নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি

চুলা জ্বালাতে না পেরে ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় আবাসিক গ্রাহকরা এলপিজি সিলিন্ডার, ইলেক্ট্রিক চুলা (ইনডাকশন) ও লাকড়ির চুলা ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন।

সূত্র জানায়, গ্যাসকে কেন্দ্র করে এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে ফায়দা তুলছেন ব্যবসায়ীরা।

চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় গ্যাস সিলিন্ডার ও ইলেক্ট্রিক চুলার দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কোম্পানির ১২ কেজি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম এখন ১ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া বসুন্ধরাসহ ভালো কোম্পানির সিলিন্ডারে ১ হাজার ৫৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

‘গ্যাস নেই, এলপিজি কেনার সামর্থ্য নেই। মাটির চুলায় রান্না করতে হয়’
- বুলবুলি বেগম, গৃহিণী

বন্দরের চৌধুরী বাড়ি এলাকার গৃহিণী আমেনা বেগম বলেন, ‘গ্যাস না থাকায় ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছি। এতে প্রতি মাসে বাড়তি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে। আবার তিতাস গ্যাসকেও বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।’

শহরের মাসদাইর এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী মাকসুদা বেগম বলেন, ‘মধ্যরাতে গ্যাস এলেও সকাল ছয়টার আগে চলে যাচ্ছে।’

নারায়ণগঞ্জ সদরের উত্তর মাসদাইর এলাকার গৃহিণী বুলবুলি বেগম বলেন, ‘গ্যাস নেই, এলপিজি কেনার সামর্থ্য নেই। মাটির চুলায় রান্না করতে হয়।’

এমন দুর্ভোগ শুধু তার একার নয়। নারায়ণগঞ্জ মহানগরীতেও রান্নার জন্য গ্যাস পাচ্ছেন না অনেকে। পাইকপাড়া, বাবুরাইল, দেওভোগ, নিমতলা, নিতাইগঞ্জ, তামাকপট্টি, আমলাপাড়া, কালিরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্যাস না পেয়ে গ্রাহকের ফোন আসছে তিতাসের অভিযোগ কেন্দ্রে।

‘আগে দিনের কোনো না কোনো সময় গ্যাস মিললেও এখন সারাদিনই পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে বাসা থেকে না খেয়ে বের হতে হয়। দুপুরেও বাসায় গিয়ে খেতে পারি না। রাতেরটা খেতে হয় ১২টায়। কিন্তু মাস শেষে ঠিকই বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিল না দিলে আবার লাইন কেটে দেয়। এভাবে চলতে থাকলে রাস্তায় নামা ছাড়া উপায় থাকবে না’
- রাকিবুল ইসলাম রকি, গলাচিপা এলাকার বাসিন্দা

খানপুরের বাসিন্দা হাজেরা বেগম বলেন, ‘মধ্যরাতে গ্যাস আসে, এরপর সকাল আটটার মধ্যেই চলে যায়।’

শহরের দেওভোগ এলাকার বাসিন্দা আরাফাত হোসেন বলেন, ‘ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সকালে খেয়ে স্কুলে যেতে পারছে না। প্রতিদিনই বাইরে থেকে নাশতা কিনতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে কত দিন চলতে পারবো। সবসময় বাইরে থেকে নাশতা কেনার সামর্থ্য নেই। খুব সীমিত আয়ে আমাদের দিন পার করতে হয়।’

‘গ্যাস না থাকায় ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছি। এতে প্রতি মাসে বাড়তি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে। আবার তিতাস গ্যাসকেও বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে’
- আমেনা বেগম, গৃহিণী

শহরের গলাচিপা এলাকার বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম রকি বলেন, ‘আগে দিনের কোনো না কোনো সময় গ্যাস মিললেও এখন সারাদিনই পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে বাসা থেকে না খেয়ে বের হতে হয়। দুপুরেও বাসায় গিয়ে খেতে পারি না। রাতেরটা খেতে হয় ১২টায়। কিন্তু মাস শেষে ঠিকই বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিল না দিলে আবার লাইন কেটে দেয় (সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়)। এভাবে চলতে থাকলে রাস্তায় নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের বাবুরাইল, পাক্কারোড, দেওভোগ আখড়া, পালপাড়া, ভূঁইয়ারবাগ, নন্দীপাড়া, আমলাপাড়া, গলাচিপা, কলেজ রোড, জামতলা, উত্তর চাষাঢ়া, মাসদাইর, মিশনপাড়া, খানপুর, মেট্রো হল, দক্ষিণ সস্তাপুর, সস্তাপুর, কাঠেরপুল ও তল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। এসব এলাকার মানুষ সময়মতো রান্না করতে পারছেন না।

শহরের দেওভোগ আখড়া এলাকার সিঁথী রানী সাহা প্রতিদিন রাত দুইটা পর্যন্ত জেগে থেকে রান্না করেন। কারণ দিনের বেলায় তো গ্যাস থাকেই না, আর সন্ধ্যার পর যতটুকু থাকে তাতে রান্না করা যায় না। রাত দুইটা পর্যন্ত রান্না করে পরদিন তিন বেলাতেই ছেলেমেয়ে আর পরিবারের লোকজনদের ঠাণ্ডা খাবার খেতে হয়।

ঘেরাও কর্মসূচি, বারবার তাগিদ সত্ত্বেও ব্যবস্থা নেই
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের দাবিতে তিতাসের নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে অরাজনৈতিক সংগঠন ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’।

‘দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে জ্বালানি গ্যাসের সংকট চলছে। এর সমাধানে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও উদ্যোগ নেই। তিতাস কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই গ্যাসের এই অবস্থা। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। আমরা তিতাসের কাছে আমাদের অভিযোগ জানানোর পর গ্যাস সংকট আরও প্রকট হয়েছে’
- নূর উদ্দিন আহমেদ
সভাপতি, ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’

কর্মসূচি শেষে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জবাসীর দুর্বিষহ অবস্থার কথা জানিয়ে ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’র সভাপতি নূর উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে জ্বালানি গ্যাসের সংকট চলছে। এর সমাধানে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও উদ্যোগ নেই। তিতাস কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই গ্যাসের এই অবস্থা। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। আমরা তিতাসের কাছে আমাদের অভিযোগ জানানোর পর গ্যাস সংকট আরও প্রকট হয়েছে।’

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার আবাসিক ও শিল্প গ্রাহকদের রান্নায় দুর্ভোগের শেষ নেই। দিন দিন আবাসিক ও শিল্প গ্রাহকরা গ্যাসের সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। শহরের দেওভোগ, কাশিপুর, বাবুরাইল, পাইকপাড়া, শহীদ নগর, নলুয়াপাড়া, ভূঁইয়ারবাগ, চাঁনমারী, ইসদাইর, মাসদাইর, পশ্চিম মাসদাইর, জামতলা, দাতা সড়ক প্রভৃতি এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র আকার নিয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে কাশীপুর, মাসদাইর, বাড়ৈভোগ ও বিসিক শিল্প নগরীর আশেপাশের এলাকায়। এসব এলাকায় দিনের বেলায় গ্যাস থাকে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।