স্বাধীনতার পরপরই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সংকোচন, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিল্পনীতি, বিশেষ করে ১৯৮২ সালের শিল্পনীতিতে বেসরকারি খাতকে ক্রমান্বয়ে উন্মুক্ত করা হয়। এরপর ১৯৮৬ সালের সংশোধিত শিল্পনীতি এবং ১৯৯১ সালের পরবর্তী শিল্পনীতিগুলোতে বেসরকারি খাতকে আরো উন্মুক্ত করা হয়। ফলে ব্যক্তি উদ্যোগে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে। রপ্তানি আয় বাড়তে থাকে, আমদানিও সংগত কারণে বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে আয় ও সম্পদের বৈষম্যও বাড়ে। এই বৈষম্য সময়ের ব্যপ্ত পরিসরে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয়ের জরিপে আয় ও সম্পদ বৈষম্যের উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। গিনি সহগ দ্বারা আয়বৈষম্য পরিমাপ করা হয়। সবার আয় সমান হলে সূচক হবে ০ (শূন্য)। সব আয় এক জনের হাতে গেলে সূচক হবে ১ (এক)। এ দুই সীমার মধ্যে সূচক যত বাড়বে, অসাম্য তত বেশি হবে।
২০১০ সালে আয়বৈষম্য ছিল ০.৪৫৮। ২০২২ সালে তা ০.৪৯৯-এ উন্নীত হয়। সহগ ০.৫০০ পেরোলে উচ্চ বৈষম্যের দেশ বিবেচিত হয়। প্রাপ্ত তথ্য থেকে স্পষ্টতই প্রতিভাত হয় যে, আমাদের দেশে আয় বৈষম্য গভীরতর হচ্ছে।
১৯৭৩-১৯৭৪ অর্থবছরে দেশের সবচেয়ে বিত্তবান ১০ শতাংশ মানুষের অধিকারে ছিল ২৮ শতাংশ আয় বা সম্পদ। আর সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল ২.৮ শতাংশ আয়। ২০২২ সালে এসে সবচেয়ে বিত্তবান ১০ শতাংশ মানুষের হাতে আয় পুঞ্জীভূত হয়েছে ৪০.৯২ শতাংশ। আর ২০২২ সালে সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষের আয় হ্রাস পেয়ে ১.৩১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
আরো কিছু উদ্বেগজনক তথ্য হলো, সম্পদ ও অর্থ কতিপয় মানুষের হাতে দ্রুতহারে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। (ক) ২০২৩ সালের জুন মাসে ব্যাংকগুলোতে ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে আমানত ছিল ১ হাজার ৮২৪টি হিসাবে। অথচ মাত্র তিন মাস আগে মার্চ, ২০২৩ পর্যন্ত এ ধরনের হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৫৮টি। ২০২৩ সালের জুনে ১ হাজার ৮২৪টি ব্যাংক হিসাবে মোট আমানত ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ব্যাংক আমানতের ১৫.৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ১ কোটি ও বেশি আমানত সংবলিত ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা শুধু এক বছরে (ডিসেম্বর ২০২১—ডিসেম্বর ২০২২) ৭ হাজার ৯৭০টি বেড়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ধরনের একাউন্ট হোল্ডার ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের প্রায় ৪৩ শতাংশের মালিক। (খ) এ দেশ থেকে শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে (ওভার ইনভয়েসিং-আন্ডার ইনভয়েসিং) প্রতি বছর কম-বেশি ৬৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। (গ) ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই যাচ্ছে। প্রদর্শিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু প্রকৃত হিসাবে তা ৩ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করবে। ব্যাংক খাতে খুব দুর্বল ঋণ মোট ঋণের ২০ শতাংশের ওপরে। (ঘ) সিপিডির এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, প্রতি বছর কর ফাঁকির কারণে দেশ ৪১ হাজার কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। (ঙ) একটি দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়ার উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে এই হার মাত্র ৭.৯ শতাংশ। শুধু তাই নয়, এ দেশে প্রত্যক্ষ কর খুবই কম। পরোক্ষ কর তথা ভ্যাট, শুল্ক ইত্যাদি তুলনামূলক বেশি, যা গরিব, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কাছ থেকে আদায় করা হয়। (চ) চলমান মূল্যস্ফীতির (৯.৪১ শতাংশ) কারণে গরিব মানুষের প্রকৃত আয় ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। (ছ) অন্যদিকে, শ্রমিকদের মজুরি আনুপাতিক হারে বাড়ছে না। এ দেশে মজুরির হার সর্বনিম্ন। সিপিডির সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, শ্রমিকদের মাসিক মজুরি চীনে ৩০০ মার্কিন ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ২৪৩ মার্কিন ডলার, কম্বোডিয়ায় ২০০ মার্কিন ডলার, ভারতে ১৭২ মার্কিন ডলার এবং ভিয়েতনামে ১৭০ মার্কিন ডলার। অথচ এ দেশে এই মজুরি মাত্র ৭২ মার্কিন ডলার। চা-শ্রমিকদের মজুরির হার আরও কম। (জ) দেশের একাদশ ও দ্বাদশ সংসদে সদস্যদের যথাক্রমে প্রায় ৬২ ও ৬৬ শতাংশ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। দেশের রাজনীতিতে পুঁজিপাত শ্রেণির প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। (ঝ) কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি দৃশ্যমান হচ্ছে। ব্যাপক কর্মসংস্থান হলে গরিব জনগোষ্ঠীর আয় ও সম্পদ বাড়ত। কিন্তু তা হচ্ছে না। (ঞ) দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামায় আয়-ব্যয় ও সম্পদের তথ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রার্থীদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির হার রীতিমতো উদ্বেগজনক, রীতিমত বিস্ময়কর!
