ছেলেবেলায় ‘বঙ্গমাতা’র শেষ দুই পঙ্ক্তি : সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর একধরনের বিতৃষ্ণা চলে এসেছিল। ভাবতাম, কবিগুরু নিজে বাঙালি হয়েও কী করে পারলেন এ মন্তব্য করতে!
সে প্রশ্নের উত্তর পেতে অবশ্য বেশি বেগ পেতে হয়নি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক জনসভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘কবিগুরু দেখে যাও, বাঙালি মানুষ হয়েছে...।’ মনে মনে ভাবলাম, যাক, বাঙালির নেতা উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে। কিন্তু কিছুদিন পরই এই বাঙালিরাই যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করল, তখন কবিগুরুর উক্তির যথার্থতা আবার প্রমাণিত হয়ে গেল। নিজেদের অমানবিক, স্বার্থপর আচরণ দ্বারা আমরা কবিগুরুর এই বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করেছি বার বার। কটাক্ষ এবং সমালোচনায় আমরা মারমুখো। মতদ্বৈততা ও দ্বিধা আমাদের স্বভাবসুলভ মানসিকতা।
আমরা বাঙালি এক মজার জাতি। বাংলার জন্য আমাদের যেমন অন্তর পোড়ে, তেমনি বাংলা নিয়ে নাক সিঁটকানোও এখন আমাদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যেমন ধরুন, বিদেশি মদের দাম যখন খুব বেড়ে যায় তখন শ্রেণি-সচেতনতা ভুলে অনেক উচ্চ শ্রেণি কেরু কোম্পানির মদ খান। কাব্য করে তখন বলেন, এটা কিন্তু ‘এক্সপোর্ট’ কোয়ালিটি যদিও ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’! এর চেয়েও নিচে নেমে যখন বলা হয়, ‘বাংলা’ আছে, খাবেন? ঠিক তখনই বাঙালি অপমানবোধের জ্বালায় উন্মাদে পরিণত হয়।
বাঙালি একটু জটিল। অনেকটা জিলাপির প্যাঁচের মতো। ধরুন, পাঁচ বছর প্রেমের পর আপনার প্রেমিকা হয়তো অন্য কাউকে বিয়ে করে চলে গেছে। একদিন মদ খাবার পর আপনার ফিলিংস যখন চরমে তখন ভাবলেন, প্রতিশোধমূলক কিছু একটা করা দরকার। আপনি পানশালা থেকে সোজা বেরিয়ে প্রেমিকার স্বামীর আলিশান বাড়ির গেটে যখন ‘ওপেন হিসি’ করছেন, তখন হয়তো প্রেমিকার স্বামী জায়গামতো টর্চলাইট মেরে জানতে চাইল, ভাই হচ্ছেটা কী? আপনার প্যাঁচানো উত্তর, ভাই, আমি আসলে কাঁদছি। কিন্তু জল যে কোন পথ দিয়ে বের হচ্ছে বুঝতে পারছি না। আজকের দিনে মদ খাওয়া সম্ভবত ঠিক হয়নি।
বাঙালি নাকি ঠিক কাজটা সময়মতো করে না, যখন যেটা করার দরকারÑসময় এলে সেটা নাকি ঠিকই ভুলে যায়। রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস্’! আর প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ বলতেন, ‘বাঙালি নারীর চরিত্র চিত্রণ হয় এটা মেপে যে সে পরপুরুষে আসক্ত কি না! আর পুরুষের চরিত্র বিচার হয় সে মদ্যপান করে কি না!’
বাঙালি নাকি স্বভাবগতভাবেই ফাঁকিবাজ। নিজের দেশে বসে সে পায়ের ওপর পা তুলে খেতে চায়। অন্যকে শাসন করতে চায় আর চাপাবাজি করে নিজের বংশ পরিচয় অন্যদের চেয়ে বড়ো জাহির করে রাজা-উজির মারতে চায়। অথচ কোনো কাজ ভালমতো না শিখে সে জমি বেচে বিদেশ গিয়ে সবচেয়ে বাজে কাজটাই (ইংরেজিতে বলেÑঅড জব) করে। হয়তো বাঙালি ‘অন্যদেশ কাতর’-এর মতো বেশিমাত্রায় ‘পরশ্রীকাতর’! ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘পরশ্রীকাতরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধ হয় দুনিয়ার কোনো ভাষাতেই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, পরশ্রীকাতরতা।’ বাঙালি হয়তো এখনো জানে না, পরশ্রীকাতরতার কারণে তাদের দ্বিগুণ ক্ষতি হচ্ছে।
প্রকৃতিগত কারণে বাঙালি নাকি দারুণ অলস। নিজে গাছ না লাগালেও পাখির মাধ্যমে গাছ হয় এখানে। এই অলসতা কখনো-সখনো নাকি বাঙালিকে কাজে সক্রিয় না রাখলেও বিছানায় সক্রিয় রাখে। একটা পরিসংখ্যান থেকে ব্যাপারটা পরিষ্কার হতে পারে। ১৯৪৭-এ এই মুল্লুকের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে তিন কোটি, ১৯৭১-এ সাড়ে সাত কোটি, ২০২৩-এ এসে নির্ঘাত আঠারো কোটি পার হয়েছে। বাঙালি সংখ্যায় বাড়লেও প্রজননের সৃষ্টিশীলতা ছাড়া অন্যকিছুতেও সৃষ্টিশীল হয়েছে কি না তা এখনো নির্ণীত নয়।
হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘গরীবের সৌন্দর্য’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘যখন তারা একসাথে রুখে ওঠে কেবল তখনি তাদের সুন্দর দেখায়’। রাজনৈতিকভাবে ১৯৭১ আর ১৯৯০ সাল ছাড়া এদেশবাসীর এক হওয়ার নজির আর মেলেনি। বিভাজনই যেন বাঙালির নিয়তি। একাত্তরে আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং সাঁওতাল, ওরাও, মুরং, গারো, চাকমা সকলে মিলে স্বাধীনতা যুদ্ধ করলাম। অথচ এখন মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জায় আমরা বিভক্ত হয়ে আছি। যা-ই হোক, কবি জীবনানন্দ দাশ হাজার বছর ধরে পথ হাঁটলেও, শুধু বনলতা সেনই নাকি তাঁকে মাত্র দু-দণ্ডের জন্য শান্তি দিয়েছিল। অন্তত সেই দু-দণ্ডের শান্তিতে থাকুক বাঙালি।
শুরু করেছিলাম কবিগুরুর কথা দিয়ে, শেষে করছি তাঁর কথা দিয়েই। কবিগুরু যতই অভিমান করে বাঙালিকে গাল-মন্দ করুন না কেন, তিনিই বাঙালিকে উচ্চ আসনে বসিয়েছেন। তিনি লিখেছেন: ‘বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা/সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান ॥/ বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন/এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান॥’