সদ্য সমাপ্ত মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়েং ইয়ের এক মন্তব্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইউরোপীয় নেতাদের উদ্দেশ্য করে ওয়েং বলেছেন, বিশ্ব যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে চীন। নিজের নীতি ও সিদ্ধান্তকে ধারাবাহিক ও স্থিতিশীল রাখার বিষয় মাথায় রাখবে। অশান্ত বিশ্বে দাঁড়িয়েও স্থিতিশীলতার স্বার্থে দৃঢ় শক্তিমত্তা নিয়ে কাজ করে যাবে বেইজিং।’
ওয়েং এমন এক সময়ে এ ধরনের বিবৃতি দিলেন, যখন ইউরোপীয় নেতারা আসন্ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে তীক্ষ দৃষ্টি রেখে চলেছেন। সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন মার্কিন রাজনীতি। শুধু তাই নয়, মার্কিন নির্বাচন নিয়ে অনেকে বেশ উদ্বিগ্নও। এর কারণ, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ক্ষমতায় এলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউরোপীয়দের অংশীদারিত্ব ‘নতুন দিকে মোড়’ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
সম্প্রতি ট্রাম্প বলেছেন, ক্ষমতায় এলে ন্যাটো মিত্রদের প্রতিরক্ষার বিষয়ে সেভাবে আর দায়িত্ব নেওয়া হবে না। কারণ, এক্ষেত্রে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করে না দেশগুলো। ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের কারণে ইউরোপের ওপর হুমকি বেড়ে গেছে আগের তুলনায়। অনেক দেশই বিপদের প্রহর গুনছে। তবে ন্যাটোকে শক্তিশালী করার জন্য যে অর্থ ব্যয় করার কথা, দুঃখজনকভাবে তা তারা করছে না।
ট্রাম্পের এ ধরনের মন্তব্যের পর বেইজিংয়ের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নিতে এই অঞ্চল সফর করছেন ওয়েং। ট্রাম্পের কথা তার কাজকে সহজ করে তুলেছে বলতে হবে। চীনকে রাশিয়ার অন্যতম সহযোগী মনে করা হয় বিধায় ওয়াংয়ের সফরকে ইউরোপ হালকা করে দেখছে না।
ভূরাজনৈতিক কিংবা আদর্শগত বিভ্রান্তি দূরে সরিয়ে রেখে চীনের সঙ্গে ইউরোপের কাজ করার বিষয় এই সফরে জোর দেন ওয়েং। তবে ওয়েংয়ের আবেদন কিছু ইউরোপীয় দেশ কানে না-ও তুলতে পারে। এক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সামনে ‘একটি বড় সমস্যার কথা’ দাঁড় করিয়ে দেবেন নেতারা। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সেই সমস্যা হলো ‘মস্কোর সঙ্গে বেইজিংয়ের দহরম-মহরম’।
মিউনিখ সম্মেলনের বেশ আগে থেকে যখন এ ধরনের নানা বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছিল আলোচনার টেবিলে, ঠিক সেই সময় আসে পুতিনের কট্টর সমালোচক আলেক্সি নাভালনির মৃত্যুর সংবাদ। ৪৭ বছর বয়সি নাভালনির কারাগারে মৃত্যুর উত্তাপ আছড়ে পড়ে সম্মেলনে। বিস্ময়, হতবাক, ক্রোধ ছেয়ে ফেলে সম্মেলনকে। এই মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনামলের আরো একটা নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত সামনে চলে আসে। শুধু ইউরোপ কেন, গোটা বিশ্বে নাভালনির মৃত্যুর জন্য পুতিনকে দায়ী করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আর এই ঝড়ের সময় রাশিয়ার অন্যতম বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র চীনকে ইউরোপীয় নেতারা স্বভাবতই বিশ্বাস করতে চাইবে না।
জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস (জিএমএফ) নামক থিংক ট্যাংকের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো নোয়া বার্কিনও মনে করেন সেরকমটাই। তার মতে, ‘ইউরোপীয় নেতাদের প্রতি ওয়েংয়ের বার্তা হলো, ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রকে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পথে বাধা মনে করা উচিত নয়। তবে এ ধরনের কথায় কান দেবে না ইউরোপ। কারণ, রাশিয়ার সঙ্গে চীনের গভীর সম্পর্ক এবং অবাধ বাণিজ্য যত দিন থাকবে, তত দিন ইউরোপীয়রা উদ্বেগ-উত্কণ্ঠাকেই বড় করে দেখবে।’
ভুলে গেলে চলবে না, দুই বছর আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উভয়ই পশ্চিমের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মুখে পড়েন। একই সঙ্গে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে মস্কো-বেইজিং অংশীদারিত্ব। এসব বাস্তবতা ইউরোপ নিশ্চয় শিগিগর ভুলে যাবে না।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর জন্য রাশিয়ার নিন্দা করেনি চীন। বরং এমন একটি বৃহত্তর সংঘাতে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার কথা বলে আসছে বেইজিং। তবে বেইজিং আদৌ নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে পেরেছে কি না, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। এ ধরনের কথা বলার পেছনে যুক্তি আছে বইকি। যুদ্ধ শুরুর জন্য দায়ী করে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে বিধ্বস্ত হওয়ার কথা ছিল রাশিয়ার। যদিও তেমনটা ঘটেছে বলে মনে হয় না। কারণ, রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হিসেবে আবির্ভূত হয় চীন। এই যখন অবস্থা, তখন ইউরোপ ঘিরে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কতটা আলোর মুখ দেখবে, তাই দেখার বিষয়।
মিউনিখ কনফারেন্সের প্যানেল আলোচনায় ন্যাটোর প্রধান জেনস স্টলটেনবার্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের সঙ্গে চীনের প্রবণতার সাদৃশ্য তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন অব্যাহত থাকবে। এর মধ্য দিয়ে শির কাছে একটি বিশেষ বার্তা যাবে। তাইওয়ানে চীনের পেশিশক্তির ব্যবহার নিরুত্সাহিত করা হবে।’
ইইউ পররাষ্ট্রনীতির প্রধান জোসেপ বোরেল ওয়েংয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ‘চীনের রাশিয়াকে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকার প্রত্যাশা’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এর জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, চীন-রাশিয়া সুসম্পর্কের অজুহাত সামনে রেখে চীনের বিরুদ্ধে অযাচিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না, বরং চীন ও রাশিয়া নিজেদের মধ্যে ‘স্বাভাবিক বিনিময়’ করে থাকে মাত্র। এক্ষেত্রে কোনো তৃতীয় পক্ষকে টার্গেট করা হয় না। ওয়েংয়ের ভাষায়, রাশিয়া চীনের বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশ। তাদের সম্পর্ককে ‘একটি জোট’ বলা ভুল হবে।
কনফারেন্সের চেয়ারম্যান ক্রিস্টোফ হিউসগেন এক আলোচনায় ‘চীনকে রাশিয়ার লাগাম টেনে ধরার জন্য আরো কিছু করার আছে কি না’—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়েং বলেন, ‘এক্ষেত্রে চীনকে দোষারোপ করা ঠিক নয় কিংবা চীনের ওপর ইউক্রেন সংকট সমাধানের দায়িত্ব হস্তান্তর করার চেষ্টাও সমীচীন নয়, বরং কার্যকর শান্তি আলোচনার জন্য বেইজিং নিরলসভাবে কাজ করে গেছে।’
আসল ব্যাপার হলো, ট্রাম্প ইউরোপে মার্কিন জোটের ভবিষ্যত্ নিয়েই কেবল সংশয় প্রকাশ করেননি, ইউরোপীয় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে বলেও হুংকার দিয়ে রেখেছেন। এমন একটি বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেইজিং সুযোগটি কাজে লাগানোর বিষয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আর সে কারণেই ওয়েং ইউরোপ সফর করে দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। বেইজিং ইউরোপীয় নেতাদের বোঝাতে চাইছেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে তাদের সমস্যা বাড়বে। এক্ষেত্রে ইউরোপ যদি চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না রাখে, তাহলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে বিপত্তিতে পড়তে হবে নিশ্চিতভাবে। সত্যি বলতে, এ ধরনের প্রচেষ্টায় কিছুটা হলেও সফলতা পেতে পারে বেইজিং।
ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মসৃণ করার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে কিছুটা অগ্রগতিও লাভ করেছে বেইজিং। গত বছর থেকেই এই প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে তারা। আগামী দিনগুলোতে আরো কিছু দেশ সফর করবেন ওয়েং। বেইজিংয়ের আশা, সফরে তারা আশানুরূপ ফল পেতে পারে। কীভাবে? ইউরোপীয় সরকারগুলোকে বোঝানোর ক্ষেত্রে ‘ট্রাম্প প্রসঙ্গ’ ব্যবহার করা হবে লাগাতার। নেতাদের বোঝানো হবে, ট্রাম্পের কথায় স্পষ্ট, তিনি ক্ষমতায় এলে ওয়াশিংটন আর ইউরোপের নির্ভরযোগ্য অংশীদার থাকবে না।’ ইউরোপ নিয়ে ট্রাম্পের মনোভাব বেইজিংয়ের কাজ যে অনেক সহজ করে দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
লেখক: সিএনএনের চীনবিষয়ক গবেষক
সিএনএন থেকে অনুবাদ :সুমৃত্ খান সুজন