আলজিয়ার্সের ভাষণও নাড়িয়ে দিয়েছিল

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর আরো একটি ভাষণ বিশ্বনেতাদের ভিষণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ১৯৭৩ সালের ৫-৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের সংগঠনের জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যাওয়ার প্রাক্কালে বাহরাইন বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের জ্বালানি গ্রহণকালীন যাত্রাবিরতীকালে, বাহরাইন বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে অপেক্ষমাণ, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের সম্মুখে এক সংক্ষিপ্ত সাংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ঐ সময়ের ১৯৭৩ সালে চলমান আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, প্যালেস্টাইন ও স্বাধীন বাংলাদেশকে আরব রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা তখন পর্যন্ত স্বীকৃতি প্রদান না করাসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক বিষয়ের ওপর বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন। প্যালেস্টাইন ও আরব রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনসহ ভবিষ্যত্ কূটনৈতিক বিষয়ে করণীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সে সময় অত্যন্ত পরিষ্কার, স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ও আমার সরকার মধ্যপ্রাচ্যের প্যালেস্টাইনি জনগণের সংগ্রামরত, ন্যায়বিচারের দাবির প্রতি তাহাদের সমর্থন জানাবে এবং পাশে থেকে একাত্মতা জানাবে। আরব রাষ্ট্রসমূহ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করুক বা না করুক, বাংলাদেশের জনগণ ও আমার সরকার আরব ভাইদের পাশে থাকবে ও দাঁড়াবে।’ বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ঐ স্পষ্ট কথাবার্তা ও ঘোষণার পরদিনই মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের সব পত্রপত্রিকায় প্রধান সংবাদ শিরোনাম বা লিড নিউজ আকারে প্রচারিত হয়েছিল।

আলজিয়ার্সের উক্ত জোট নিরপেক্ষ বা ন্যাম সম্মেলনে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও খুব দৃঢ়, স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে প্যালেস্টাইনসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের চলমান উপনিবেশ, বর্ণবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ, অত্যাচার, নির্যাতন শাসনবিরোধী আন্দোলনের প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পূর্ণাঙ্গ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। বঙ্গবন্ধু মন্তব্য করে বলেন, ‘গোটা বিশ্ব আজ দুই শিবিরে বিভক্ত—অত্যাচারী ও অত্যাচারিত’। গোটা বিশ্বের অত্যাচারিত, নির্যাতিত জাতি ও গোষ্ঠীর নিপীড়িত জনগণের প্রতি সেদিন পূর্ণাঙ্গ সংহতি ও সমর্থন ঘোষণা করেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুর উক্ত ভাষণ প্রদান করার সময় তুমুল করতালি দিয়ে সম্মেলনকক্ষে উপস্থিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানগণ বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান ও সমর্থন জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শেষে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের একমাত্র জীবিত অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মার্শাল জোসেফ টিটো, তৃতীয় বিশ্বের সংগ্রামী রাষ্ট্রসমূহের নেতৃবৃন্দ যথা কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, মিশরের আনোয়ার সাদাদ ও ভারতের মহীয়সী জনপ্রিয় নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা স্বর্গীয় জহরলাল নেহরুর কন্যা ও বাংলাদেশের দুঃসময়ের সুহূদ বন্ধু শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীসহ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ এক এক করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও তৃতীয় বিশ্বের জনগণের একজন সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীকে তার ভাষণের জন্য ভূয়সী প্রশংসা করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের অফুরন্ত শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানিয়েছিলেন বিশ্বের সব নেতা।

১৯৭৩ সালে ইসরাইল-মিশর-সিরিয়ার আরব যুদ্ধে আহত সিরীয় ও মিশরীয় যুদ্ধাহত সেনাদের চিকিত্সার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরের কর্নেল খুরশীদ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী আর্মি মেডিক্যাল টিমসহ প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসামগ্রী, ওষুধপত্র ও কয়েক শ পাউন্ড চা পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ঐ মেডিক্যাল টিম ঢাকা ত্যাগ করার প্রাক্কালে পুরাতন গণভবনের সবুজ প্রাঙ্গণে আর্মি মেডিক্যাল টিমের সদস্যদের প্রত্যেকের হাতে একটি লাল গোলাপ ফুল প্রদান করে বলেছিলেন, ‘তোমরা যুদ্ধাহত আরব ভাইদের পাশে থেকে মানবতার সেবা প্রদান করে, সর্বাত্মকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে, তাদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে মানবিক বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে সেখানে যাচ্ছ। তোমরা যুদ্ধাহত আরব ভাইদের পাশে থেকে সেবা-যত্ন ও শুশ্রূষা করে, বাংলাদেশের জন্য সুনাম ও সম্মান নিয়ে ফিরে আসবে।’ বঙ্গবন্ধু জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগদান, ভাষণ ও আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মিশর ও সিরিয়ার আহত সেনাদের চিকিত্সা প্রদানে একটি চিকিত্সক টিম প্রেরণে তখনকার ঐ সব বিষয় ও ঘটনাবলি আজও আমার ও বাংলাদেশের জনগণের হূদয়ে চীরভাস্কর, অম্লান, অবিনশ্বর স্মৃতি হয়ে আছে।

