মুড়ির সাতকাহন

নদীনালা বেষ্টিত ধনধান্যে পুষ্পেভরা তরুপল্লবের সবুজে ঘেরা বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতিতে মুড়ি বিশেষ জায়গা জুড়ে আছে। বৈচিত্র্যময় ষড়্ঋতুর এ দেশে সুস্বাদু ও মুখরোচক এই মুড়ি খায়নি—এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

এদিকে ভারত উপমহাদেশে বাংলাদেশসহ ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কায় মুড়ি জনপ্রিয় খাবার। বিশ্বব্যাপী মুড়ি আছে। আর দেশ ও অঞ্চলভেদে মুড়ির নানারকম নাম পরিলক্ষিত হয়ে থাকে যেমন—হুড়ুম, মুরাই, ভাজা, মুধি, ওরুম, লাইয়্যা, মুড়মুড়ে, পারমাল ইত্যাদি। অবশ্য ইংরেজিতে Puffed Rice হিসেবে পাশ্চাত্যে বিশ্বে পরিচিত। মুড়ির প্রচলন কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা সংগত কারণেই পাঠকসমাজে প্রশ্ন উঠতে পারে। অনেক ইতিহাসবিদ বলেন যে, আদিম যুগে যাযাবর শিকারিজীবন ত্যাগ করে মানুষ যখন স্থায়ী আবাসন তৈরিসহ খাদ্য সংগ্রাহক থেকে পরবর্তী ধাপের খাদ্য উত্পাদনকারী সমাজে প্রবেশ করে, তখন হয়তো অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীর সঙ্গে মুড়ির সংযোজন হয়। উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেননা সেই সময়ের মৃত্পাত্রে শস্যকণা ভাজার আলামত পেয়েছেন বলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা প্রকারান্তরে উল্লেখ করেছেন। আর বাংলাদেশে মুড়ির প্রচলনের কথা বলতে গেলে সমগ্র ভারতবর্ষের আলোকে চিন্তা করা সমীচীন। এক্ষেত্রে মৌর্য যুগেরও বেশ আগে মগধের উত্থানপর্ব থেকে মুড়ির প্রচলন হয়েছে বলে জানা যায়। অবশ্য কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন যে, বৈদিক যুগে দেবতাদের জন্য যে যজ্ঞ হতো, সেখানে চাল ভাজার স্থান ছিল বিধায় আমরা ঐ চাল ভাজাকে মুড়ির আদিরূপ বলতে পারি।

আসলে মুড়ি ধান থেকে তৈরি একধরনের স্ফীতি খাবার বা ভাজা চাল। বস্তুত চালের অন্তবীজ (Starch) গরম করে বাস্পের উপস্থিতিতে উচ্চ চাপের সাহায্যে মুড়ি তৈরি করা হয়। যদিও এর প্রস্তুতপদ্ধতি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। তবে ইদানীং মেশিনে তৈরি মুড়ি অধিক পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। দুঃখের বিষয় হলো যে, দিনে দিনে হাতে প্রস্তুত মুড়ির কার্যক্রমটি দ্রুত কমে আসছে। আগে ‘বরণ’ নামক ধান মুড়ির জন্য ব্যবহূত হতো। তাছাড়া আউশ ধানের মুড়ি বেশ সুস্বাদু। এখন সেই আউশ ও বরণ ধান আর তেমন দেখা যায় না। বর্তমানে ইরি-৮, ইরি-১৬, স্বর্ণা, বিআর-১১, বিআর-২৯, ইত্যাদি, সব ধরনের ধানের চাল মুড়ির জন্য ব্যবহূত হয়। এদিকে মুড়ির জন্য নির্ধারিত ধান থেকে চাল তৈরির আগে ঐ ধান ভেজানোর ব্যাপারে বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রসঙ্গক্রমে মেশিনে যে মুড়ি তৈরি করা হয়, তার অধিকাংশ চাল বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বিধায় সেই মুড়ি এলসি মুড়ি হিসেবে অভিহিত।

মুড়ি কেবল মজাদার খাবারই নয়। এর খাদ্যগুণও কম নয়? নমুনা হিসেবে যদি ১০০ গ্রাম মুড়ি বিশ্লেষণ করা হয়; তাহলে দেখা যায় যে এতে শর্করা ৮৯.৬০ গ্রাম, প্রোটিন ৬.৩০ গ্রাম, ক্যালরি ৪.০২ গ্রাম, চর্বি ০.৫০ গ্রাম এবং অন্যান্য .০৩। তাছাড়া এতে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম যথাক্রমে ৬ মি. গ্রাম, ৬ মি. গ্রাম এবং ৩ মি. গ্রাম পাওয়া যায়। মুড়ি অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে; সোডিয়ামের পরিমাণ কম বিধায় এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এদিকে মচমচে মুড়ির বৈশিষ্ট্য ও গঠনের সুবাদে চিবিয়ে খেতে হয় বলে বেশ ব্যায়াম হয় বিধায় দাঁত ও মাড়ি ভালো থাকে। এখন অবশ্য উলটো চিত্র।

এই তো কয়েক দিন আগে কাওরান বাজারে গিয়েছিলাম। সেখানকার একটি মুড়ির দোকানের সামনে এক বৃদ্ধলোক নিষ্পলক দৃষ্টিতে মুড়ির বস্তার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলছেন, ‘হায় রে মুড়ি, ছোটবেলা থেকে তোকে কত ভালোবাসতাম। কিন্তু প্রতিদানে এত বড় ক্ষতি করলি?’ শুনে দাঁড়িয়ে গেলাম। সালাম দিয়ে জিগ্যেস করলাম কারণ।  তিনি বললেন,  দেখুন বাবা, আমি গ্রামের ছেলে; বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করে সরকারি চাকরিতে একজন আমলা ছিলাম। এখন অবসরপ্রাপ্ত। ছোটবেলা থেকেই মুড়ি পছন্দ করি এবং এটি আমার খুব প্রিয় খাবার। বলতে গেলে ভাত না হলেও চলে। গত বছর (২০২৩) মে মাসে হঠাত্ কিডনিজনিত সমস্যার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে পরীক্ষানিরীক্ষা করে এক অভিজ্ঞ ডাক্তার বলেন যে, ইউরিয়ামিশ্রিত অতিরিক্ত মুড়ি খাওয়ার কারণেই নাকি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছি। তাই মুড়ি দেখলে জেগে উঠে সেই দুঃখ।’

এই তো শুরু হচ্ছে রোজা। আমাদের রোজায় অপরিহার্য খাবার মুড়ি। মুড়ি ছাড়া ইফতার যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই মুড়ির মধ্যে যদি নীরবে-অদৃশ্য ঘাতক বসে থাকে, তাহলে কোথায় যাব আমরা? গ্রামের যে মুড়ি এখনো ছিটেফোঁটা ভাজা হয়, তা শহুরে মানুষের কাছে দুষ্পাপ্য হয়ে উঠছে। আর সেই ভাজা মুড়িও যে সারবিহীন, এমন নিশ্চয়তা নেই। তথাপি সবার রোজার উদ্দেশ্য ও নিয়ত সফল হোক। 

লেখক: রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মাননা ও পদকপ্রাপ্ত