লোহিতসাগরের টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ নানা কথা বলছেন। কিছু কিছু রপ্তানিকারক বলছেন, লোহিতসাগর এড়িয়ে জাহাজের যাত্রা দীর্ঘ হওয়ার কারণে তাদের খরচ বেড়েছে। আবার পণ্য বহনকারী জাহাজের এজেন্টরা বলছেন, ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়া দেন আমদানিকারকরা। এক্ষেত্রে রপ্তানিকারকদের কিছুই করার নেই। তবে কোনো কোনো রপ্তানিকারক বলেছেন, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে কোনো কোনো বায়ার পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। দু-একটি রপ্তানি আদেশ বাতিলও হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লোহিতসাগরে সমুদ্রগামী জাহাজের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে বড় শিপিং কোম্পানিগুলো আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে পণ্য পরিবহন শুরু করেছে। বাংলাদেশে এ পথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ দিন বাড়তি সময় ব্যয় হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ৬৩ শতাংশ যায় ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আমদানি পণ্যের ৮ শতাংশ আসে ঐ দুটি গন্তব্য থেকে। লোহিতসাগরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের আমদানি রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর দায় পড়বে হয় আমদানিকারক নয়, রপ্তানিকারকদের ঘাড়ে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, লোহিতসাগরের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রমুখী জাহাজের ভাড়া ৪০ শতাংশের মতো বেড়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই বাড়তি ভাড়া কার ওপর বর্তাবে। পোশাক মালিকদের কেউ কেউ বলছেন, এটি শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কারখানা মালিকের ওপর বর্তাবে। কারণ, ক্রেতা তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হয় তার পণ্যের দাম বাড়াবেন অথবা ক্রয়মূল্য কমাবেন। তবে বেশ কয়েক জন রপ্তানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত পণ্যমূল্য কমানোর ঘোষণা আসেনি। কিছু কিছু সময়ে লিড টাইম ঠিক রাখার জন্য নির্দিষ্ট পণ্য কিছুটা আগে শিপমেন্ট করার জন্য বায়ারের পক্ষ থেকে অনুরোধ আছে মাত্র।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পোর্ট অ্যান্ড শিপিং স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান তরফদার মো. রুহুল আমিন ইত্তেফাককে বলেছেন, জাহাজের যাত্রা দীর্ঘ হলে শিপিং কোম্পানিগুলো বাড়তি ভাড়া আদায় করবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এই বাড়তি ভাড়াগুলো শিপিং কোম্পানি পরিশোধ করলেও এর দায় এসে পড়বে ভোক্তাদের ওপর। এটি পুষিয়ে নিতে তারা রপ্তানিকারকদের পণ্যমূল্য কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে বাংলাদেশে কোনো কন্টেইনার সংকট নেই বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে বড় রপ্তানিকারক এবং তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি এ বি এম সামছুদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, এখন পর্যন্ত পণ্য জাহাজীকরণের ক্ষেত্রে কোনো চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে আসেনি। রপ্তানি আদেশ বাতিলের কোনো ঘোষণাও পাইনি। তিনি বলেন, কোনো একটি সংকটে আমাদের এখানে যে মাতামাতি শুরু হয়ে যায় তার কোনো ভিত্তি আসলে পাওয়া যায় না। তার মতে, বাংলাদেশ থেকে ৯০ শতাংশ পণ্য ফ্রি অন বোর্ড পদ্ধতিতে শিপমেন্ট হয়। অর্থাত্ এসব শিপিংলাইন নমিনেশন দেয় ক্রেতারা। আমরা পণ্য বুঝিয়ে দেই।
এদিকে রপ্তানিকারকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান সংকটের কারণে পণ্য রপ্তানির জন্য কন্টেইনার পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে পণ্য রপ্তানি হুমকির মধ্যে পড়েছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ ইকবাল আলী শিমুল ইত্তেফাককে বলেন, লোহিতসাগরের পরিস্থিতিতে সারা বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখানে বাংলাদেশের একার কিছু করার নেই। ঐ রুটে পণ্য রপ্তানি করলে দেড় হাজার কিলোমিটার বাঁচিয়ে চলতে পারে জাহাজগুলো। এখন ঐ পথটুকু বাড়তি যোগ হচ্ছে। এর ফলে জাহাজগুলোর অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে। তিনি বলেন, শিপিংয়ের বাড়ি খরচ দিচ্ছে শিপিং কোম্পানিগুলো। কারণ বায়ারদের সঙ্গে শিপিং কোম্পানিগুলোর চুক্তি রয়েছে। তিনি বলেন, কন্টেইনারের সংকটের কথা বলা হলেও এরকম কিছু নেই। পর্যাপ্ত কন্টেইনার এখনো খালি পড়ে আছে রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি শিপিং কোম্পানির কার্যক্রম রয়েছে। অনলাইনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি শিপিং কোম্পানি এমএসসি, মায়ের্সক, সিএমএ-সিজিএম, কসকো ও হ্যাপাগ লয়েড বাংলাদেশের অর্ধেক রপ্তানি পণ্য পরিবহন করে। এসব কোম্পানি ইতিমধ্যে কন্টিনজেন্সি অ্যাডজাস্টমেন্ট চার্জ আরোপের বিষয়ে তাদের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দিয়েছে।