ঘাটতি কমাতে ভোলায় গ্যাস উৎপাদন বাড়াচ্ছে সরকার

দেশে গ্রাহক পর্যায়ে চলছে গ্যাসের তীব্র সংকট। চাহিদা অনুযায়ী জোগান নেই ডলার ও টাকার। ফলে এলএনজি আমদানিও সীমিত করতে হচ্ছে সরকারকে। ফলে ঘাটতি কমাতে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে জোর দিয়েছে সরকার। এমন প্রেক্ষাপটে দক্ষিণের দ্বীপজেলা ভোলার তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

ভোলায় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলো হলো শাহবাজপুর, ভোলা-নর্থ ও ইলিশা। তিন ক্ষেত্রে মোট ১ হাজার ৪৩৩ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রয়েছে। বর্তমানে প্রমাণিত মজুত রয়েছে ১ হাজার ২৭৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে আবাসিক সংযোগে ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয় শিল্পকারখানা তেমন ছিল না। আর চারদিকে পানিবেষ্টিত বলে ভোলার গ্যাস রাজধানী ঢাকা বা পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে এখনো নেওয়া যায়নি। এ জন্য পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সব মিলিয়ে এই লাইন সম্পন্ন করতে আরো কমপক্ষে তিন বছর লাগবে। তাই শিল্পকারখানায় বিদ্যমান গ্যাস-সংকট কমাতে গত ডিসেম্বর থেকে বিশেষ গাড়িতে পরিবহনে করে ভোলার বাইরে গ্যাস নেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গী হয়েছে বেসরকারি কোম্পানি ইন্ট্রাকো। ইতিমধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও ময়মনসিংহের চারটি কারখানায় গ্যাস (সিএনজি) সরবরাহ শুরু হয়েছে।

বিচ্ছিন্ন জনপদ হওয়ায় ভোলার গ্যাসের বড় অংশ সেখানেই ব্যবহারের চিন্তা করছে সরকার। এজন্য একটি সার কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে সিরামিকস কারখানা স্থাপন করেছে শেলটেক।

ভোলায় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন অবস্থা পর্যালোচনা করতে গত বৃহস্পতিবার গ্যাসক্ষেত্র এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এ সময় আরো গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি গ্যাসের প্রয়োজনীয় ও টেকসই ব্যবহার বিষয়ে ধারণা দেন তিনি। নসরুল হামিদ বলেন, ভোলায় পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে। এর ব্যবহার বাড়াতে সরকার নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে শিল্প উৎপাদন বাড়ানো অন্যতম বড় লক্ষ্য। দেশের গ্যাস ঘাটতি কমাতে বা দূর করতে এই জেলা বড় ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, ভোলায় সার কারখানা করার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। ঢাকার গ্যাস-সংকট কাটাতে ভোলা থেকে সিএনজি আকারে গ্যাস সরবরাহ করা শুরু হয়েছে। সামনে এটি বাড়বে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ভোলার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে প্রথমে বরিশালে নেওয়া হবে। এরপর পাইপলাইনটি খুলনা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। শিল্প সংযোগে
অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

ভোলায় সার কারখানা নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই

ভোলায় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে গত বছরের ডিসেম্বরে সমীক্ষা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারপ্রধানের এই নির্দেশনার পর শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে সমীক্ষা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার কারখানা নির্মাণের জন্য সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ফেরিঘাট এলাকা, বাগমারা ব্রিজ-সংলগ্ন এলাকা এবং বোরহানউদ্দিন উপজেলায় তেঁতুলিয়া নদীর পাড়কে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই তিন স্থানের যেকোনো একটি সার কারখানা নির্মাণের জন্য নির্বাচিত করা হবে বলে শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এ জন্য আগামী ৩০ বছরে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তা খতিয়ে দেখছে তারা।

সিএনজি আকারে ঢাকায় আসবে ভোলার গ্যাস

গত ২১ ডিসেম্বর থেকে সীমিত পরিসরে সড়কপথে সিএনজি আকারে ঢাকায় আসছে ভোলার গ্যাস। দৈনিক গড়ে ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ঢাকায় আনছে বেসরকারি কোম্পানি ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং। সরকার তাদের দৈনিক মোট ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট সিএনজি আকারে সরবরাহ করার অনুমোদন দিয়েছে। বাকি ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সিএনজি আকারে আগামী জুলাই-আগস্ট থেকে নৌজাহাজ বা ক্যারিয়ারের মাধ্যমে সরবরাহ শুরু হবে। ইন্ট্রাকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ আলী বলেন, 'এখন ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সিএনজি আকারে ঢাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। আগামী জুলাই-আগস্ট নাগাদ বাকি ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করব।' তিনি জানান, ঢাকার শিল্প কারখানায় এখন সিএনজিতে রূপান্তরিত গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। শিল্পমালিকেরা এই গ্যাসে আস্থা রাখতে শুরু করেছেন।

আরও পাঁচটি অনুসন্ধান কূপ খনন

১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাঁচিয়া ইউনিয়নের শাহবাজপুরে গ্যাসের অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে বাপেক্স। ১৯৯৪ সালে শাহবাজপুরে, ২০১৭ সালে ভোলা নর্থে এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে ইলিশায় পৃথক তিনটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে সরকার। এসব গ্যাসক্ষেত্রের ৯টি কূপে গ্যাসের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে শাহবাজপুরে পাঁচটি কূপ উৎপাদনরত। বাকিগুলোতে এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শোয়েব জানান, ভোলায় আরো বেশি পরিমাণ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ২০২৫-২৬ সালকে টার্গেট করে আরও অন্তত পাঁচটি নতুন গ্যাসকূপ খননের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। রাশান কোম্পানি গ্যাজপ্রমের সঙ্গে যৌথভাবে সমীক্ষা চালিয়ে ৯টি সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে ভোলায় আরো চারটি কূপ খনন করা হবে। বাপেক্স ২০২৮ সালের মধ্যে মোট ১৮টি কূপ খননের মাধ্যমে ৩৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এছাড়া ভোলার চরফ্যাশন, মনপুরা, জাহাজমারা পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার বর্গকিলোমিটারে ত্রিমাত্রিক জরিপকাজ পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া নদী এলাকায়ও দ্বিমাত্রিক জরিপ করা হবে। দৈনিক উৎপাদিত গ্যাস ভোলার তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্প ও আবাসিক খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে।