আমার মা বেগম সাঈদা মোকাম্মেল কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলে বেগম রোকেয়ার প্রত্যক্ষ ছাত্রী ছিলেন। বেগম রোকেয়া ছিলেন আমার নানীর বান্ধবী। নানীদের পার্ক সার্কাসের বাড়িতে বেগম রোকেয়া মাঝে মাঝে আসতেন এবং আমি মায়ের কাছে বেগম রোকেয়ার অনেক গল্প শুনেছি। যেমন ও বাড়িতে বেড়াতে এলে রোকেয়া বোরখা পরেই আসতেন। কারণ তখনকার মুসলিম সমাজ পছন্দ করত না যে বেগম রোকেয়া বোরখা ছাড়া চলাফেরা করেন। কিন্তু উনি নিজে বোধহয় বোরখা তেমন পছন্দ করতেন না। কারণ ঘরে ঢুকেই উনি না কি বোরখাটা খুলে বাতাসে উড়িয়ে দিতেন। তো ফ্যানের বাতাসে সে বোরখা উড়ে মাটিতে পড়ল কি খাটের নিচে চলে গেল, খেয়ালই করতেন না। খাটে চড়ে নানীর সঙ্গে পান খেতেন ও গল্প করতেন।
আমার মায়েদের স্কুলে যাওয়া ছিল এক কঠিন সংগ্রাম। স্কুলের একটা পুরনো বাস ছিল। মায়েরা ওই বাসে চেপে যেতেন। বাসের জানালাগুলো সব কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকত। কারণ মুসলমান মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, ফলে তাদের যেন কেউ দেখতে না পায়। ওরা তো তখন খুবই ছোট, দশ-বারো বছরের শিশু মাত্র। তারপরও পার্ক সার্কাসের একটা বিশেষ গলি ছিল। যে গলি দিয়ে বাসটা যখন যেত কিছু বিহারি মুসলমান গুণ্ডা বাসটাতে ঢিল মারত। বলত, ‘কসবি যা রাহি হ্যায়।’ ‘কসবি’ খুবই নোংরা শব্দ। ভয়ে মেয়েরা জানালা থেকে মাথা বাঁচিয়ে নিচু হয়ে থাকত। স্কুলের দু-একটা খাণ্ডারনি আয়া ছিল। ওরা জানালা থেকে মুখ বাড়িয়ে ঝগড়া করত। অবশ্য ওই গলিটা পার হলে আর ভয় ছিল না। বাকি তো বৃহত্তর কলকাতা নগর। এভাবে কষ্ট করে ওঁরা স্কুলে গেছেন। মুসলমান মেয়েদের লেখাপড়া করা তখন সত্যিই খুব কঠিন এক কাজ ছিল।
মাকে বেগম রোকেয়া খুব স্নেহ করতেন কারণ আমার মায়ের বেশকিছু গুণ ছিল। অল্প বয়স থেকেই মায়ের এসব গুণ কিছু কিছু প্রকাশ পেতে থাকে। যেমন—মা চমত্কার এস্রাজ বাজাতেন। এছাড়া ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’ এসব পত্রিকায় ছোটগল্প লিখতেন। পরবর্তীকালে ‘মাটির মেয়ে’ নামে আমার মায়ের একটা গল্প-সংকলনও বের হয়। আমার মায়ের ডাক নাম ছিল ‘বেগম’। মায়ের এসব গুণের কারণেই বেগম রোকেয়া মাকে ডাকতেন ‘বেগমবাহার’ নামে।
দেশভাগের পর কলকাতা ছেড়ে মা খুলনায় চলে আসেন এবং খুলনা শহরে আমাদের পৈতৃক বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। তবে কলকাতার পার্ক সার্কাস নিয়ে মায়ের অনেক স্মৃতিমেদুরতা ছিল। প্রায়ই পার্ক সার্কাস নিয়ে গল্প করতেন। বড় হয়ে কলকাতায় গিয়ে আমি প্রথমেই তাই পার্ক সার্কাসে যাই। জায়গাটায় অনেক ঘুরি। আমার তেমন কিছু লাগেনি। ফিরে এসে মাকে সে কথা বলাতে মা বলেছিলেন, ‘ও তোরা বুঝবি না।’ আসলে যার যেখানে বাল্য-কৈশোর কাটে তার কাছে সে জায়গাটাই সবচে সেরা। যেমন কবি শঙ্খ ঘোষ আমাকে একবার বলেছিলেন যে ওঁর কাছে পৃথিবীর সবচে সুন্দর জায়গা হচ্ছে পাকশী। কারণ বাল্যবয়সে উনি পাকশীতে ছিলেন। এটা ওই বাল্য-কৈশোরের মধুর অনাবিল স্মৃতিমেদুরতার ব্যাপার।
