মা হ বু ব আ ল ম
বাংলাদেশে এখন যে ক’টি নাটকের দল মঞ্চে নিয়মিত নাটক করছে, তাদের অন্যতম পালাকার। পালাকার নাট্যদলের দলপ্রধান নির্দেশক আমিনুর রহমান মুকুল সম্প্রতি মঞ্চে এনেছেন প্রায় শত বর্ষ পুরনো পাণ্ডুলিপি ‘পৌরাণিক পঞ্চরং’। রোমান্টিক কমেডি ধাঁচের এই নাটকের নাম দিয়েছেন ‘w/rong লেগেছে’। নাটকের নামকরণের মধ্যেই একধরনের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় স্পষ্ট দেখা যায়। সেখানে ইংরেজি শব্দটিকে ভেঙে এমনভাবে লেখা, তাতে ভুলের আশঙ্কা যেমন আছে, তেমনি আছে ভুল করে রঙে মেতে ওঠার সম্ভাবনাও। যা হোক, সিংহলের সেনাপতি রণবীর ও তার স্ত্রী মেঘমালার প্রেমের গভীরতা মাপার জন্য স্বর্গ থেকে দেবতা ইন্দ্রের নির্দেশে মর্ত্যে নেমে আসে মদন ও বসন্ত দেব। মদন দেব রণবীরের ছদ্মবেশ নেয়। আর রণবীরের চাকর শশীর ছদ্মবেশ নেয় বসন্ত দেব। এরপর তারা রণবীরের বাড়িতে আসে। মদন দেব রানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে লিপ্ত হয়। দর্শকের অন্তত তা-ই মনে হয়। ছদ্মবেশী মদন দেব প্রেমের অভিনয় করে রানির সঙ্গে। দুজনে মিলিত হয়, কিন্তু মদন দেবকে সন্দেহ করে দাসী কাতি। সে রানির বিছানায় পিঁপড়া দিয়ে রাখে যেন সেনাপতি বিছানায় থাকতে না পারে। তবে ঘুরে ফিরে আবার রানির ভালোবাসা পেতে ফিরে আসে ছদ্মবেশী মদন দেব। রানির সঙ্গে রাত কাটায়। এদিকে যুদ্ধ শেষে বাড়িতে ফিরে আসে সেনাপতি রণবীর এবং তাঁর চাকর শশী। ফিরে এসে হতবাক হয়। অবশ্য শশীর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রেই দেখা হয় বসন্ত দেবের। শশী দেখে তার মতোই আরেক শশীকে। ঘাবড়ে যায় সে। তার প্রভু রণবীরকে সে বারবার বলে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। বরং সেনাপতি রণবীর তাকে প্রহার করে। বাড়িতে ফিরে এসে রণবীরের ধারণা পাল্টে যায়। সে দেখে তার স্ত্রীর কথা আর চালচলন বদলে গেছে। সে তার স্ত্রীকে সন্দেহ করে। কিন্তু চাপা এবং পাতি যেভাবে রানির পক্ষ নিয়ে কথা বলে তাতে আরো বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে সে। রানি মদন দেবের সঙ্গে হাসিমুখে শয়ন কক্ষ থেকে ফিরে এলে বিপাকে পড়ে রণবীর। অবশেষে সে দেখে রানি ছদ্মবেশী মদন দেবকে বেশ ভক্তি করছে। তারা দেখতে পায় দেবতার আসল রূপ।
নাটকে নির্দেশক আমিনুর রহমান মুকুল অভিনেতাদের রূপ বদলে দেওয়ার জন্য যে মুখোশ ব্যবহার করেছেন, তা বেশ ভালো। তবে এই নাটকে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার যে বিষয়, সেটি হলো আলোর ব্যবহার। অভিনয়ের সময়ই অভিনেতার হাত দিয়ে আলোর ব্যবহার একেবারে নতুন না হলেও অনেকটা নতুন। সেই সঙ্গে আলো দিয়ে মঞ্চ নির্মাণ সাজেসস্টিভ সেটকে আরো রাঙিয়ে দেয়। সত্যিই w/rong হয়ে ওঠে রং। নাটকের গল্পের কারণে দর্শকের মনে যে ভুলের সৃজন হয়, তা কিছুটা অশ্লীল মনে হলেও তার রং ছড়িয়ে পড়ে দর্শকের মনে। রঙেঢঙে বেশ রোমাঞ্চকর ‘w/rong লেগেছে’। দর্শক বেশ আনন্দের সঙ্গে সেগুলো উপভোগ করে। তবে নির্দেশক আমিনুর রহমানের আগের নির্মাণের সঙ্গে এই নাটককে অনেকাংশেই মেলানো যায় না। সে দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বেশ সহজ হয়ে গেছে। মোদ্দা কথায় সাধারণ নির্মাণ। তবে নাটকটি যেহেতু পালাকারের নতুন নাট্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্মাণ করা হয়েছে, সেহেতু এমন সহজ নির্মাণ একেবারেই মানানসই।
নাটকে নতুন নাট্যকর্মীদের অভিনয় দক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও মদন দেবের চরিত্রে বাবর খাদেমী দলের বেশ পরীক্ষিত ও দক্ষ অভিনেতা। নিঃসন্দেহে তিনি খুব ভালো অভিনয় করেছেন। তবে নতুন যাঁদের বলা হচ্ছে, তাঁদের কাউকেই একেবারে নতুন বলার অবকাশ আছে বলে অভিনয় দেখে মনে হয়নি। মেঘমালা চরিত্রে ফাহমিদা মল্লিক শিশির, চাঁপা চরিত্রে তামান্না ইয়াসমিন স্বর্ণা এবং শশী চরিত্রে শাহাদাত সাব্বির অনেক সাবলীল ছিলেন। তবে অনবদ্য অভিনয় করেছেন কাতি চরিত্রের শাহনাজ আঁখি। বাকিদের মধ্যে যা একটু-আধটু ঘাটতি আছে, তা নির্দেশক ঝালিয়ে নিতে পারবেন নিশ্চয়। নাটকের অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন আসাদুজ্জামান শুভ, রিয়াজ হোসেন, মিশকাতুর রহমান মুরাদ ও রিয়াজ হোসেন।