লেখককে ঠকাচ্ছেন প্রকাশক? রয়েছে উল্টো বক্তব্যও

সদ্য শেষ হওয়া অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রায় ৬০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে। যদিও এটি কাগজে কলমে। বাস্তবে আরো বেশি। এই বিক্রি গত বছরের তুলনায় ১৩ কোটি টাকা বেশি। কিন্তু এর থেকে যারা বই লিখলেন তারাই বা কতো টাকা পেলেন? জানি সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া মুশকিল। আমাদের দেশে বই বিক্রির সন্মানী নিয়ে লেখক প্রকাশকদের দ্বন্ধ বহুকালের পুরনো। অনেকটা সৈয়দ মুজতবা আলীর বই বিক্রির সেই গল্পের মতো। পাঠক বই কিনছেন না বলে দাম কমছে না, আবার দাম কমছে না বলে পাঠক বই কিনতে পারছেন না। তেমনি বই প্রকাশ করার পর বই বিক্রি হলেও লেখকদের প্রাপ্য টাকা দিতে প্রকাশক নানা টাল বাহানা এমনকি মিথ্যার আশ্রয়ও নিয়ে থাকেন। তবে প্রকাশকদের পক্ষ থেকে যেটা বলা হয়ে থাকে, অনেক লেখকের বই গুদামে পড়ে থাকে এবং এতে করে তাদের লোকসান গুণতে হয়। এ বিষয়ে প্রথমেই কথা বলতে চেয়েছিলাম অপেক্ষাকৃত নবীন লেখকদের সঙ্গে। কিন্তু তারা এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি এবং অনেকেই ভেবেছেন তারা এ বিষয়ে কথা বলার যোগ্য নন। কেউ কেউ মনে করেছেন তারা যদি এ বিষয়ে কথা বলেন তাহলে ভবিষ্যৎ এ প্রকাশকরা তাদের বই প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে পারেন। 

রম্য লেখক ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব বলেন, 'লেখককে প্রকৃতপক্ষে বই বিক্রির টাকা বা সন্মানী পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে আগে। তিনি যে টাকাটা পাওয়ার মতো বই লেখেন মানে  বই প্রকাশ করে প্রকাশক লাভবান হবেন সেই অবস্থানে তাকে যেতে হবে'। 

অন্বেষা প্রকাশনের শাহাদাত হোসেন বলেন, 'এই অভিযোগটা নতুন নয়, অনেক পুরনো। তবে আমাদের দেশে যেটা হয় সাধারণত আমরা চুক্তি করি না। এটা লেখকও করে না প্রকাশকও করে না। দায়টা যদিও প্রকাশকের। চুক্তি থাকলে চুক্তিতে সব বিষয়ে উল্লেখ থাকলে এ বিষয়টা সমাধান করা সম্ভব। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে- অনেকের একটা বই ছাপানোর পর আমরা এক বছর বা দুই বছর দেখি বইটি বিক্রি হয় কি না। দুই বছর বিক্রি না হলে সেই বইটা কিন্তু পরবর্তীতে গোডাউনে চলে যায়। অনেক সময় সেটা কেজি দরে বিক্রি করে দেই। লেখকও অবগত থাকে না একটা দূরত্ব তৈরি হয়। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ সমাধান হচ্ছে চুক্তি করা এবং চুক্তি করলে আমার মনে হয় বিষয়টি সহজে সমাধান হবে'।

boimela-8

কথা সাহিত্যিক স্বকৃত নোমান মনে করেন, 'এটা সব প্রকাশক তা না। যাদের বই পাঁচশ কপি বিক্রি হয় তাদেরকে প্রকাশক রয়্যালিটি দিতে বাধ্য তাদের স্বার্থেই। কারণ একজন লেখকের যখন পাঁচশ কপি বই বিক্রি হয় তখন প্রকাশকের বিনিয়োগটা উঠে লাভও থাকে। তিনি তো একজন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগ যদি না উঠে তাহলে লেখকের রয়্যালিটি দেওয়া সম্ভব হয় না। আমি অনেক প্রথম সারির প্রকাশকের কথা জানি, যারা ঠিকমতো টাকা দেন। কিন্তু এমন লেখককেও জানি যাদের বই একশত কপিও বিক্রি হচ্ছে না তাদের সঙ্গে প্রকাশকের একটা দ্বন্ধ তৈরি হয়। স্বাভাবিক ব্যাপার যে, আড়তদার যে পণ্যটা বেশি বিক্রি হয় সে সেটা বেশি রাখবে এবং পণ্যটা বিক্রি করে তাকে টাকাটা দিয়ে দেবে। তারপরও কিছু কিছু প্রকাশক আছেন যারা অসদুপায় অবলম্বন করে, যেমন কোনো কোনো বই ছাপে ৫০০ কপি কিন্তু বলে ২০০ কপি। আমি মনে করি যারা সত্যিকার প্রকাশক রয়েছেন তারা যদি লেখকের রয়্যালিটি ঠিকমতো দেন তাহলে যারা অসততা করে তারা বেশিদিন টিকতে পারবে না'। 

