আগুনের ঝুঁকি নিয়ে যশোর শহর জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য বহুতল ভবন। এর কোনোটি আবাসিক, কোনোটি বাণিজ্যিক। আবাসিক-বাণিজ্যিক মিলিয়েও রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। আবাসিকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবনের মধ্যে যেমন শপিংমল, মার্কেট, আবাসিক হোটেল রয়েছে, তেমনি রয়েছে এনজিও থেকে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং আইটি পার্ক।
এসব ভবনে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের বিদ্যমান সুবিধায় ভবনের বাইরে থেকে সর্বোচ্চ তিন তলা পর্যন্ত আগুন নেভানো সম্ভব। এর বাইরে সিঁড়ি দিয়ে আগুন নেভানোর কাজ করতে হবে—যা সাধারণ মানুষ বা ফায়ার ফাইটারের জীবন কিংবা ভবনের কোনোটিকেই সুরক্ষা দেওয়ার জন্য মোটেও সক্ষম নয়। ঝুঁকির বিষয়টি নিশ্চিত জেনেও নোটিশ দিয়ে দায় সারছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে ভবনকে ঝুঁকিমুক্ত করতে ‘ফায়ার ফাইটিং’ সুবিধার সংযোজন বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো পদক্ষেপ কোনো কর্তৃপক্ষই নেয়নি। আইন প্রয়োগের জটিলতাও রয়েছে আবার আইনেই। সব মিলিয়ে বিশাল এক ঝুঁকি হয়েই ভবনগুলো মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসসূত্র জানায়, ৭ তলা থেকে ১৬ তলা পর্যন্ত যশোরে ৭০-৭৫টি ভবন রয়েছে। এর বাইরে ছোট ছোট মার্কেট, সুপার মার্কেট ও শপিংমল রয়েছে অসংখ্য। ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শকরা ফায়ার ফাইটিং ফ্লোর প্লান আছে কি না, পরীক্ষা করে এ বছর এ পর্যন্ত ৮৭টিকে নোটিশ করেছেন। নোটিশ পেয়ে কেউ কেউ ফায়ার এক্সটিং গুইশার সংগ্রহ করেছে। ফায়ার লাইসেন্স নিচ্ছে।
তবে বড় প্রতিষ্ঠানে কেউ কেউ ফায়ার পাম্প স্থাপন করলেও তা পরিপূর্ণ না। আবার বহুতল ভবনে বা প্রতিষ্ঠানে ১ লক্ষ গ্যালন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ভূগর্ভস্থ পানির রিজার্ভার থাকার নিয়ম থাকলেও তা নেই। ফলে আগুন লাগলে পানির অভাবে ফায়ার সার্ভিসের আগুন নেভাতেও বেগ পেতে হবে। আবার এমন সব সরু রাস্তার পাশে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, যেখানে ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি পৌঁছাতেই পারবে না।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক সাইবুর রহমান মোল্লা বলেন, শহরের ভবনগুলোর আগুন প্রতিরোধী নিরাপত্তাব্যবস্থা মোটেও সুদৃঢ় না। গোটা শহরই ঝুঁকির মধ্যে আছে। যশোর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করে সতর্কিকরণ চিঠি দিয়েছি।
যশোর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সহকারী পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ জানান, যশোর শহর জুড়ে অপরিকল্পিত বহুতল ভবন ও মার্কেট গড়ে উঠেছে। এসব ভবনের কোনোটিই ঝুঁকির বাইরে না। বড় ধরনের আগুন লাগলে বিপর্যয় এড়ানো অনেক কষ্টকর ব্যাপার হবে। এখানে এমন সব বড় বড় ভবন গড়ে উঠেছে, যার টপ ফ্লোর বা ওপরের দিকে আগুন লাগলে নেভানোর মতো সক্ষমতা এই মুহূর্তে নেই।
বিশেষ করে একটি অভিজাত হোটেল, শেখ হাসিনা সফটওয়্যার পার্কসহ বেশ কয়েকটি ১২-১৬ তলা ভবন রয়েছে, যেখানে আগুন নেভানো অত্যন্ত কঠিন। এসব ভবনের রুফটপ সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকার নিয়ম, যাতে নিচের দিকে আগুন লাগলে, তাত্ক্ষণিকভাবে ছাদে গিয়ে মানুষ জীবন বাঁচানোর মতো আশ্রয়টুকু পায়। অথচ সেখানেও রেস্টুরেন্ট বসানো হয়েছে। আবার অনেক ভবনের ছাদ ফাঁকা থাকলেও, ঢোকার মুখ লক করা। ফলে মানুষ বিপদের আশ্রয়ে ছাদে পৌঁছাতে পারবে না। তিনি বলেন, প্রতিটি বহুতল ভবনের সুরক্ষার জন্য অবশ্যই দুটি সিঁড়ি থাকতে হবে। ভেতরে না হলে বাইরে দিয়ে করতে হবে। তা না হলে ভবনের ‘লোড ক্যাপাসিটি’ কমাতে হবে। তিনি আরো বলেন, আগুন নেভানোর জন্য টার্ন টেবল লেডার (টিটিএল), উদ্ধার কাজের পরিপূর্ণ ইমার্জেন্সি টেন্ডার (ইটি) এবং বড় পানিবাহী গাড়ি এখানে নেই। এসব অপর্যাপ্ততার কথা জানিয়ে চিঠি লিখেছি। এসব পাওয়া গেলে এই জেলাকে আগুনের উদ্ধার কার্যক্রমের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া যাবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের অগ্নি অনু বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহানারা খাতুন মোবাইলে ইত্তেফাককে বলেন, যশোরে অগ্নিনির্বাপণ সামগ্রির অপর্যাপ্ততা রয়েছে। সেখান থেকে চাহিদা পেয়েছি। টিটিএল শুধু বিভাগীয় শহরে দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এই মুহূর্তে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। তবে প্রজেক্ট নিয়ে ভবিষ্যতে জেলা শহরে টিটিএল দিতেই হবে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত হয় না যে কারণে
অগ্নিনির্বাপণ আইন অনুসারে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে সর্বনিম্ন তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সহকারী পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল হাসান নিশ্চিত করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান আছে। এ অবস্থার মধ্যেই দুর্যোগ প্রস্তুতি নিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ। জেলা শহরসহ সব উপজেলায় দুর্যোগ প্রস্তুতির মহড়া হয়েছে। আগামীকাল (রবিবার) জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস পালিত হবে। আর ১২ মার্চ কালেক্টরেট সভাকক্ষে ৬৬টি মার্কেট, শপিংমল মালিক ও কমিটির নেতৃবৃন্দের সভা অনুষ্ঠিত হবে।