সঠিক ব্যবস্থাপনায় সম্পদের সর্বোচ্চ সুফলপ্রাপ্তি প্রসঙ্গ

অবকাঠামোর আওতাধীন সম্পদ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। প্রতিটি অবকাঠামো গড়ে তুলতে হলে সম্পদের প্রয়োজন হয়। এই সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে তার সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। সম্পদ যদি সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে দেশ ও জাতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অবকাঠামো সম্পদ ব্যবস্থাপনা বলতে সম্পদের উত্পত্তি থেকে ব্যবহারের মধ্যে যে সার্কেল তৈরি হয়, তার ব্যবস্থাপনাকে বোঝায়। আমাদের অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ রেলওয়ে, বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড, ঢাকা মেট্রোরেল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোর আওতাধীনে প্রচুর সম্পদ রয়েছে। এই সম্পদগুলো সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীনে প্রচুর বিল্ডিং, রাস্তাঘাট আছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের বড় বড় রাস্তা আছে। সেই রাস্তার জন্য প্রচুর ভূমি এবং অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিপুলসংখ্যক বাঁধ বা কালভার্ট রয়েছে। মেট্রোরেল বর্তমানে দেশবাসীর কাছে অত্যন্ত আলোচিত একটি পরিবহনব্যবস্থা। এসব প্রতিষ্ঠানের আওতায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ, বিশেষ করে ভূমি রয়েছে। মেট্রোরেলের জন্য যেসব অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে তার সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। যদি এসব প্রতিষ্ঠানের আওতায় যেসব সম্পদ তৈরি হয়েছে, তার সঠিক ব্যবস্থাপনা করা না যায়, তাহলে সম্পদের উপযোগিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বিদ্যমান সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভূমি সম্পদ যাতে বেহাত না হয়, সেজন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম। যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউট অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (আইএএম)-এর নীতিমালায় কীভাবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলা আছে। অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট বিভাগ আছে। কানাডায় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিল আছে। উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদেরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য আইন মেনে চলা উচিত। বাংলাদেশে যেসব রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আছে তারা তাদের আওতাধীন সম্পদের একধরনের ব্যবস্থাপনা করছে। কিন্তু তারা এটা করছে অনেকটাই বিচ্ছিন্নভাবে। যেমন একটি রাস্তা তৈরি করা হবে। এজন্য প্রথমেই প্রস্তাবিত রাস্তার জন্য প্ল্যানিং করতে হবে। তারপর ডিজাইন তৈরি করা হবে। রাস্তা নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নির্ধারণের জন্য টেন্ডার নোটিশ করা হবে। টেন্ডারের মাধ্যমে একজন ঠিকাদার হয়তো নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পেলেন। ঠিকাদার রাস্তাটি তৈরি করলেন। কিন্তু তৈরিকৃত রাস্তাটি ফেলে রাখলে তো হবে না। তার সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতে হবে। এমনকি রাস্তাটি ব্যবহার হওয়ার সময়ও তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। কোনো স্থানে রাস্তা ভেঙে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে তা মেরামত করতে হবে। এভাবে নিয়মিত রাস্তাটি রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলে তা বেশি দিন ব্যবহারোপযোগী থাকবে না। প্রতিটি স্তরেই পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এবং কাজটি বিচ্ছিন্নভাবে না করে সমন্বিতভাবে করলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। প্রতিটি স্তরেই পরিকল্পিতভাবে কাজগুলো করা প্রয়োজন। এজন্য তথ্যের সহজলভ্যতা খুবই প্রয়োজন। যেমন কোনো একটি স্থানে রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে যদি সেই তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে তাত্ক্ষণিকভাবে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব। যেমন মেট্রোরেল কত সুন্দরভাবে ম্যানেজ করা হচ্ছে। কোনো স্থানে সামান্য ত্রুটি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা সমাধান করা হচ্ছে। অর্থাত্ একটি স্থাপনাকে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হলে সার্বক্ষণিক তদারকির মধ্যে রাখতে হয়। কোনো কারণে তদারকিতে ঘাটতি দেখা দিলে সেই সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। আর সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না।

একটি প্রকল্পের কোনো অংশ বিশেষ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যদি আগে থেকেই সঠিকভাবে তদারক করা হয়, তাহলে সম্ভাব্য ত্রুটি খুব সহজেই চিহ্নিত করা এবং সেই ত্রুটি দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। এতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ কম হয় এবং গণদুর্ভোগ সীমিত পরিসরে রাখা যেতে পারে। এই তদারকি যদি আধুনিক পদ্ধতিতে করা হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি আরো বেনিফিটেড হতে পারে। সম্পদ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এগুলো হচ্ছে—মূল্য, রিস্ক ও পারফরম্যান্স। যেমন কোনো ভবনের ক্ষেত্রে কতটা রিস্ক হতে পারে, তা আমাদের বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। আমরা হয়তো কোনো সমস্যা দূর করার জন্য ফান্ড বরাদ্দ দিলাম। কিন্তু দেখা গেল কৃত ত্রুটি সারানোর চেয়ে নতুন করে তৈরি করা ব্যয় সাশ্রয়ী। এখানে সিদ্ধান্ত প্রদানের ব্যাপার আছে। আমরা কি পুরোনোটির ত্রুটি সারানোর ব্যবস্থা করব, নাকি নতুন করে আর একটি স্থাপনা তৈরি করব—এই সিদ্ধান্ত কে দেবেন? এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় যেতে হবে। এজন্য প্রয়োজন আইএসও ৫৫০০০ বাস্তবায়ন করা। কারণ আইএসও ৫৫০০০-এর এসব বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই একাধিক সম্পদ থাকে, যেমন—মানব সম্পদ, অবকাঠামোগত সম্পদ, স্থাবর সম্পত্তি। রেলওয়ে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ জমি দখল হয়ে গেছে। এসব সম্পত্তি যদি উদ্ধার এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হতো, তাহলে রেলওয়ে বিভাগের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটত। সড়ক ও জনপথ বিভাগের অনেক সম্পত্তি বেদখল হয়ে আছে। এভাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ নানা কারণেই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অথচ এসব সম্পদ ব্যবহার করা গেলে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হতো একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের আয় বৃদ্ধি পেত। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য যেসব যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয় তাও অনেক ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না। ব্যক্তিগত সম্পদ মানুষ যেভাবে সংরক্ষণ করে, সরকারি সম্পদের ক্ষেত্রে তা করে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য যেসব যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য সম্পদ ক্রয় করা হয়, তা যেন সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ জমি অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে। এগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নিতে পারে। এই সম্পদগুলো এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে পরিবেশের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ না হয়। একইভাবে এসব সম্পদ এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা বা অন্য কোনো কিছুর জন্য ক্ষতির কারণ না হয়। আবার প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ আয়ের ব্যবস্থাও নিশ্চিত হয়। আমাদের মূল বিষয় হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। কাজেই এমনভাবে সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না, যাতে মূল স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়ে। যেমন কোনো রাস্তার পাশের পতিত জমি হয়তো কারো কাছে আবাদের জন্য দেওয়া হলো। এতে প্রতিষ্ঠানটি বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আয় করতে পারবে। কিন্তু আমাদের সব সময় খেয়াল রাখতে হবে, অর্থ আয় করতে গিয়ে রাস্তার পাশের জমি লিজ দিয়ে রাস্তার যেন কোনো ক্ষতি না হয়। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের যেসব সম্পদ আছে তা সঠিকভাবে মেইনটেইন করতে হবে। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। দেখা যায়, অনেক সময় রেলওয়ে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য আমদানি করে আনা যন্ত্রাংশ বেকার বসে আছে। যে যন্ত্রপাতির কোনো উপযোগিতা নেই, ব্যবহার করা যাবে না, তা আমদানি করা হবে কেন? আর আমদানি করা হলে তা সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, যাতে তা নষ্ট হয়ে না যায়।

আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়ে গেছে। এখনো পদ্ধতিভাবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে যে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করছে, তা আন্তর্জাতিক মানের নয়। ফলে আমরা এর সুফলপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বিভিন্ন দেশে সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক প্রতিষ্ঠান আছে। তারা যে নীতিমালা তৈরি করে দেয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তা মেনে চলে। ফলে তারা একই মানে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে সমর্থ হয়। কিন্তু আমাদের এখানে তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। সঠিক নীতিমালাও নেই। প্রতিটি বিভাগের সম্পদ ব্যবস্থাপনা সিস্টেমকে একই পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

লেখক: সিনিয়র সরকারি প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও রিসার্চ ফেলো, ইউনির্ভাসিটি অব কুইবেক, কানাডা

অনুলিখন: এম এ খালেক