রাজনীতি জনগণের জন্য, জনসেবার জন্য। আর অর্থনীতি জনজীবনকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে। তাই রাজনৈতিক বলয়ে অর্থনীতির স্বরূপ অনুধাবন প্রয়োজন। অন্য কথায় একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি সম্পর্কে আমাদের কমবেশি সচেতনতা আবশ্যক। এটি ছাড়া নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা কঠিন বৈকি।
বাংলাদেশে অল্প শিক্ষিত জনগণ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ও সংযোগ সম্পর্কে তেমন একটা সজাগ নয়। গ্রামাঞ্চল কিছুটা পশ্চাত্পদ এবং শিক্ষার হার তুলনামূলক কম বিধায় ঐ অসংযোগ প্রকটতর। কীভাবে বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থে একজন ব্যক্তির প্রদত্ত শুল্কের টাকা অন্তর্ভুক্ত আছে বা রাষ্ট্রের গৃহীত ঋণের কিয়দংশ সে পরিশোধ করে চলেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটি জনগণ ওয়াকিবহাল নয়। তদ্রূপ রাষ্ট্রকে প্রদেয় ও রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রাপ্তি জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। ফলে পরস্পরের তথা জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কে ও জবাবদিহিতায় ফারাক বিদ্যমান। উদাহরণ স্বরূপ, ভোট প্রদানে জনগণের অনীহা থেকেও বিষয়টি কিছুটা উপলব্ধি করা যায়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো অতি সুদৃঢ়। বিশ্বে যুদ্ধবিগ্রহ, কোভিড-১৯ বা দেশে রাস্তা অবরোধ ইত্যাদি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে সেই অর্থে ঝাঁকুনি দিতে পারে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির বৃহত্ অংশ গ্রামীণ, যা সরকার কর্তৃক গৃহীত রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সন্নিবেশিত নয়। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি ক্ষুদ্রাংশ মাত্র বাংলাদেশের জিডিপির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে হিসাবকৃত ৪১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ১৭০ মিলিয়ন মানুষের জীবনযাত্রা মানের জন্য দৃশ্যত মোটেই যথেষ্ট নয়। জনগোষ্ঠীর অতি বৃহত্ অংশ সরকারের প্রণীত বাজেট এবং গৃহীত প্রকল্পসমূহে প্রত্যক্ষ অংশীদার নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৬.৩০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। তবে তাদের দৈনিক ২.০ মার্কিন ডলারের আয় নির্ভরতা বাস্তব অবস্থার বর্ণনা করে না। গৃহ-অর্থনৈতিক-কর্মকাণ্ড, যা অতিবৃহত্, সামগ্রিক দেশীয় অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না এবং বাস্তবে হিসবাকৃত জিডিপি অপেক্ষাকৃত বৃহত্। গ্রামীণ অর্থনীতি সরকার কর্তৃক গৃহীত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি দ্বারা সামান্যই প্রভাবিত হয়। বাংলাদেশে অর্থনীতি জনগণকেন্দ্রিক হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে সাধারণ জনগণ ও সরকারের মাঝে স্বচ্ছতার বিধানে বিদ্যমান ফারাক অতি বৃহত্।
জনগণ ও রাষ্ট্র এক অবিচ্ছেদ্য বিষয়। সরকার একটি স্বল্পস্থায়ী প্রতিষ্ঠান মাত্র এবং জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কই রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সরকারের বৈধতা দেয়। তাই জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক অতিগুরুত্বপূর্ণ এবং এই সম্পর্ক সুদৃঢ় ও স্বচ্ছ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ঐ দৃঢ়তা ও স্বচ্ছতা বিধানের মাধ্যম। সরকারের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড জনগণকে সম্পৃক্ত করে, জনগণকেন্দ্রিক এবং সব জনগণের জন্য সমভিত্তিক হতে হয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পদ্ধতিই জনগণ, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক ও জবাবদিহি অধিকতর নিশ্চিত করে বলে বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ধ্যানধারণা রয়েছে। যদিও গণতন্ত্র বর্তমানে দলতন্ত্রে পরিণত হয়েছে, বিভিন্ন দূষণে দুষ্ট এবং বিশ্বব্যাপী এখন অনেকটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত। জনগণ এখনো শোষণের শিকার। এই শোষণে রাষ্ট্র ও সরকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। অসম বণ্টন ও সুযোগ-সুবিধার বিষম ব্যবহার বর্তমান বিশ্বের বড় একটি সমস্যা। এটি একটি দুষ্টচক্রে পরিণত হয়েছে। জনগণ ও দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এই রাহুগ্রাস থেকে নিষ্কৃতি নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্রুত ও অধিকতর অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনের জন্য বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হতে হলে বাংলাদেশের দ্রুত সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করতে হবে। এজন্য নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এই বিকেন্দ্রীকরণ দ্রুত সার্বিক উন্নয়নের সোপান হতে পারে। এই উদ্দেশ্যে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে জাতীয় বাজেট বরাদ্দ এলাকা ও কেন্দ্রের মাঝে গ্রহণযোগ্য অনুপাতে বিভাজন করা যায়। নির্বাচনি এলাকার গণপ্রতিনিধি মাননীয় সাংসদ আন্তরিকতা, সততা, কর্মদক্ষতা এবং আইনানুগভাবে নিজ নির্বাচনি এলাকায় এসংক্রান্ত গুরুদায়িত্ব পালন করতে পারেন।