লেখক পলাশ মাহবুব এর কাছে জানতে চেয়েছিলাম বিষয়টি নিয়ে। তিনি বলেন, 'লেখক সম্মানীর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার বিষয়টি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। কিছু কিছু প্রকাশক পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজটি করে থাকেন আবার এ কথাও সমান সত্য অনেক প্রকাশক এক্ষেত্রে পেশাদারী আচরণ করছেন না এবং তাদের সংখ্যাটিই বড়। যেহেতু গত প্রায় দুই যুগ ধরে আমার বই প্রকাশ হচ্ছে, ফলে দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই মধ্য দিয়েই আমাকে যেতে হয়েছে। যে কারণে অভিজ্ঞতার আলোকে গত এক দশক যাবৎ আমি তাই তুলনামূলক পেশাদার প্রকাশকদের সঙ্গে কাজ করছি। আমার কাছে মনে, স্বচ্ছতার সঙ্গে যেহেতু সততার বিষয়টি জড়িত তাই এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হলে শেষোক্ত বিষয়টির চর্চা বাড়াতে হবে'।

2 boimela 513

ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ এর প্রকাশক আদিত্য অন্তর এর মতে, 'যারা রয়্যালটি পাওনা সত্যিকার অর্থেই হয়ে থাকেন তারা ঠিক মতোই পেয়ে থাকেন। একজন লেখক যদি মনে মনে ধরে নেন তিনি রয়্যালটি পান, কিন্তু আদতে যদি পাওনা না হয়ে থাকেন তাহলে প্রকাশকের বিরুদ্ধে তিনি নানা কথা বলতেই পারেন। সেজন্য বই প্রকাশের পূর্বেই যথাযথ চুক্তি সম্পাদন করা উচিত। তাহলে কেউ কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারবেন না'।

জাতীয় কবিতা পরিষদের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক কবি শরাফত হোসেন বলেন, 'আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, প্রকাশকরা বই বিক্রির সঠিক হিসাব দেন না। যা দেন তারও সম্মানী দিচ্ছি-দেব বলে সময়ক্ষেপণ করেন। আসলে লেখকদের সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রে প্রকাশকদের একরকম উদাসীনতা আছে, যা সত্যি দুঃখজনক। এখানে পেশাদারিত্বের ঘাটতি রেয়েছে, সেকারণেই আমাদের দেশে প্রকাশনা শিল্প সেই অর্থে দাড়াচ্ছে না। এর দায় লেখক-প্রকাশক উভয়েরই'।

লেখক জয়দীপ দে শাপলু মনে করেন, 'প্রকাশকরা পেশাদারী হয়ে উঠছেন না। তারা মনে করেন, লেখককে ঠকাতে পারলে বিরাট একটা লাভ হলো। কিন্তু প্রকারান্তরে তাদেরই ক্ষতি হয়। লেখকরা লেখালেখিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে'।

18-02-24-Book-Fair-21

বোদ্ধা পাঠকরা মনে করেন, লেখক প্রকাশকের এই অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ কখনো শেষ হওয়ার নয়। তবে প্রকাশকের দিকে অভিযোগের পাল্লাটা বেশি। কারণ তিনি কম্পোজিটর, কাগজ, ছাপাখানা থেকে বাঁধাই সবার টাকা পরিশোধ করতে পারলেও বইটির যিনি স্রষ্টা তার পরিশ্রমের মূল্য দিতে গড়িমসি করেন। আবার অনেকে শুধু 'বই প্রকাশের জন্যই প্রকাশ করা'র কারণে অসৎ প্রকাশকরা সুযোগটি লুফে নেন বলে মনে করেন তারা।