পুঁজিবাদী সমাজ বিকাশের একটা বৈশিষ্ট্য হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে আয় ও সম্পদবৈষম্য বাড়বে। পরবর্তী সময়ে এই বৈষম্য হ্রাস পেয়ে সহনীয় পর্যায়ে আসবে। কিন্তু এ দেশে ৫২ বছরেও তা হয়নি। দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন উপায়ে পাচার হচ্ছে। এর ক্ষতিকর দিকগুলো হলো নৈতিকতার ধস, দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ, নিজের দেশে বিনিয়োগে চরম অনীহা, বিদেশেই অর্থ রাখা নিরাপদ মনে করা।
ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কম-বেশি স্থবির। জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার কম-বেশি ২৪ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে এই হারের কোনো প্রবৃদ্ধি নেই। এছাড়া জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদানও তেমন একটা বাড়েনি (গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ)। হতাশার তথ্য হলো, ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় দেশে আসেনি।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমানের তেমন দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। উপরন্তু, বিভিন্ন কারণে (যথা :মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার ত্রুটি, সিন্ডিকেটের সীমাহীন দৌরাত্ম্য, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ইত্যাদি) দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান হ্রাস পেয়েছে। তাহলে সম্পদ ও আয় কেন্দ্রীভূত রাখার যৌক্তিকতা কী?
সময় এসেছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়ার। বিদ্যমান যে ব্যবস্থা আছে (বিভিন্ন ধরনের ভাতা, টিআর, কাবিখা, ভিজিডি ইত্যাদি), তা খুবই অপ্রতুল।
সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো হলো :সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১০ শতাংশ মানুষকে জেলাভিত্তিক চিহ্নিত করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ড এই তালিকা তৈরি করলে উপজেলা প্রশাসন যাচাই-বাছাই করতে পারে। তালিকা মোতাবেক খানাভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বর্ধিত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা ছাড়াও আয় বর্ধন কাজে পর্যায়ক্রমে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। সেনাবাহিনীর সদস্যদের রেশনের ন্যায় কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে জীবনযাপনের ন্যূনতম মুদি পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বিনামূল্যে বই ও ডে-মিল দেওয়া ছাড়াও আরো সুযোগ-সুবিধা পর্যায়ক্রমে প্রদান করা যেতে পারে—(ক) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে দুই সেট স্কুল পোশাকের সমপরিমাণ অর্থ প্রদান, প্রতিটি অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীকে বাত্সরিক খাদ্যভাতা প্রদান।
স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সবচেয়ে ১০ শতাংশ গরিব পরিবারকে স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা যেতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিক আরো উন্নত করা দরকার। সাধারণ অসুখ-বিসুখের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে বিনা মূল্যে প্রদান করা। ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও হ্রাসকৃত মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রশ্ন হলো, এত অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে? কর ফাঁকি রোধ করলেই তো বছরে ন্যূনতম ৪০ হাজার কোটি টাকা পাওয়া যাবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির কম অগ্রাধিকারসম্পন্ন প্রকল্পসমূহ বন্ধ করলে কয়েক হাজার কোটি টাকার সংস্থান হবে। ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং কমালে বছরে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাওয়া যাবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা গেলে মূলধন ঘাটতির জন্য রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা দিতে হবে না। এখানে কয়েক হাজার কোটি টাকার সংস্থান হবে। সর্বোপারি, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন অফিসের দুর্নীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারলে অর্থের মোটেও অভাব হবে না। এসবের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সম্পদ ও আয়ের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি এবং কল্যাণকর ও মানবিক সমাজ গঠনে মোটেও সহায়ক নয়। দীর্ঘ মেয়াদে এই প্রকট আয় ও সম্পদের বৈষম্য দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক