বিশাল আয়তনের অমর একুশের বইমেলায় বিভিন্ন স্টলে সজ্জিত যেসব বই থাকে তার সবগুলোকেই কি প্রকৃতপক্ষে বই বলা যায়? কিছু কবিতা গল্প প্রবন্ধ বা সাধারণ রচনা একত্র করে যে বই বানানো হয় তাতে কি পাঠকেরা সন্তুষ্ট হয়? আমরা প্রায়ই শুনি যে, বইমেলাকে সামনে রেখে প্রচুর বই প্রকাশিত হয় বটে কিন্তু তার বেশির ভাগই মানসম্পন্ন নয়। এমনকি চিরায়ত রচনা দিয়ে বানানো বইও অনেক সময় বই হয়ে ওঠে না! বইমেলায় স্টল পেতে হলে প্রকাশক হিসেবে সক্রিয় কি না তা বিবেচনার জন্য নতুন প্রকাশককে অন্তত নির্দিষ্ট সংখ্যক বই বের করতে হয়। সেজন্যও কিন্তু বেশকিছু বই বের হয়! আরও লক্ষ করার বিষয় যে, দেশের শিশু-কিশোরদের গড়ে তোলার জন্য বা তাদের আনন্দ দেয়ার জন্য প্রতিনিয়ত যা বের হচ্ছে এবং বইমেলায় স্থান পাচ্ছে তার মধ্যে কতগুলোকে বই হিসেবে গ্রহণ করা যাচ্ছে? এই ধরনের প্রশ্ন বহুবছর ধরেই উঠছে। অনেকেই পরিস্থিতির উত্তরণের জন্য চেষ্টাও করছেন। সেই প্রয়াসের ফল বিচার সঙ্গে সঙ্গে করা যায় না। বুঝে উঠতেও সময় লাগে।
সত্তরের দশকের একেবারে শেষ প্রান্তে বইমেলা ছিল অনানুষ্ঠানিক ও বাংলা একাডেমির একুশে সম্পর্কিত অনুষ্ঠানমালার জনসমাগম আশ্রিত। তখন থেকে এর নিয়মিত দর্শক হিসেবে মনে হতো সচেতন সাংস্কৃতিক সত্তা তার অনুসন্ধেয়কে চান বলেই সেখানে যান। আগে প্রকাশিত দুষ্প্রাপ্য বই নিয়ে কেউ কেউ হাজির হতেন। এমনকি প্রকাশকেরাও অবিক্রীত গুদামে পড়ে থাকা ভালো বইগুলোকে নিয়ে বইমেলায় হাজির হলে সেগুলোর সদ্গতি হতো! উৎকর্ষ সন্ধানের সেই আকাঙ্ক্ষা আমরা অনেকেই এখনো বহন করে চলেছি। যদিও বইমেলার বিস্তারে কেবল যেন সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের তুলনায় বাণিজ্য আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে উঠছে। উৎকর্ষ ও বাণিজ্য দুই আকাঙ্ক্ষাই জরুরি এবং প্রয়োজনীয়। সময়ের অনুষঙ্গে এখন বাণিজ্যিকতা সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের আকাঙ্ক্ষাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার তো আর করা যাবে না! কারো বিরুদ্ধে আমার অভিযোগও তাই নেই!
অমর একুশে বইমেলা কেন্দ্রিক ভাবনায় আমি ব্যক্তিগতভাবে অগ্রাধিকারে রাখি বইসংক্রান্ত উৎকর্ষের আকাঙ্ক্ষাকে। লেখক হিসেবে বা বইয়ের জগতের মানুষ হিসেবে আমি মনে করি এটুকু আমার ন্যূনতম দায়িত্বশীলতা। সেজন্য নিজের অকিঞ্চিৎকর লেখালিখির বইরূপ দিতে গিয়ে একদিকে আমি বই-সংস্কৃতির উৎকর্ষের যেমন খোঁজ রাখার চেষ্টা করি তেমনি চেষ্টা করি আমার বইগুলোকে সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা নিয়ে ও তাদের সহযোগিতা করে বইকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে!
