গাজার প্রায় সব শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে: ইউনিসেফ

গাজার প্রায় সব শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে ইউনিসেফ। এজন্য তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দরকার। এদিকে ইসরাইল-গাজা যুদ্ধনীতির প্রতিবাদ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আট শতাধিক কর্মকর্তা।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি ছিটমহল গাজার আনুমানিক ১৭ হাজার শিশু যুদ্ধের মধ্যে সঙ্গীহীন বা তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে আর ভূখণ্ডটির প্রায় সব শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দরকার বলে বিশ্বাস তাদের। অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোর জন্য ইউনিসেফের যোগাযোগপ্রধান জোনাথন ক্রিক্স শুক্রবার বলেন, তাদের মধ্যে ক্রমাগত অতি উচ্চমাত্রার উদ্বেগ, ক্ষুধামন্দের মতো বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তারা ঘুমাতে পারে না, তাদের মধ্যে আবেগে ফেটে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে আর বোমার প্রতিটা শব্দে তার আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে।

এই যুদ্ধ শুরুর আগেই গাজার ৫ লাখ শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সমর্থন প্রয়োজন বলে ইউনিসেফ বিবেচনা করেছিল। আজ আমাদের হিসাবে গাজার প্রায় সব শিশুর ঐ সহায়তগুলো দরকার আর তাদের সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি।

গাজা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৭ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে সাড়ে ১২ হাজারের ব্যয়স ১৮ বছরের নিচে। আরো বহু মানুষ আহত হয়েছে। যাদের অনেককে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবে। যদিও গাজা যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র পাওয়া খুবই কঠিন। তবে ইউরো-মেডিটেরানিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজায় ইসরাইলের হামলায় ২৫ হাজারের বেশি শিশু বাবা অথবা মা অথবা বাবা-মা উভয়কেই হারিয়েছে।

৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলের অবিরাম হামলা ও কঠোর অবরোধের মধ্যে ছোট্ট ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজার সব জায়গায় ক্ষুধা ছড়িয়ে পড়েছে। এর ২৩ লাখ বাসিন্দার সবাই ক্ষুধার্ত। তারা ইসরাইলের বিরামহীন বোমা হামলার মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, ভূখন্ডটির অনেক এলাকা ইতিমধ্যে দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আট শতাধিক কর্মকর্তা এক বিবৃতিতে তাদের দেশগুলোর সরকারের নীতি 'আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন' হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের ৮০০ জনের বেশি কর্মকর্তা ইসরাইল-গাজা যুদ্ধে তাদের নিজ নিজ দেশের সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। তাতে সরকারের এই নীতি 'অন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন' হতে পারে বলে সতর্ক করেন তারা। ট্রান্স-আটলান্টিকে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের প্রশাসন এ শতাব্দীর সবচেয়ে বাজে একটি মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনায় সহযোগী হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে। অথচ তারা কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞ পরামর্শকে আমলে নিচ্ছে না- সরকারি কর্মকর্তাদের এমন প্রতিবাদ ইসরাইলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা মিত্রদেশের সরকারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ভিন্নমতেরই সর্বসাম্প্রতিক লক্ষণ।

বিবৃতিতে সই করা এক কর্মকর্তা, যার এক জন মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগে কাজ করার ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা আছে, তিনি বলেছেন, সরকার তাদের উদ্বেগ বিবেচনাতেই নেয়নি। তিনি বলেন, যারা ঐ অঞ্চল এবং এর গতিপ্রকৃতিকে বোঝেন, তাদের কন্ঠ শোনা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই কর্মকর্তা বলেন, এখানে সত্যিই যে বিষয়টি ভিন্ন, সেটি হচ্ছে-আমরা কোনো কিছু প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছি তা নয়, বরং আমরা সক্রিয়ভাবে দুষ্কর্মে জড়িত হচ্ছি। আমি যতদুর মনে করতে পারি, এটি অন্য যে কোনো পরিস্থিতি থেকে মৌলিকভাবে আলাদা।

বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ১১টি ইউরোপীয় দেশের সরকারি কর্মকর্তারা সই করেছেন। এতে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরাইলের সামরিক হামলার কোনো সীমা নেই। এর ফলে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা ঠেকানো সম্ভব ছিল। তাছাড়াও ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে সাহায্য বন্ধ করে রাখায় গাজার আরো হাজার হাজার অধিবাসী অনাহার এবং ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমাদের দেশগুলোর সরকারের নীতি অন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন, যুদ্ধাপরাধ এমনকি জাতিগত শুদ্ধি অভিযান কিংবা গণহত্যার শামিল হওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি এখানে আছে।