বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে

২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে এসডিজি বা অ্যাজেন্ডা-৩০ গৃহীত হয়। এসডিজির ১৭টি অভীষ্ট রয়েছে, যার মধ্যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৬৯টি। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের ২ নম্বর অভীষ্টে জোর দেওয়া হয়েছে ক্ষুধা এবং সব ধরনের অপুষ্টি দূরীকরণের বিষয়ে। তবে দুঃখজনকভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্তির প্রশ্নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিশ্ব। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ক্রমাগত বাড়ছে এসব অঞ্চলে।

বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ হিসেবে প্রথমেই বলতে হয় পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কথা। গাজা, সুদান ও ইয়েমেনের সাম্প্রতিক সংকটের প্রভাবে এসব অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা চরম পর্যায়ে উপনীত। সিরিয়া ও ইরাকের মতো দেশগুলোর দীর্ঘদিনের সংঘাত-হানাহানি এসব দেশকে ফেলে দিয়েছে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে। রাষ্ট্রগুলোর রেষারেষিতে যখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ঘিরে ধরেছে চারপাশ থেকে, ঠিক সেই সময় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে হাজির হয়েছে ‘জলবায়ুর সংকট’। এসব একেকটি চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠে সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আজকের বিশ্বে বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্য সরবরাহ সুরক্ষিত ও নির্বিঘ্ন রাখার স্বার্থে সত্যিকার অর্থেই অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। আর সেক্ষেত্রে সবার আগে দরকার কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করা। এই খাতকে কীভাবে আরো মজবুত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিস্থাপক ও টেকসই করা যায়, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

আগামী ৪ ও ৫ মার্চ জর্ডানের রাজধানী আম্মানে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন—ফাউ) আঞ্চলিক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের ৩৭তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। উচ্চ পর্যায়ের ঐ আলোচনা অনুষ্ঠানে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সদস্য দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরত্বারোপ করার কথা রয়েছে। দ্বিবার্ষিক গভর্নিং বডির এই বৈঠকে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মন্ত্রীরা মধ্যপাচ্য অঞ্চলের কৃষিখাদ্য ব্যবস্থার পরিস্থিতি এবং এই খাতে এগিয়ে যাওয়ার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ণের বিষয়ে মতামত দেবেন। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে ফাউয়ের কর্মসূচিতে কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখার উচিত, তা চিহ্নিত করবেন।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিখাদ্যের রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করার জন্য ফাউয়ের সদস্য দেশগুলোকে সব ধরনের সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে নানা ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছি আমরা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই আমাদের ফোকাসে রয়েছে। ইতিমধ্যে গতিশীল অপারেটিং সিস্টেম গ্রহণ করা হয়েছে। হালনাদাগ ডেটা ও বিশ্লেষণাত্মক সহায়তা প্রদানের মতো বিষয় নিয়ে ফাউ কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ মহল ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছি আমরা। এক কথায়, সব ধরনের সদস্যরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে রূপান্তরমূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছি আমরা। এ ধারা অব্যাহত থাকবে। বলা বাহুল্য, নানামুখী সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ফাউ এখন আরো সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারছে।

সব সময়ই সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের গুরুত্বের ওপর জোর দিই আমি। বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে এতে করে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। শুধু এই অঞ্চল কেন, কৃষিখাদ্য ব্যবস্থায় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে অন্যান্য এলাকায়ও সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের গুরুত্ব ব্যাপক। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্ষয়িষ্ণু কৃষিসম্পদের সঙ্গে লড়াইয়ের প্রশ্নে আমাদের অবশ্যই যথাসম্ভব উত্পাদনশীলতা ও দক্ষতার উন্নয়নে জোর দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কী করে কম খরচে বেশি উত্পাদন করা যায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে।

মনে রাখতে হবে, সবার জন্য খাদ্যের প্রাপ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করতে খাদ্য সরবরাহ চেইন ও বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষার কেনো বিকল্প নেই। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি প্রযোজ্য। কারণ, পানির তীব্র্র ঘাটতি ও জলবায়ু সংকটে রীতিমেতো ধুঁকছে এই অঞ্চল। এই সংকটের উত্তরণে অভিযোজনের ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসে গুরুত্ব দিতে হবে। কপ২৭ ও কপ২৮ জলবায়ু সম্মেলনে খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কৃষিখাদ্য ব্যবস্থায় যেসব পদক্ষেপ ও প্রচেষ্টার কথা উঠে এসেছে, সেই অনুযায়ী কাজ করা অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে আজকের দিনে।

ফাউ সদস্যরা ‘ফোর বেটারস :ভালো উত্পাদন, ভালো পুষ্টি, ভালো পরিবেশ এবং ভালো জীবন’ তথা কাউকে পিছিয়ে না রাখার বিষয় সামনে রেখে ‘২০২২-২০৩১-এর জন্য কৌশলগত কাঠামো’ অনুমোদন করেছে। এক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ বিশেষ দাবি রাখে।

ফাউয়ের কান্ট্রি অফিসগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আমি বরাবরই জোর দিয়ে আসছি। ‘এফএও হ্যান্ড-ইন-হ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ’সহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি আমরা, যার ফলে দারিদ্র্য দূরীকরণসহ কৃষিখাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তর আরো ত্বরান্বিত হবে। এসবের ফলে এসডিজি অর্জনের পথ আরো সুগম হবে। এছাড়া আরো বেশ কিছু অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ গুহণ করা হয়েছে, যার ফলে বিশেষ কৃষিপণ্যের মূল্য নিশ্চিতসহ গ্রামীণ জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় টেকসই খাদ্যের উন্নয়নে দেশগুলো সহায়তা পাবে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফাউয়ের পরিকল্পিত ও সক্রিয় পদক্ষেপ এভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

শুধুমাত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্যও খাদ্য নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভুলে গেলে চলবে না, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্যের বাইরে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ। এটা অত্যন্ত গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এই অবস্থায় সরকারগুলোকে অবশ্যই সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যকর খাবার জোগানের বিষয়ে মনোনিবেশ করা উচিত। সংলাপ এবং জ্ঞান বিনিময়ের জন্য একটি পেশাদার প্ল্যাটফরম হিসেবে কাজ করাসহ এ ধরনের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে ফাউ সব সময়ই সমর্থন দিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

আমাদের অবশ্যই কাঠামোগত এবং সামাজিক ব্যবধান ও বৈষম্য মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর সেক্ষেত্রে গ্রামীণ উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নে জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। কৃষিখাদ্য ব্যবস্থার কার্যকর গোষ্ঠী হিসেবে খ্যাত যুব সম্প্রদায়কে সংগঠিত করার বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে। কৃষি উদ্যোক্তা ও গোষ্ঠীগুলোকে সম্পৃক্ত করার দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ওপর গুরত্বারোপ করাও অপরিহার্য। প্রান্তিক কৃষকদের কী করে কাজের কেন্দ্রে রাখা যায়, সে ব্যাপারেও চিন্তা করা আবশ্যক। মাথায় রাখতে হবে, কৃষিখাদ্য ব্যবস্থাকে রূপান্তরের জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা একত্রিত করার সময় এসে গেছে। তাই আসুন, সতার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা এবং উন্নত পুষ্টি নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিই, যাতে কেউ পিছিয়ে না থাকে। এই মহত্ প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সর্বদাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

লেখক: জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মহাপরিচালক

আরব নিউজ থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন