আজ যুক্তরাষ্ট্রের ২৪৩তম স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার এবং ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দিনটি উদযাপন উপলক্ষে ৩ জুলাই একটি জাতীয় দিবস অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। মাননীয় কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক প্রধান অতিথি ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রদূত মিলার অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে নিম্নলিখিত বক্তব্য দেন:
আসসালামু আলাইকুম
টমাস জেফারসন বলেছেন, তিনি নিজের জন্মদিনের চেয়ে আমেরিকার জন্মদিন পালন করতে বেশি পছন্দ করেন। বয়স যতো বাড়ছে, ততো এই মনোভাবের সঙ্গে আমি একমত হচ্ছি।
মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক; সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তাগণ; কূটনৈতিক কোরের সহকর্মীবৃন্দ; বন্ধুগণ: আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ২৪৩তম জন্মদিন উদযাপনে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের আয়োজনে স্বাগতম। বাংলাদেশে আমার প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালন করতে পেরে আমি আনন্দিত।
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দিবস প্রথমবারের মতো পালন করতে পেরে আমি আনন্দিত। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস কমিউনিটি, আপনাদের সহৃদয় পৃষ্ঠপোষক, এ বছরের উদযাপনের আয়োজনে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাদের সকলকে ধন্যবাদ।
সাবেক নৌসেনা হিসেবে আমাদের মেরিন কোর সিকিউরিটি গার্ডদের নিখুঁত রঙের উপস্থাপন দেখে আমার সামুদ্রিক হৃদপিণ্ড সতর্ক হয়ে উঠছে। স্যামপার ফাই, ডেভিল ডগেরা, তোমরা আমাদের গর্ব।
এই চমৎকার দেশের চেয়ে ভালো আর কোনো জায়গা হতে পারে না, যেখানে আমি আমার দেশের স্বাধীনতা দিবস ও বুনিয়াদি নীতি উদযাপন করতে পারি। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান অংশীদার এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রেবিশ্বের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি। আমাদের দুই দেশ একত্রে যা অর্জন করছে, তা নিয়ে আমি গর্বিত। আমেরিকার বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ এখন সারা বিশ্বের আকাশে লাল-সবুজ পাতাকা ওড়াচ্ছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন করছে আমেরিকার কোম্পানিগুলো। তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে, ইঞ্জিন সরবরাহ করছে, এবং হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিককে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মানে প্রশিক্ষিত করছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিমুখী বাণিজ্য গত বছর ৮.২ বিলিয়নে পৌঁছেছে, আগের বছরের চেয়ে যা দ্বিগুণ।
আমাদের নিরাপত্তা ও সামরিক সম্পর্ক এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী পর্যায়ে আছে। রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বস্থানীয় প্রদায়ক, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে যারা ৫৪১ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছে। ১ মিলিয়নের বেশি নির্যাতিত রোহিঙ্গার জন্য সীমান্ত ও হৃদয় খুলে দেওয়ার জন্যে বাংলাদেশের জনগণকে অভিবাদন জানায় যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশে উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে ইউএসএআইডি ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি যোগান দিয়েছে, যার মধ্যে গত বছর ছিল ২১৯ মিলিয়ন ডলার। অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি, কার্যকর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাড়া প্রদানের সক্ষমতা তৈরির পেছনে এ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আমরা স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন, লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা হ্রাস এবং নারীর ক্ষমতায়ন এবং মানব পাচার বন্ধে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সহায়তা দিয়ে থাকি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একে অন্যের এই অটুট সহযোগিতার কেন্দ্রে আছে আমাদের দুই দেশের মানুষে মানুষে সংযোগ। আমেরিকায় ২ লাখ বাংলাদেশির বসবাস। প্রতি বছর আমেরিকার কলেজ ক্যাম্পাসগুলোয় ৭,৫০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতায় সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি বলেছিলেন, “আমেরিকার সত্যিকার বিদেশ নীতি হলো নাগরিকে নাগরিকে, বন্ধুতে বন্ধুতে, মানুষে মানুষে, ভ্রাতৃত্বের এমন বৈদেশিক বন্ধন, যা কোনো অপশাসন নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। কারণ এক অর্থে, আমরা সবাই বাংলাদেশি, আমরা সবাই আমেরিকান, এবং আমরা সবাই মানবতার মহা ঐক্যে শামিল।
আমেরিকান কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান লিখেছিলেন: “আমি খোলা রাস্তায় বের হলাম একটি সুস্থ এবং স্বাধীন পৃথিবীর উদ্দেশে। এটাই কি আমেরিকা নয়? অদম্য আমেরিকান আশাবাদ। আজকের সড়ক মহড়ার একটি জায়গা হলো আমার প্রিয় আমেরিকান শহর: ডেট্রয়েট। মোটরের শহর, মোটাউন।
ডেট্রয়েট শহরে লিংকন-মারকারি গাড়ি কারখানার অ্যাসেমব্লি লাইনে কাজ করতেন বেরি গর্ডি আমে এক তরুণ। ১৯৫৯ সালে তিনি প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান হিসেবে একটি রেকর্ড কোম্পানির মালিক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যেটির নাম তিনি রাখেন মোটাউন। পরিবারের কাছ থেকে ৮০০ ডলার ধার নিয়ে তিনি ডেট্রয়েটে নিজের বাসায় গান রেকর্ড করতে শুরু করেন। শিগগিরই তিনি রেকর্ডিং করার জন্যে একটি বাড়ি কেনেন, যেটি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পীদের ঠিকানা হয়ে ওঠে: স্মোকি রবিনসন এবং তার দ্য মির্যাকলস, দ্য টেম্পটেশনস, মার্থা রিভস ও দ্য ভ্যান্ডেলাস, ডায়ানা রস ও দ্য সুপ্রিমস, মাইকেল জ্যাকসন এবং দ্য জ্যাকসন ফাইভ, ফোর টপস, গ্ল্যাডিস নাইট, স্টিভ ওয়ান্ডার, মারভিন গে, লিওনেল রিচি এবং দ্য কমোডোরেস।
ডেট্রয়েটের ওয়েস্ট বুলভারে মোটাউন জাদুঘর ঘুরে দেখা উচিৎ আপনাদের। এমন বিরাট কিছুই নেই সেখানে। পাশাপাশি দুটি মামুলি বাড়ি। একটি ছিল প্রকাশনা সংস্থা। আরেকটি ছিল গর্ডি পরিবারের বাসা, যেখানে গ্যারাজটিকে একটি রেকর্ডিং স্টুডিওতে রূপান্তরিত করে নেওয়া হয়েছে, রান্নাঘরটিকে করা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। রূপান্তরিত ওই গ্যারাজে আপনি দাঁড়াতে পারেন, যেখানে মাটির মেঝেতে একসময় গাড়ির একটা বিশাল দরজা রাখা ছিল, এইখানেই যতো তুমুল জনপ্রিয় গান রচিত হয়েছে, সেই একই জায়গায় গিয়ে আপনি দাঁড়াতে পারেন, যেখানে স্মোকি এবং মিচেল এবং ডায়ানা এবং মারভিন একসময় তাদের কাজগুলো করেছেন। এটা বিস্ময়করভাবে সরল, এবং সরলভাবে বিস্ময়কর।