যারা মূলত গল্প-উপন্যাস লেখেন তাঁদের পক্ষে বইরূপের বৈচিত্র্যে তেমন জোর না দিয়েও সাধারণ সৌষ্ঠব দেয়া যায়। সে ধরনের রচনার বইরূপ দেয়ায় আমিও মোটামুটি সাধারণ ধারা পরিশীলিতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করি। কিন্তু আমি যেহেতু বিচিত্র স্বভাবের গদ্য রচনা করি বা প্রবন্ধ লিখি বা লিখি গবেষণাধর্মী রচনা তাই বইরূপ দেয়ার সময় আমাকে সাধারণের অতিরিক্ত ভাবতে হয়। পদ্ধতিগত গবেষণার রীতি যেমন আমার অনুসরণীয় তেমনি সাধারণ গদ্য রচনা উপস্থাপনের প্রচলিত রীতি থেকে একটা রূপ বেছে নিয়ে সৃষ্টি করতে হয় সবগুলো রচনা উপস্থাপনের একটা পারম্পর্য! নানা প্রয়োজনের তাগিদে লেখা হয়ে যাওয়া রচনাগুলোকে কীভাবে সংকলিত করব তা নিয়ে প্রাথমিক ভাবনা ভেবে নিতে হয় বইয়ের ভাবকল্প গড়বার জন্য। কখনো একটা সম্পন্ন বই গড়ে তুলবার বাসনায় দীর্ঘ কাল ধরে লিখতে থাকি খণ্ড রচনা। নিজের রচনা সংকলনের জন্য কোনো একটা বইয়ের ধারণা মাথায় এলে সেই ভাবকে কেন্দ্র করে রচিত লেখাগুলো একত্র করি। বালির ভেতরে চুম্বক ধরলে যেমন লোহার কণা এসে চুম্বকে লাগে তেমনিভাবে আমার সমভাবাপন্ন লেখাগুলো খুঁজে একত্র করে চেষ্টা করি সম্পাদনার মাধ্যমে বইয়ের কেন্দ্র ভাব ফুটিয়ে তোলার। রচনাগুলোকে পূর্ব প্রকাশিত রূপেই না রেখে সম্পাদনা করি বইয়ের সামগ্র্যের অংশ হিসেবে।
রচনায় আমার মননসামর্থ্য যা-ই থাকুক না কেন সাধারণ আঙ্গিক সৌষ্ঠব যতটা সম্ভব পরিশীলিত রূপ দেয়ার চেষ্টা করি। চেষ্টা করি কারো লেখা থেকে ঋণ নিলে তা যথাযথভাবে স্বীকার করার। রচনায় ব্যক্তি বা বিষয় উল্লেখ থাকলে প্রণয়ন করি নির্ঘণ্ট। প্রাসঙ্গিক চিত্র যুক্ত করতে হলে বইয়ের বিষয়ানুগ সবচেয়ে উপযোগী রীতি অবলম্বন করে চেষ্টা করি একটা গ্রহণযোগ্য সৌষ্ঠব দিতে। আমরা যখন লেখালিখি শুরু করি তখনো বই প্রকাশ করার সময় ন্যূনপক্ষে এসব দিকে সাধারণভাবেই মনোযোগ দেয়ার সংস্কৃতি চালু ছিল। বই প্রকাশের সামগ্রিক সামর্থ্য কম ছিল বলে হয়তো এইসব রীতির পরিচর্যা না করে বই প্রকাশ ছিল ব্যতিক্রম। তখন নতুন কেউ বই প্রকাশের প্রয়োজনে অভিজ্ঞ কাউকে খুঁজে নিতেন। এখন এই কথাগুলো যে আমি উল্লেখ করলাম তার কারণ এসব রীতি-নীতির অজ্ঞতা সম্পর্কে এখন অনেককেই সচেতনতা ছাড়াই বই প্রকাশে উদ্যোগী হতে দেখা যায়! কিন্তু আমি চেষ্টা করি বই প্রকাশের অন্তত সাধারণ উত্কর্ষ-অনুশীলনটুকু চালিয়ে যেতে। কারণ অমর একুশে বইমেলা এই মর্মেই তার যাত্রা শুরু করেছিল। আমিও ছিলাম এরই অংশী, এখনো চাই তা-ই থাকতে, যতই বাণিজ্যিকতার চাপ বাড়ুক না কেন!