বিশ্বরাজনীতির ভবিষ্যত প্রতিচ্ছবি

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘ভবিষ্যতের রঙ্গভূমি’ কবিতায় আগামী দিনের কথা লিখতে গিয়ে বলেন :সম্মুখে রয়েছে পড়ি যুগ-যুগান্তর।/ অসীম নীলিমে লুটে  ধরণি ধাইবে ছুটে,/ প্রতিদিন আসিবে,  যাইবে রবিকর। এই তিন লাইনে রবীন্দ্রনাথ ভবিষ্যতের পৃথিবীর চিরন্তনতা এবং এর অনন্ত পরিবর্তনশীলতার কথা বলেছেন। আমাদের জীবন ও রাজনীতি আসলে ঠাকুরের কবিতার বচনের মতো সদা পরিবর্তনশীল। অনুরূপভাবে বিশ্বরাজনীতিও সব সময় পরিবর্তিত হয়।

বিশ্ব রাজনীতির বিভিন্ন তত্ত্ব আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যু বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু তা দিয়ে আগামী বিশ্ব রাজনীতিতে কী ঘটতে চলেছে তা বলা অনেক কঠিন ব্যাপার। তার পরও বিশ্বরাজনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞগণ মন্তব্য করে থাকেন, লেখেন জার্নাল, আর্টিকেল কিংবা বই। জর্জ ফ্রিডম্যানের ‘দ্য হান্ড্রেড ইয়ার্স’ বইটি এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বইটি আগামী এক শ বছরে ভূরাজনীতির ভবিষ্যত্ কেমন হবে তা ব্যাখ্যা করে। ২০০৯ সালে বইটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন এটি নিউ ইয়র্ক টাইমস ‘বেস্ট সেলার’ হয় এবং ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায়।

আমি এই লেখায় বিশ্বরাজনীতির আগামী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর যে তালিকা দিতে চাইছি, তা নিয়ে লেখক ও পাঠকমহলে মতভেদ থাকা অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং, এখানে যে ইস্যুগুলো বর্ণনা করা হবে, তার বাইরে আরো অনেক বিষয় থাকতে পারে এবং তা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার যথেষ্ট সুযোগ আছে। যদিও এসব ইস্যুর তালিকা করার নির্দিষ্ট এবং ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই, তথাপি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বিশেষজ্ঞগণ ছাড়াও সাংবাদিক, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন বিষয়ের নীতি তৈরিকারিগণ একটা নির্দিষ্ট ‘প্যারাডাইম’ মেনে চলেন।

সব মিলিয়ে, আগামী বিশ্বরাজনীতিতে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তার তালিকা হতে পারে এরকম :বিশ্বায়নের কিংবা সীমানাহীন পৃথিবী, গণতন্ত্রময় পৃথিবী, সভ্যতার সংঘাত, বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের ছড়ি ঘোরানো, এশিয়ার নব উত্থান, পরিবেশের রাজনীতি, কর্তৃত্ববাদের বিশ্বরূপ ইত্যাদি। প্রথমত বিশ্বায়নের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তির অভাব নেই। অনেক তাত্ত্বিক মনে করেন, বিশ্বায়নের ফলে আজকের এই অভাবনীয় উন্নতি আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেটা হতে পারে যেকোনো ধরনের উন্নয়ন। অন্যদিকে, যারা বিশ্বায়নের বিপক্ষে রায়  দেন, তারা বলেন যে বিশ্বায়নের ফলে নির্দিষ্ট কিছু দেশ এবং জাতি, বিশেষ করে ধনিক শ্রেণি সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করছে। এর ফলে ধনী ও গরিব নামক দুটি শ্রেণির মধ্যের আয়বৈষম্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প যিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনিও বিশ্বায়নের বিপক্ষে গিয়ে কথা বলা শুরু করেছিলেন। সুতরাং বলা যায়, আগামীর পৃথিবী বিশ্বায়নের পক্ষে থাকবে, নাকি বিশ্বায়নের বিপক্ষে গিয়ে আঞ্চলিকতাবাদ গ্রহণ করবে, তা নির্ভর করছে বিশ্বায়ন কতটা সুফল বয়ে আনছে মানবজাতির জন্য তার ওপর।      

ফ্রান্সিস ফুকুয়্যামা তার বিখ্যাত বই ‘দ্য এন্ড অব হিস্টোরি’তে ঘোষণা দিলেন যে পৃথিবীতে গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। এর ফলে মানব জাতি তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রকে গ্রহণ করবে এবং অন্য কোনো রাজনৈতিক  ব্যবস্থা গণতন্ত্রের মতো এত বিস্তৃতি লাভ করতে পারবে না। কিন্তু ফুকুয়ামা কেন এ কথা বললেন? কারণ ছিল এই যে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে একমাত্র গণতন্ত্রই মানুষকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এছাড়া গণতন্ত্রে মানুষের মৌলিক ও অন্যান্য অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। আমরা এটাকে বলি ‘আইডেন্টিটি পলিটিকস’। আর এই ‘আইডেন্টিটি পলিটিকস’-এর কথা সেই প্রাচীন আমলের সক্রেটিস থেকে শুরু করে  এখনকার আধুনিক দার্শনিকগণ বলে আসছেন।     

এরপর রয়েছে বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের তত্ত্ব, যা সবার কাছে ‘ক্ল্যাস অব সিভিলাইজেশন’ নামে  পরিচিত। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, যেহেতু সভ্যতাসমূহের মধ্যে ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতি গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে এবং ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যেহেতু আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকছে না, সেহেতু আগামী বিশ্বরাজনীতির বিষয়বস্তু হবে সংস্কৃতিকেন্দ্রিক সভ্যতাসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্ব। বিশেষ করে ইসলামিক সভ্যতা এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে এ দ্বন্দ্ব হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। কারণ এখানেই রয়েছে বিশ্ব রাজনীতির ‘ফল্ট-লাইন’। অর্থাত্, আগামী বিশ্বরাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধর্ম, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে।   

