এসএমই খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ করে দ্রুত এবং মজবুত শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বে এমন একটি দেশের উদাহরণ দেওয়া যাবে না, যারা এসএমই খাতকে অবজ্ঞা করে উন্নতি অর্জন করতে পেরেছে। এসএমই শিল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এসএমই খাতের উন্নয়ন এবং বিকাশের জন্য ২০০৭ সাল থেকেই এসএমই ফাউন্ডেশন গঠনের কাজ শুরু হয়।

কেউ একজন চাইলেই দক্ষ উদ্যোক্তা হতে পারেন না। এজন্য তাকে বেশ কিছু গুণাবলি অর্জন করতে হয়। তাকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি জ্ঞান থাকাতে হয়। স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ এসএমই শিল্প অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে এবং অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে কাজ করে। আমাদের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য হচ্ছে এসব উদ্যোক্তাকে আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসা। সরকারের যেসব সেবামূলক কারিগরি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে, এসএমই উদ্যোক্তাগণ সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তাদের এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে দিয়ে সহযোগিতা পাওয়ার পথ উন্মুক্ত করে। যে কোনো কাজ সঠিকভাবে করতে হলে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। কারণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই একজন উদ্যোক্তার সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব। আমরা এসএমই সেক্টরের উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযোগী করে গড়ে তোলার কাজ করছি।

সরকার এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন বাস্তবসম্মত কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এসএমই সেক্টরকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এমএমই উদ্যোক্তাদের নানাবিধ সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে এসএমই উদ্যোক্তাগণ তাদের বিকশিত করার সুযোগ পাচ্ছেন। টেকনোলজি ট্রান্সফার এসএমই খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ এসএমই উদ্যোক্তাই এখনো সনাতন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উত্পাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ফলে তাদের উত্পাদনশীলতা পুরো মাত্রায় কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। এখন অনেক এসএমই উদ্যোক্তাই ধীরে ধীরে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত এবং ব্যবহারে উদ্যোগী হচ্ছেন। এসএমই সেক্টরে নতুন নতুন পণ্য অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা এবং উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিও পাচ্ছে। বাংলাদেশে এসএমই ফাউন্ডেশনই প্রথম ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের ক্লাস্টার-ভিত্তিক অর্থায়নের ব্যবস্থা করেছে। এসএমই ফাউন্ডেশন কোনো উদ্যোক্তাকে ঋণ প্রদান করে না। ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করে দেয় মাত্র। অর্থাত্ এসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাঝে যোগসূত্র তৈরি করে দেয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে, আমরা তা দূর করার চেষ্টা করি। এসএমই ফাউন্ডেশন কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। সেই সব চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করে থাকে। এ পর্যন্ত ১৭৭টি ক্লাস্টার চিহ্নিতকরণ করা হয়েছে। আরো কয়েকটি ক্লাস্টার কিছু দিনের মধ্যেই গঠন করা সম্ভব হবে। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে যে বাই প্রোডাক্ট পাওয়া যায়, তা ব্যবহার করে নতুন পণ্য উত্পাদন করা হচ্ছে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে কাজ করা হচ্ছে। মৃিশল্পের সঙ্গে কাজ চলছে। ইমিটেশন জুয়েলারি এবং ক্রিকেট ব্যাট তৈরি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