ওই সরল বাড়িটির সম্মুখভাগে শিগগিরই একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হলো, যাতে লেখা হিটসভিল, ইউএসএ। ১৮০টি নাম্বার ওয়ান হিট গান। মোটাউন বড় হয়েছে, বদলে গেছে, আমেরিকাও তাই। সেটা ছিল কিং এবং কেনেডির সময়। মিছিল আর সমাবেশ এবং যুগান্তকারী নাগরিক অধিকার আইনের সময়। মোটাউনের সঙ্গীত শুধুই সাউন্ডট্র্যাক ছিল না। সেটা ছিল হৃদস্পন্দন।
ফোর টপসের একজন যেমনটা বলেছিলেন, “সেই ষাটের দশকে যখন কিছু বিশেষ স্থানে আমাদের যাওয়া নিষেধ ছিল, আমাদের সঙ্গীত তখন গোপনে মানুষের বাড়িতে ঢুকে গেছে....ঢুকেছে তাদের বসার ঘরে, রান্নাঘরে, তাদের গাড়ির ভেতরে।
মোটাউন মানুষকে একে অপরের দিকে একটু আলাদাভাবে তাকাতে শিখিয়েছে, কারণ ছোট ছোট মেয়েরা যখন ডেট্রয়েটেরএকটি আবাসন প্রকল্পে বেড়ে ওঠা ডায়ানা রসকে দেখেছে এড সুলিভান শোতে, তখন কিছু একটা বদল ঘটেছে। কিশোরবয়সীরা যখন টেম্পটেশনসের কোনো গানের ভলিউম বাড়িয়ে দিয়েছে, তারা যেখানেই বসবাস করুক না কেন, বার্মিংহাম অথবা বোস্টান, মিসিসিপি অথবা মিশিগান – কিছু একটা ঘটেছে।
যে মোটাউন সঙ্গীতকে একসময় বলা হতো,“তরুণ আমেরিকার আওয়াজ”, সেই গানগুলোকে আমরা কী মন লাগিয়েই না শুনি। গণতন্ত্র নিয়ে আমেরিকার অসম্ভব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সকলের জন্যে ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার অনির্বাপিত অঙ্গীকার আমরা আনন্দ, গর্ব আর বিনম্রতায় উদযাপন করি।
ড. মার্টিন লুথার কিং ১৯৬৫ সালে বলেছিলেন, 'আমেরিকান স্বপ্ন আমাদের মনে করিয়ে দেয় এবং এই স্বাধীনতা দিবসে সেটা আমাদের নতুন করে মনে করা উচিৎ - প্রতিটি মানুষ মর্যাদা আর মূল্যের উত্তরাধিকার।'
আমেরিকার গল্প আমাদের এগিয়ে যাওয়ার, অসম্পূর্ণতার, চলমানতার গল্প, আমাদের বুনিয়াদি আদর্শগুলোর সমকক্ষ হয়ে ওঠার গল্প, আমাদের দেশটির অর্থ, এটির অঙ্গীকার এবং সম্ভাবনাগুলোকে অনুধাবনের গল্প। এটি এমন এক সংগ্রাম, যার জন্যে ড. কিং এবং আরো অনেকে জীবন দিয়েছেন, যেসব শব্দের কারণে যুক্তরাষ্ট্র আলোকবর্তিকা হয়েছে, সেগুলোর মর্যাদা রক্ষা, মানুযকে সেইসব আদর্শে অনুপ্রাণিত করা, যেগুলো এখনও বিশ্বকে আলোকিত করে: “আমরা এইসব সত্যকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নিচ্ছি, যে, সকল মানুষ সমান হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে, যে, স্রষ্টা তাদেরকে কতগুলো অবিচ্ছেদ্য অধিকার দান করেছেন; যে এগুলোর মধ্যে আছে জীবন, মুক্তি এবং সুখের অন্বেষা।
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হতে পারা আমার জন্যে এক বিশেষ সম্মানের বিষয়। আমি কতো সৌভাগ্যবান। আমি যেখানেই ভ্রমণ করি, সেখানেই শালীনতা এবং উদারতার দেখা পাই, যা এই বিশেষ দেশটির অনন্য বৈশিষ্ট। আপনাদের সমাদৃত অতিথি হতে পেরে আমি দারুণ সৌভাগ্যবান। আজ রাতে আমাদের এখানে আসায় আপনাদের ধন্যবাদ।
আরো পড়ুন : জেদ্দায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ বিমানের প্রথম হজ ফ্লাইট
আসুন আজ রাতে কিছু আনন্দ হোক। হাজার হলেও আজ একটি জন্মদিন। আমরা স্বাস্থ্যবান, মুক্ত এবং বিশ্ব আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মহান বাংলাদেশের জনগণকে অভিবাদন জানাই। শুভ স্বাধীনতা দিবস। অনেক ধন্যবাদ
ইত্তেফাক/আরকেজি