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে চীনের প্রভাব ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। ভবিষ্যতে চীনের প্রভাব আরো বাড়বে। কারণ বর্তমান সময়ে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং পিপিপির ভিত্তিতে চীন বিশ্বের বৃহত্তম  অর্থনীতি। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমীক্ষা ভবিষ্যদ্বাণী করছে যে, আগামী দশকে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। সামরিক দিক থেকেও চীন অনেক শক্তিশালী। ইতোমধ্যে জিবুতি সহ বেশ কয়েকটি দেশে চীন তার সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। এর ফলে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমেরিকার যে একক আধিপত্য ছিল বিশ্বরাজনীতিতে, তার প্রভাব কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হয়েছে, ভবিষ্যতে আরো ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মত ব্যক্ত করছেন। তবে চীনের রাজনৈতিক-অর্থনীতির কিছু অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা রয়েছে। রয়েছে ভূরাজনীতির অবস্থানগত ভঙ্গুরতা। সব মিলিয়ে, আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের প্রভাব কেমন হবে, তা নির্ভর করছে অনেকগুলো বিষয়ের উপর ।   

বিশ্ব রাজনীতিতে এশীয়দের উত্থান নতুন কিছু নয়। বর্তমান সময়ের বিশ্বরাজনীতিতে জাপান, চীন, তুরস্ক, ভারত, সৌদি আরব ও ইরানের প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই দেশগুলো বিশ্বরাজনীতিতে এখন একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে এ দেশগুলোর ভূমিকা নির্ধারণ করে দিচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির রূপ ও রূপান্তর কেমন হবে। বর্তমানে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণে বিশ্বব্যাপী যে খাদ্য ও জ্বালানি তেলের সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধানে ভারত, চীন ও সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ,  ইরান ও সৌদি আরব হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম তেল সরবরাহকারীর রাষ্ট্র। অন্যদিকে চীন ও ভারত হচ্ছে বিশ্বের  অন্যতম বড় জ্বালানি তেলের ভোক্তা। সব মিলিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর পরিমাণ আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

অন্যদিকে, বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এত দিন গণতন্ত্রের যে জয়জয়কার ছিল, তাতে কিছুটা হলেও এখন ভাটার টান পড়েছে। এর বিপরীতে কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। চীন থেকে রাশিয়া,  ভেনেজুয়েলা থেকে হাঙ্গেরিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে  গণতন্ত্রের যাত্রা কিছুটা হলেও হোঁচট খেয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ল্যারি ডায়মন্ডের মতে, ২০০৬ সাল থেকে গণতন্ত্রের যাত্রা হোঁচট খাওয়া শুরু হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত চলমান। তবে এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কির মতে, ‘গণতন্ত্রের ক্ষয়’ একটা কাল্পনিক বিষয়। তবে তার এবং আরেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল জিবল্যাটের মতে বর্তমান সময়ে গণতন্ত্রের  প্রকৃতি ও গণতন্ত্রহীন হওয়ার ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। ফ্রিডম হাউজের সাম্প্রতিক রিপোর্ট  মতে, বিশ্বের শতকরার ৫৪ জন কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকের অধীনে বসবাস করে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখন বড় ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।   

সবশেষে যে বিষয়টি আগামীর বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে, তা হলো পরিবেশ সম্পর্কিত রাজনীতি। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন রকম পরিবেশদূষণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে এবং এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আমরা বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখতে পাচ্ছি এবং ভবিষ্যতে এর পরিমাণ আরো বাড়বে, এটা বলাই বাহুল্য। তবে চরম সত্য কথা হলো, পরিবেশের এই বিপর্যয়ে সবার ও সব দেশের সমান ভূমিকার কারণে হয়নি। ধনী দেশগুলো মূলত এর জন্য দায়ী। আর গরিব দেশগুলো এই পরিবেশ বিপর্যয়ের ভিকটিম। তাই, অদূর ভবিষ্যতে পরিবেশ নিয়ে রাজনীতি বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। তবে আশার কথা হলো, বর্তমান সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আমাদের পরিবেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। কেননা, আমাদের আছে একটাই পৃথিবী এবং এই পৃথিবীতে প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের বসবাস।

মানব জাতিকে টিকে থাকতে হলে আমাদের পৃথিবীকে ঠিক রাখতে হবে। আর আমাদের পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার সম্মিলিত ও সামগ্রিক প্রচেষ্টা। এই পরিবেশ সম্পর্কিত রাজনীতি হবে আগামীর বিশ্বরাজনীতির হট টপিক। পরিশেষে এখানে যে বিষয়গুলোর কথা বলা হলো, ভবিষ্যতে তা বিশ্বরাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। তবে অন্যান্য বিষয়ও যা এখানে উল্লেখ করা হয়নি যেমন—অভিবাসনবিষয়ক সমস্যা কিংবা যুদ্ধের মতো বিষয়, বিশ্বরাজনীতির আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে থাকতে পারে। সুতরাং বলা যায়, পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে যে বিষয়গুলো আগামী দিনের বিশ্বরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে, তা দেখতে হলে আমাদের খেলার মাঠের দর্শকের মত অপেক্ষা করতে হবে পৃথিবী নামক স্টেডিয়ামে!

লেখক: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক