশও যখন বাংলাদেশে মার্কিন তত্পরতার ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করছে, তখন তারা নতুন চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করে। মার্কিনবিরোধী দেশগুলো যখন বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করে ফেলছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্ররা চিন্তিত হয়ে পড়ে। রাশিয়া এবং চীন যেহেতু গণতান্ত্রিক দেশ নয়, তাই এই বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা সমালোচনা করে। কিন্তু ঠিক তখনই ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বলে, আমরা তোমার এই পলিসির মধ্যে নেই। আমরা মনে করি, জাতীয় নির্বাচন একান্তই বাংলাদেশের নিজস্ব বা অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ভারত যেহেতু কাঠামোগতভাবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই একা হয়ে যায়। আর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারতের সমর্থন প্রয়োজন। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারতকে দরকার। সেই স্থান থেকে তারা কোর্স কারেকশন শুরু করে।
অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা শোনেনি, তাই অচিরেই বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু তারা এটা বোঝার চেষ্টা করে না যে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করলে বাংলাদেশের চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি বেশি হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, তা মূলত তৈরি পোশাককেন্দ্রিক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসামগ্রীর একক বৃহত্তম ক্রেতা দেশ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের দেশে যারা তৈরি পোশাকসামগ্রী রপ্তানি করে, তারা যে পরিমাণ লাভ করে, তার চেয়ে অনেক বেশি লাভ করে মার্কিন বায়াররা। মার্কিন বায়াররা তাদের এই প্রফিট কেন নষ্ট করবে? তারা কোনো কারণেই চাইতে পারে না যে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট হোক। ইউক্রেন যুুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার যে ডলার ছিল, তা আটকে দেওয়া হয়। এই অবস্থায় রাশিয়াও বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে। রাশিয়া তাদের পণ্যের জন্য নতুন বাজার খুঁজেত থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল, অবরোধ আরোপের মাধ্যমে রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের বিনিময় হার সাংঘাতিকভাবে কমানো যাবে। কিন্তু ফল হয়েছিল উল্টো। সেই সময় মার্কিন ডলারের দাম যেমন বাড়ে, একইভাবে রুবলের দামও রেকর্ড পরিমাণে বাড়ে। রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে তেলের দাম রুবলে পরিশোধের শর্তারোপ করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়া জ্বালানি তেল সরবরাহ কমিয়ে দেয়। তারা জ্বালানি তেলের উত্তোলন আগের চেয়ে অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ে। একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ১৩৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। রাশিয়া বিশ্ব জ্বালানি তেলের এক-দশমাংশ জোগান দিয়ে থাকে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা খুব একটা কার্যকর হয়নি।
বাংলাদেশও পশ্চিমা বিশ্বের পরিবর্তে নতুন বাজার খুঁজতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় পশ্চিমাদের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমে আসতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশ নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করবে। বর্তমান সময়ে কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা খুব একটা কার্যকর হয় না। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এটা কোনো মানবিক কারণে হয়নি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসামগ্রী প্রতিযোগতা করেই আন্তর্জাতিক বাজারে তার অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। কোনো কোনো মহল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আশঙ্কা নিয়ে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তা মোটেও সঠিক নয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চায় যে ঘটতি আছে, তা বাংলাদেশের মানুষই ঠিক করে নেবে।
লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
অনুলিখন: এম এ খালেক