সাক্ষাৎকার

‘এই উপন্যাস আত্মজীবনী নয়’

আপনার সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস ‘ডানাকাটা পরী’ নিয়ে কথা বলি। আপনি প্রায় দুই যুগ ধরে লিখছেন, উপন্যাস লিখতে এতো দেরী করলেন কেনো?

দুটো বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত উপন্যাস লিখতে যে সময় দেওয়া দরকার, সেটা দিতে পারিনি। সাংবাদিকতা করেছি, ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমানে পত্রিকার জন্য লিখতে হয়েছে। এরপর আবার বড় ক্যানভাসের জন্য কিছু লেখার সময়টা বের করে আনতে পারিনি। আরেকটা ব্যাপার ছিলো, সাহসের অভাব। সবসময় মনে হয়েছে, আমি কী আদৌ একটা উপন্যাস লেখার যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছি? নিজেকে এই প্রশ্ন করলে ভয় পেয়েছি।

আপনি ছোট গল্প লিখছেন নিয়মিত। প্রকাশও হচ্ছে। কিশোরদের জন্য সাহিত্য করছেন। তারপরও এই ভয়টা অমূলক ছিলো না?

না, আসলে উপন্যাসকে আমার মনে হয়, সাহিত্যের সাগর-সমান একটা জায়গা। যেখানে আসলে ছোটগল্পের মত একটা চমক দিয়েই কাজ শেষ করে ফেলা যায় না। এখানে অনেক ডিটেইলিংয়ের ব্যাপার আছে। আছে ভাষার কারুকাজের ব্যাপার, সেই সাথে চরিত্রগুলোর বিকশিত হয়ে ওঠার চাহিদা থাকে। এসব না করেও একটা আট-দশ ফর্মার বই তো বের করে ফেলা যায়। কিন্তু সেটা উপন্যাস হলো কি না, সেই ভয় থাকে। আমি যেমন এখনও নিশ্চিত নই, আমার এই বইটা আদৌ উপন্যাস হয়েছে কি না।

‘দ্বিতীয় প্রেম, প্রথম খেলার আগে’ নামে আপনার একটা বই ছিলো। সেটা থাকতেও ডানাকাটা পরীকে কেন প্রথম উপন্যাস বলছেন?

আমি বলছি প্রথম পূর্নাঙ্গ উপন্যাস। বলা যেত যে, প্রাপ্তবয়ষ্কদের জন্য প্রথম উপন্যাস। সেটা বললে আবার অর্থ বদলে যেত। আসলে ‘দ্বিতীয় প্রেম...’ ছিলো টিনএজ রোমান্টিক একটা উপন্যাস। খেলা উপজীব্য করে খেলা। সবমিলিয়ে ওটাকে আমার উপন্যাস মনে হয়নি।

এই উপন্যাসটার কথায় আসি। নামকরণটা আমার কাছে একটু ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে-ডানাকাটা পরী। এটা কী পাঠক টানার জন্য?

দেখুন, পাঠক টানার জন্য তো চাইলে অনেক কিছু করা যায়। অন্তত নামটা সে জন্য দেইনি। এই নামটার সাথে উপন্যাসটার দুটো সম্পর্ক আছে। প্রথমত এই উপন্যাসটার প্লাটফর্ম হচ্ছে যাত্রা অভিনয়। এখানকার ভালো, খারাপ; অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ন চরিত্রের পরিচয়-তারা যাত্রা অভিনেতা। যাত্রাকে কেউ বিপ্লবের অংশ হিসেবে নিয়েছে, কেউ বা এই করে স্রেফ নিজেকে টিকিয়ে রাখছে। তো আগে যখন এই যাত্রার মাইকিং হতো গ্রামে, তখন বলা হতো, ‘এই যাত্রা পালায় আপনারা আরও দেখতে পাবেন এক ঝাক ডানাকাটা পরীর ঝুমুর ঝুমুর নৃত্য’। এই ডানাকাটা পরী টার্মটা সেই থেকে আমার কানে লেগে আছে। সেটাকে তুলে এনেছি বলতে পারেন।

আরেকটা সম্পর্কের কথা বলছিলেন। সেটা আসলে একটু ইনার মিনিং। উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র হলো অভিনেত্রী সুবর্না। অনেক স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়ে উঠছিল সে। কিন্তু আমাদের সাথে যখন তার পরিচয় হয়, ততোদিনে তার প্রায় সব স্বপ্নের ডানা কেটে দেওয়া হয়েছে। সে তখন নিজেকে বলে- হবু বেশ্যা। এই মেয়েটি আমরা দেখতে পাই আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। অন্তত স্বাধীনভাবে অভিনয়ের স্বপ্ন দেখে সে। এবার তার স্বপ্নের পরিণতি কী হবে আমরা জানি না। তবে এটুকু দেখতে পাই যে, এবারও তার ডানাকাটার ব্যাপক আয়োজন চলছে।

‘হবু বেশ্যা’ কেন বললেন? এটা কী দেহজীবিদের জন্য অবমাননাকর হলো?