এসএমই উদ্যোক্তাদের যে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তার পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু আমরা একটি মডেল দাঁড় করাতে চাই। চুক্তিভুক্ত সহযোগী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আমরা বোঝাতে চাচ্ছি এইভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া সম্ভব এবং প্রদত্ত ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে ফেরত আসে। ২০০৯ সাল থেকে এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অথবা সহযোগিতায় যেসব এসএমই উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করেছেন, তাদের কিস্তি ফেরতদানের হার খুবই সন্তোষজনক। এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ খুবই সামান্য। যারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তাদের মনোজগতে এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে এসএমই উইন্ডো খোলে। এখন তা একটি পরিপূর্ণ বিভাগে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে অত্যন্ত তত্পর রয়েছে। আগে কটেজ এবং মাইক্রো শিল্প এসএমই সেক্টরের অওতাভুক্ত ছিল না। ফলে কুটির এবং অতিক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন পেতে সমস্যা হতো। বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক বছর আগে এসএমই সেক্টরের সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনেছে। তারা কুটির এবং অতিক্ষুদ্র শিল্পকে এসএমই খাতের আওতাভুক্ত করে এই খাতের নতুন নামকরণ করেছে কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ। ফলে প্রাতিষ্ঠানেক সূত্র থেকে এই খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ বা অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা দূর হয়েছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে। সম্ভাব্য এই পরিবর্তনের সঙ্গে এসএমই খাতের উদ্যোক্তাগণ যাতে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, সেজন্য বিভিন্ন আইন-কানুন পরিবর্তন/সংস্কার করা হচ্ছে। সরকারের যে রেগুলেটরি বডি আছে, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে এই সেক্টরের উন্নয়নের জন্য কাজ চলছে। বাংলাদেশের কিছু কিছু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাদের উত্পাদিত পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশের বাজারে বিক্রি করছেন। স্থানীয় বাজারেও এসএমই পণ্যের চাহিদা দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিজিটাল মার্কেট বিশ্বব্যাপী নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এসএমই সেক্টরের উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব। শুধু এসএমই পণ্যই নয়, যে কোনো পণ্য ব্যবসায় সফলতা অর্জন করতে হলে সঠিক মার্কেটিং সিস্টেম সম্পর্কে জানতে হবে। অন্যথায় ভালো মানের পণ্য উত্পাদন করেও সফলতা পাওয়া যাবে না। ফেইস বুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে। তারা তাদের মার্কেট প্লেসে আমাদের পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ দিচ্ছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তারা প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করছে। আমরা আশা করছি, ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ এসএমই পণ্য বিপণনের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। একইসঙ্গে আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ এসএমই সেক্টরের গুণগত পরিবর্তন সাধন করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এসএমই খাতের উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক যে চিন্তাভাবনাগুলো আছে, তার সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ১২ থেকে ১৪ শতাংশের মতো। জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৮ থেকে ৩০ শতাংশের মতো। তবে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান নিয়ে তুষ্ট হবার কিছু নেই। কারণ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান অনেক বেশি। কোনো কোনো দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের মতো। দেশে যারা বৃহত্ শিল্পের উদ্যোক্তা বা মালিক, তাদের অনেকেই যাত্রা শুরু করেছিলেন এসএমই খাত দিয়ে। এসএমই খাতকে বৃহত্ শিল্পের পটভূমি বলা যেতে পারে। কোনো একজন উদ্যোক্তা যদি এসএমই খাতে সাফল্য প্রদর্শন করতে পারেন, তাহলে তার পক্ষে বৃহত্ শিল্প স্থাপন করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। হঠাত্ করেই একজনের পক্ষে বৃহত্ শিল্পের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। এসএমই খাতের শিল্পে অভিজ্ঞতা থাকলে বৃহত্ শিল্প স্থাপন করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। আজকে যারা তৈরি পোশাক শিল্পের বড় বড় উদ্যোক্তা, তারা অনেকেই প্রাথমিক পর্যায়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যদি দ্রুত শিল্পায়ন করতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই এসএমই সেক্টরের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। আমাদের দেশের মানুষের শিল্পে বিনিয়োগের মতো উদ্বৃত্ত অর্থের অভাব রয়েছে। তাই চাইলেই সবার পক্ষে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়না। এক্ষেত্রে এসএমই সেক্টরের বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা শিল্পায়নের পথে যাত্রা শুরু করতে পারেন। উন্নত দেশগুলোতে সাব-কন্টাক্টিংয়ের মাধ্যমে পণ্য উত্পাদন করা হয়। আমাদের দেশেও সাব-কন্টাক্টিংয়ের মাধ্যমে পণ্য উত্পাদন করা হয়। কিন্তু তা খুব সীমিত পরিসরে। এটা বাড়ানো যেতে পারে। আমাদের শিল্পায়ন নীতিমালায় এসএমই খাতের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আমরা অবশ্যই বৃহত্ শিল্প স্থাপন করব দেশের অর্থনীতির প্রয়োজনে। কিন্তু তাই বলে এসএমই খাতকে অবজ্ঞা করে নয়। এসএমই খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক।

লেখক :মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন: এম এ খালেক