প্যালেস্টাইনিদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর দ্ব্যর্থহীন সমর্থন ও আরব রাষ্ট্রসমূহের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা প্রদানের লগ্ন থেকেই শুরু হয় এক এক করে সৌদি আরব ব্যতিত মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রসমূহের দ্বারা স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের প্রতিযোগিতা। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রচ্যের একমাত্র ও প্রথম দেশ ইরাক বাংলাদেশকে ১৯৭২ সালের ৮ জুলাই স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় মধ্যপ্রাচ্যের আরব আমিরাত, কুয়েত, কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদানের পর বাংলাদেশের সঙ্গে তখনই এক সুদৃঢ় বন্ধুত্বমূলক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল।

জাতির জনকের গর্বিত কন্যা, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান পিতার দৃঢ়চেতা নীতি-আদর্শের পদচিহ্ন অনুসরণ করে প্যালেস্টাইন ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি তার ও সরকারের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা আদম্যভাবে চালিয়েছেন। ১৯৯৪ সালের কোনো এক সময় তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা প্যালেস্টাইনের সংগ্রামী জনগণের অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা মরহুম ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তিউনিসিয়া সফর করেছিলেন। উল্লেখ্য, প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা (PLO)-এর ইয়াসির আরাফাত ও তার দলবলসহ জর্দান থেকে বহিষ্কৃত হয়ে লেবাননে আশ্রিত অবস্থায় সে দেশ থেকেও বহিষ্কৃত হয়ে তখন দক্ষিণ আফ্রিকার উপমহাদেশের তিউনিসিয়ার সমুদ্রতীরবর্তী স্থানে তিউনিসিয়া সরকারের আতিথেয়তায় সে দেশে আশ্রয় লাভ করে দিন যাপন করছিলেন।

গত বছরের অক্টোবর মাসে শুরু হওয়া গাজা ও পশ্চিম তীরে প্যালেস্টাইনিদের ওপর বিশ্বের সব ‘গণহত্যার মা’ বলে খ্যাত চলমান ব্যাপক গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের আপামর জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করে, অবিলম্বে গাজায় গণহত্যা বন্ধ করে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে, সর্বাত্মক সাহায্য খাবার, পানি ও ওষুধপত্র পাঠানোর জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের তরফ থেকে গাজায় অবরুদ্ধ অনাহারে, বিপত্গ্রস্ত স্বজন হারানো জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, খাবার ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত গাজায় অবিলম্বে গণহত্যা বন্ধ ও যুদ্ধবিরতি ঘোষণাসহ আন্তর্জাতিকভাবে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণসংক্রান্ত সব প্রস্তাবের পক্ষে বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানিয়েছে। জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের গৃহীত বিশ্বজনীন মানবাধিকারসংক্রান্ত 217, A এর ডিসেম্বর ১০, ১৯৪৮ সনদটি আজ পাশ্চাত্যের রক্তাক্ত বিষাক্ত হাতে দলিত-মথিত বন্দি অচল। তাদের দ্বারা প্যালেস্টাইনিদের সমূলে নিশ্চিহ্ন ও মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র থেকে একটি জাতিকে তাদের ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইসরাইলের সরকারকে পাঠানোর মূল শক্তি ও অনুপ্রেরণার উত্স হিসেবে যুক্ত থেকে বাস্তবায়ন করছে। আজ যদি জাতিসংঘের বিশ্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাসংক্রান্ত ঘোষিত সনদপত্রের খসড়া প্রণয়ন কমিটির প্রধান কর্ণধার ও চেয়ারম্যান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্টের স্ত্রী ইলানর রুজভেল্ট বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি গাজায় প্যালেস্টাইনিদের ওপর চার মাসব্যাপী ইসরাইল কর্তৃক চলমান বিভীষিকাময় ভয়াবহ বীভত্স গণহত্যা ও হত্যাযজ্ঞ ধ্বংসাত্মক মানবাধিকার রক্ষাসংক্রান্ত তারই স্বহস্তে প্রণীত বিশ্ব মানবাধিকার রক্ষার স্পষ্ট নীতিমালা ভঙ্গ বা বরখেলাপের অপরাধে শান্তির আইনকানুন সংবলিত সনদের চরম অবজ্ঞায় জ্ঞান হারাতেন। তারই দ্বারা প্রণীত বিশ্বজনীন মানবাধিকারের নিরাপত্তার ও সংরক্ষণের বাইবেল সমতুল্য জাতিসংঘের ‘বিশ্বজনীন মানবাধিকার সংবলিত ঘোষণাপত্রটির দলিল’ আজ যুদ্ধবাজ ঘাতক সরকার দ্বারা চরম অবজ্ঞায় দলিত-মথিত। বিশ্বশান্তি রক্ষার দাবিদার জাতিসংঘকে আজ গাজা-রাফাহের নৃশংস গণহত্যা ধ্বংসযজ্ঞ নীরবে বসে অবলোকন না করে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রকে একসঙ্গে ইসরাইলি এই চরম মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ড, ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি বিশেষ জরুরি সভার আহ্বান জানানো উচিত এখনই।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, দেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে গবেষক