আমি তো বলিনি। সুবর্না বলেছে। সে তার ভবিষ্যত দেখতে পায় যে, তাকে একজন বেশ্যা হতে হবে। অভিনয়টা তার জন্য একটা প্লাটফর্ম মাত্র। তাকে তৈরি করা হয়েছে, ওখান থেকে খদ্দের ধরার জন্য। এখন এই বাস্তবতা যে জানে, সে নিজেকে ‘হবু বেশ্যা’ বলাটা তো খুব অযৌক্তিক না।

উপন্যাসের নায়ক বামপন্থী ছাত্রনেতা ছিলো। সে গ্রামে যায় বিপ্লব করতে। এটা কী বাস্তবিক একটা গল্প হলো?

না, এটা অবাস্তব কিছু না। আজও বাংলাদেশের বহু বামপন্থী দল এই ক্লাসিক বিপ্লবের ধারণা বুকে নিয়ে রাজনীতি করে যাচ্ছে। তাদের শেষ অবধি অর্জন যাই হোক না কেনো, এই রোমান্টিক বিপ্লবের স্বপ্নটাকে আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। এটা আছে। অবশ্য এই উপন্যাসে নায়কের গ্রামে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটা ঠিক মাও সেতুংয়ের ‘গ্রামে চলো’ নয়। এটা ছিলো রাজনীতির ভেতর আরেকটা রাজনীতি। মেসটাই আসলে এই উপন্যাসটাকে ভিলেজ পলিটিক্সের দিকে নিয়ে গেছে।

উপন্যাসটা পড়লে ছাত্র রাজনীতিকেও ভিলেজ পলিটিক্সের মত নোংরা একটা ব্যাপার মনে হয়। আসলেই কী তাই?

উদ্দেশ্যমূলকভাবে চরিত্রহনন বা ছাত্ররাজনীতিকে আক্রমণের কোনো ব্যাপার এখানে নেই। কিছু ঘটনা ঘটে যায়। কিছু চরিত্র সব জায়গায় এমন থাকে। সেটাই উঠে এসেছে এখানে। আসলে উপন্যাসের একটা নিজের এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপার থাকে। এখানে সেটাই ঘটেছে। আরোপ করিনি কিছু।

কিছু কিছু ঘটনা এখানে আপনার জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। ডানাকাটা পরী কী তাহলে আত্মজৈবনিক উপন্যাস?

না। এর কিছু কিছু ঘটনার সূত্রপাত আমি দেখেছি। কিন্তু এইসব ঘটনা আমার জীবনে ঘটেনি। অভিজ্ঞতা সরাসরি কখনো উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে না। সেটাকে নিজের মত চলতে দিতে হয়। তবে সেটা উপন্যাস হয়।

আপনার চাওয়া কী। এটা কী জনপ্রিয় উপন্যাস হোক, তাই চান?

অবশ্যই। জনপ্রিয় মানে কী? মানে হলো, অনেক লোকে যেন পড়ে। আমি কেন, সব লেখক তাই চান যে, তার লেখাটা যেন অনেক লোকে পড়ে। তবে আমার ভেতরে ভেতরে চাওয়া হলো, একজন অচেনা পাঠকও যেন উপন্যাসটা মন থেকে পড়ে এটার মূল্যায়ন করেন।

এখন কী লিখছেন? মানে এরপর আরেকটা উপন্যাস পেতে কতটা দেরী হবে?

এতোটা দেরী হবে না। কারণ, পরের উপন্যাসটা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। করোনার সময় নিয়ে উপন্যাসটা লেখা। তবে করোনার টাটকা ভাব থাকতে শেষ করতে চাইনি বলে গত দু বছর শেষ করিনি ইচ্ছে করে। আশা করি আগামী বছর এটা শেষ হয়ে যাবে।

খেলাধুলা নিয়ে লেখা কী বন্ধই করে দিলেন?

পেশা ছেড়ে দেওয়ার পর খেলাধুলা নিয়ে লেখা খুব কঠিন। কারণ, আগে যে কাজটা আমি চাকরির ফাকে করে ফেলতাম, সেই খেলোয়াড়দের সাথে মেশার কাজটা এখন হয় না। তারপরও একটা বই অর্ধেক হয়ে আছে। কোনো একসময় শেষ করে ফেলবো।