এখন বুঝতে পারি মেট্রোপলিটন কলকাতা থেকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের খুলনার মতো এক মফস্বল শহরে এসে মায়ের অবস্থা প্রায় ডাঙায় তোলা মাছের মতোই হয়েছিল। তবে মা দমে যাবার পাত্র ছিলেন না। বা বেগম রোকেয়ার কাছ থেকে বৃথাই শিক্ষা পাননি। খুলনায় মা একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ‘হেলাল মেমোরিয়াল স্কুল’ নামে। ছেলেবেলায় আমরা ওই স্কুলে পড়াশোনা করেছি। একটি সংগীত বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন—‘ঝংকার সঙ্গীত নিকেতন’ নামে। এছাড়া নিয়মিত শিক্ষকতা করতেন খুলনা আযম খান কমার্স কলেজে। ওই কলেজে মা বাংলা সাহিত্য পড়াতেন।
আমার মায়ের ছিল প্রচণ্ড সাহস ও আত্মবিশ্বাস। একটা ঘটনা বলি। চৌষট্টি সালের দাঙ্গাটা খুলনা শহরে বেশ বড় আকারেই ঘটেছিল। খুলনায় তখন অনেক হিন্দু পরিবার বাস করত। আমাদের বাড়ির উল্টো দিকেই শিশুবালা নামে এক ধাত্রী বাস করতেন। আমরা সব ভাইবোন ওঁর হাত দিয়ে জন্মেছি। পেশায় দাই হলেও শিশুবালা মাসিমারা সচ্ছল ছিলেন। খুলনা শহরে ওঁদের নিজেদের বাড়ি আর অনেকখানি জমি নিয়ে ফল-ফলাদির বাগান ছিল। অনেকেরই বোধহয় ওই বাড়ি আর জমির প্রতি লোভ ছিল। চৌষট্টির দাঙ্গার সময় এক রাতে শিশুবালা মাসিমাদের বাড়িটি আক্রান্ত হয়। উত্তেজিত দাঙ্গাকারী জনতা। হাতে নানা রকম অস্ত্র-শস্ত্র। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মদ খেয়েছে বোঝা যায়। কিছু বিহারিও ছিল দাঙ্গাকারীদের দলে। তো দাঙ্গাবাজরা শিশুবালা মাসিমার বাড়ির টিনের গেইটে লাঠিসোটা দিয়ে আঘাত করছে আর অশ্রাব্য সব গালি দিচ্ছে। গেইট প্রায় ভেঙে ফেলে এমন অবস্থা! আমরা ছোট ছোট ভাই-বোনেরা সব মহাআতঙ্কে আমাদের দোতলার বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছি। তখন খুলনা শহরের অবস্থা খুবই খারাপ। অনেক জায়গায় আগুন জ্বলছে দেখা যাচ্ছিল। হঠাত্ শুনি মা বলছেন, ‘এই রব, আয় তো।’ রব নামে বরিশালে দেশ আমাদের বাড়িতেই বেড়ে ওঠা বেশ সাহসী এক ভৃত্য ছিল। রব হাতে একটা লাঠি নিল। আর মায়ের হাতে একটা হারিকেন। দুজনে নিচে নেমে গেল। অল্পক্ষণ পরেই আমরা দেখি মা হারিকেন হাতে ওই দাঙ্গাকারীদের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পেছনে লাঠি হাতে রব। একজন সম্ভ্রান্ত মহিলাকে ওভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাদের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে দাঙ্গাকারীরাও যেন কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এদিকে আমার বোনেরা তো দোতলা থেকে চিত্কার করে কাঁদছে, ‘মা যেও না। তোমাকে মেরে ফেলবে’—এসব। কিন্তু মা’র কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। মাত্র তিন-চার মিনিটের অপারেশন। আমরা অবাক হয়ে দেখি মা ওই বাড়ির গেইট খুলে শিশুবালা মাসিকে এক হাতে ধরে টেনে নিয়ে আসছেন। পেছন পেছন মেসোমশাইও আসছেন। সবার পেছনে লাঠি হাতে রব। রাস্তা পার হয়ে আমাদের বাড়ি ঢুকেই মা গেইট বন্ধ করে দিলেন। দাঙ্গাকারীরা যেন কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেছিল। পরে নানা গালি-গালাজ করতে করতে তারা আরেকদিকে চলে যায়। এদিকে মেসোমশাই খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের বাড়িতে ঢুকে প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তা এরকম ছিল আমার মায়ের সাহস।
চৌষট্টির দাঙ্গাটা বেশ কয়েকদিন ধরে চলে। মাকে দেখেছি ওই দাঙ্গার মধ্যেই রিকশায় করে শহরে ঘুরে ঘুরে উনি ওর কলেজের হিন্দু সহকর্মী, চেনা অনেক হিন্দু পরিবার, ছাত্র-ছাত্রী, বিশেষ করে ছাত্রীদেরকে উদ্ধার করে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতেন। এসব পরিবারের কেউ কেউ দাঙ্গা পুরোপুরি না থামা পর্যন্ত আমাদের বাড়ির নিচের তলায় ছিলেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও মায়ের অনেক সাহসী ভূমিকা দেখেছি। ওই বিপজ্জনক সময়টাতেও মা তাঁর বেশকিছু হিন্দু সহকর্মীকে নানাভাবে বাঁচিয়েছিলেন। সেইসব প্রবীণ অধ্যাপকদের কেউ কেউ আজো বলেন, ‘মিসেস মোকাম্মেল না থাকলে আমরা প্রাণে বাঁচতে পারতাম না।’
আবার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে যখন খুলনার উর্দুভাষী পরিবারগুলো বেশ বিপদে পড়ে যায় তখন মাকে দেখেছি আমাদের পরিচিত উর্দুভাষী নারী-শিশুদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতে। রাষ্ট্রনৈতিক নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও মাকে কখনো ওঁর মানবিকতাটা হারাতে দেখিনি।
মায়ের আরেক কাজ ছিল খুলনার দুঃস্থ নারীদের জন্যে নানারকম সমাজসেবামূলক কাজ করা। মা দীর্ঘদিন খুলনার ‘আপওয়া’ (অল পাকিস্তান উইমেন অ্যাসোসিয়েশন) ও ‘খুলনা মহিলা সমিতি’-র সভানেত্রী ছিলেন। মায়ের কিছু সঙ্গী-সাথী ছিলেন। তাঁরা সবাই মিলে দুঃস্থ নারীদের জন্যে নানারকম সাংগঠনিক ও সেবামূলক কাজ করতেন। মনে রাখতে হবে, এসব বর্তমানের এনজিও-যুগের আগের সময়কালের ঘটনা। ফলে বিদেশি দাতাদের অর্থে নয়, মূলত নিজেদের পয়সা খরচ করেই ওঁরা এসব সেবামূলক কাজ করতেন।
মায়ের আরেক কাজ ছিল, ‘জেল ভিজিটর’ হওয়া। সরকার থেকে কোনো সম্মানিত নাগরিককে এই দায়িত্বটা দেওয়া হতো। মায়ের কাজ ছিল মাঝে মাঝে খুলনা জেলের ভেতরে গিয়ে জেলের বন্দি নারীদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখা, তাদের সমস্যাগুলো শোনা ও তাদের দাবি-দাওয়া সরকারকে জানানো। ছেলেবেলায় মায়ের সঙ্গে আমিও কয়েকবার জেলখানার ভেতরে গেছি। ওইসব নারী আকুল আগ্রহে মায়ের জন্যে অপেক্ষা করত। তাদের ওই দুঃসহ বন্দিজীবনে মা ছিলেন ওদের কাছে যেন এক দেবদূতের মতো। ওরা মাকে এত সম্মান করছে, এত ভালোবাসছে দেখে আমারও খুব ভালো লাগত।
মা অসম্ভব পরিশ্রমী ছিলেন। সবসময়ই কোনো না কোনো কাজ করতেন। আমার স্মৃতিতে মায়ের যে সব চিত্রকল্প রয়েছে তা মায়ের কোনো-না-কোনো কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। হয় মা রান্না করছেন, না হয় সেলাই করছেন, না হয় পরীক্ষার খাতা দেখছেন, না হয় মহিলাদের নিয়ে সভা করছেন। আমি মাঝে মাঝে ভাবি এতসব কাজ, স্কুল প্রতিষ্ঠা করা ও তা নিয়মিত চালানো, সংগীত বিদ্যালয় চালানো, কলেজের শিক্ষকতা, নারীদের নানা সংগঠন চালানো, জেল ভিজিটরের কাজ, আর সবার ওপরে আমাদের আট ভাইবোনকে মানুষ করার মতো কঠিন ও শ্রমসাধ্য সব কাজ, মা এত সময় পেতেন কেমন করে? আসলে মাকে কখনোই আমি এক মুহূর্তের জন্যেও শুধু শুধু বসে থাকতে দেখিনি। দিনে কাজ করতেন পনেরো-ষোলো ঘণ্টা।
শিক্ষাজগতে একটা কথা আছে যে একজন ভালো শিক্ষক তিনিই যিনি একজন শিক্ষার্থীকে পুরনো আমলের গ্রান্ডফাদার ক্লকের ঘড়িগুলোর মতো এমন দম দিয়ে দেন যে সেই দমে শিক্ষার্থীটি আজীবন চলতে পারে। বেগম রোকেয়া তাঁর প্রিয় ‘বেগমবাহার’-কে অল্প বয়সে হয়তো এমনভাবে দম দিয়ে দিয়েছিলেন, সেই দমেই মা সারাজীবন অসামান্য সব কাজ করে গেছেন। বেগম রোকেয়ার শিক্ষা বৃথা যায়নি!