কেন্দ্র ও এলাকার মধ্যে কর্মকাণ্ড, যেমন—নৈমিত্তিক, সেবা, উন্নয়ন ইত্যাদির দায়িত্ব বণ্টন করা যেতে পারে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিদ্যুত্ বা রাস্তার কথা উদাহরণ স্বরূপ ধরা যায়। কেন্দ্র এলাকায় বিদ্যুেকন্দ্রে বিদ্যুত্ সরবরাহ করে বিক্রি করবে। আর নির্বাচনি এলাকা বিদ্যুত্ ক্রয়, বিতরণ, বিক্রি ও বিক্রি-উত্তর সার্বিক সেবা প্রদান করবে। মূল সড়ক কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবে, এলাকার রাস্তাঘাট থাকবে নির্বাচনি এলাকার জনপ্রতিনিধির দায়িত্বে। কেন্দ্র ও নির্বাচনি এলাকার মধ্যে বাজেট বিভাজন জনগণ ও রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবে। এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন জনগণের জন্য, জনগণকে নিয়ে রাজনীতি ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করবে। রাষ্ট্রীয় বাজেটের একটি অংশ সরাসরি এলাকায় ব্যয় হলে জনগণ রাষ্ট্রের কাছে থেকে কী পেল, তা প্রত্যক্ষ করবে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনুধাবন করবে। এজন্য তারা ট্যাক্স-ভ্যাট ইত্যাদি প্রদানে আরো উত্সাহিত হবে। একজন গণপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, তার স্বভাব, চরিত্র, সুস্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা, আন্তরিকতা, সততা, দূরদর্শিতা, মননশীলতা ইত্যাদির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সচেষ্ট হবে। কারণ সাংসদ প্রত্যক্ষভাবে তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত হবেন। জনগণ যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট প্রদানে অধিক সজাগ হবে।
শতকরা ২৫/৩৫/৪৫ ভাগ সরাসরি এলাকা পেতে পারে এবং ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য কর্ম পদ্ধতির দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে। এলাকার প্রাপ্তি মাথাপিছু হিস্যা অনুযায়ী হওয়াই যথাযথ। তবে কাস্টেড ভোট সংখ্যাভিত্তিক হলে গুটি কতক অর্জন বাড়বে। ভোট সংখ্যাভিত্তিক হলে ভোটে জনগণের অংশগ্রহণ স্বপ্রণোদিত ও নিশ্চিত হবে। নির্বাচনে স্বল্প কাস্টেড ভোটের যে অভিযোগ, তা দূর হবে। অতি অধিক ভোটার উপস্থিতি ঘটবে বিধায় ভোট কারচুপি দূর হবে, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব অকার্যকর হয়ে পড়বে। জনগণের রাষ্ট্রীয় অধিকার ভোট এবং এটি সরকার ও রাষ্ট্রের সেতুবন্ধস্বরূপ। ভোটের সঙ্গে প্রাপ্তির সরাসরি সংযোগ না থাকায় অধনী দেশে ভোটের গুরুত্ব জনসাধারণ মূল্যায়ন করে না। নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব না হলেও বর্তমানে ভোটদানে অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য জনগণকে আহ্বান করতে হয়। অথচ উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্যেই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কাস্টেড ভোটের সংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হলে গণতন্ত্রের বিদ্যমান দূষণ কিছুটা হলেও দূর হবে।
রাজধানী, সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইত্যাদির অবদান বা জনগণের প্রাপ্ত উপকার একজন ব্যক্তির অবস্থানগত দূরত্বের কারণে কমতে থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় এসব সম্পদের উপকার পাওয়ার অধিকার সব নাগরিকের সমান এবং রাষ্ট্রই ঐ অধিকারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করবে। এজন্য যোগাযোগব্যবস্থার আরো উন্নয়ন প্রয়োজন। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে আনতে হবে। বাজেটে এলাকাভিত্তিক বরাদ্দ প্রদান অনেক সমস্যার সমাধান এনে দিতে পারে। সরকারের সব কর্মকাণ্ড জনগণের অর্থ দ্বারা পুষ্ট। অতএব, নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা রাষ্ট্রীয় অর্থভান্ডারকে আরো স্ফীত করতে পারে।
লেখক: চেয়ারম্যান, আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লি.। সভাপতি, অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সপোর্ট অরিয়েন্টেড শিপ বিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশ