স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পুলিশ সপ্তাহে ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই ভাষণে তিনি মানুষকে ভালোবাসতে ও সেবা দিতে বলেছেন, সৎ থাকতে বলেছেন। পুলিশকে যেন মানুষ ভয় না করে ও ভালোবাসে, সেভাবে কাজ করে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে বলেছেন।
বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেন, ‘২৫ মার্চ রাত্রে যখন ইয়াহিয়া খানের সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের মানুষকে আক্রমণ করে, তখন তারা চারটি জায়গা বেছে নিয়ে তার ওপর আক্রমণ চালায়। সেই জায়গা চারটি হচ্ছে- রাজারবাগ, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর আমার বাড়ি। রাজারবাগের পুলিশেরা সেদিন সামান্য অস্ত্র নিয়ে বীর বিক্রমে সেই সামরিক বাহিনীর মোকাবিলা করেন। কয়েক ঘণ্টা তুমুল যুদ্ধ করেন। তারা এগিয়ে আসেন বাংলাদেশের মানুষকে রক্ষা করতে।’
‘..সেদিন বাংলার জনগণের ডাকে, আমার হুকুমে এবং আমার আহ্বানে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী এগিয়ে এসেছিল মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। বাংলাদেশের জনগণকে রক্ষা করতে। স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে রাজারবাগের এবং পুলিশের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
পুলিশ বাহিনীর অনেক কর্মী এখানে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা রাস্তায় নেমে যুদ্ধ চালিয়েছিলেন নয় মাস পর্যন্ত। যারা বাহিনীর বড় বড় কর্মচারী ছিলেন, তাদেরও অনেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘..আমার মনে আছে যেদিন আমি জেল থেকে বের হয়ে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বুকে ফিরে আসি, সেদিন দেখেছিলাম আমাদের পুলিশ বাহিনীর না আছে কাপড়, না আছে জামা, না কিছু। অনেককে আমি ডিউটি করতে দেখেছি লুঙ্গি পরে। একদিন রাত্রে তারা আমার বাড়ি গিয়েছিল।
তাদের পরনে ছিল লুঙ্গি, গায়ে জামা, হাতে বন্দুক। ...একটা কথা আপনাদের ভুললে চলবে না। আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। আপনারা বিদেশি শোষকদের পুলিশ নন, জনগণের পুলিশ। আপনাদের কর্তব্য জনগণের সেবা করা, জনগণকে ভালোবাসা, দুর্দিনে জনগণকে সাহায্য করা। ...আপনাদের নিকট বাংলাদেশের মানুষ এখন একটি জিনিস চায়। তারা যেন শান্তিতে ঘুমাতে পারে। তারা আশা করে, চোর, বদমাইশ, গুণ্ডা, দুর্নীতিবাজ যেন তাদের ওপর অত্যাচার করতে না পারে। আপনাদের কর্তব্য অনেক।’
‘আমি আপনাদের কাছে এই আশা করব যে, আপনারা হবেন আমার গর্বের বিষয়। বাংলাদেশের মানুষ যেন আপনাদের জন্য গর্ব অনুভব করতে পারে। ..আপনারা যদি আজকে ভালোভাবে থাকেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, তাহলে আমি বিশ্বাস করি, যে থানায় ভালো অফিসার আছেন এবং ভালোভাবে কাজ করছেন, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনা প্রকার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে না। কারণ, তারা সবসময় সজাগ থাকেন এবং দুষ্টকে দমন করেন। যিনি যেখানে রয়েছেন, তিনি সেখানে আপন কর্তব্য পালন করলে দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে না।’
‘আপনাদের বনে-বাদাড়ে নদীতে লোকালয়ে সর্বত্র যখন যেখানে প্রয়োজন পড়ে, ডিউটি করতে হয়। চব্বিশ ঘণ্টা মানুষের পাশে থেকে কাজ করতে হয়। অনেকে বলেন যে, সকলের ছুটি আছে, কিন্তু পুলিশের ছুটি নেই। এজন্য আমার দুঃখ হয়। সংখ্যায় আপনারা খুব কম বলেই আপনাদের রাত দিন কাজ করতে হয়। আমি আপনাদের সব অসুবিধার খবর যে রাখি না তা নয়। কিন্তু উপায় কি? সাধারণ মানুষের টাকা দিয়েই সব চলে।..আজকে আপনারা আরও প্রতিজ্ঞা করুন, আমরা এমন পুলিশ গঠন করবো, যে পুলিশ হবে মানুষের সেবক, শাসক নয়।’
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ৮ মার্চ থেকে শুরু হয় দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন। পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত ৩৩ হাজার ৯৯৫ জনের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার বাঙালি পুলিশ সদস্য সাধারণ জনতার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ তখন হয়ে উঠে মুক্তিকামী বাঙালির চিন্তা-চেতনার একমাত্র বহিঃপ্রকাশ, যা বাঙালি পুলিশের বিভিন্ন স্তরের সদস্যদেরকে ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং মানসিক শক্তি যোগায়। প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে শুরু করে মহান মুক্তিসংগ্রামে বাঙালি বীর পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং এসডিপিওসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার ১১০০ জনেরও বেশি (কোথাও প্রায় ১২৬২ জন) পুলিশ সদস্য শহিদ হন।
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিধান, আইন-শৃঙ্খলা ও জনগণের জানমালের রক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা। জাতীয় যেকোনো সংকটে দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ পুলিশ। মহামারি করোনাকালে নিজেদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া, সেবা প্রদান, খাদ্য বিতরণ, ঔষধ পৌঁছে দেওয়া, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, অক্সিজেন সরবরাহ ইত্যাদি কাজ করেছে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা। জঙ্গি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণে বাংলাদেশ পুলিশ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দায়িত্ব পালনের সময় ধুলাবালি ও পরিবেশ দূষণের ফলে পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। তাছাড়া, খাবার গ্রহণে অনিয়ম, রাস্তা-ঘাটে ডিউটি, পরিমিত ঘুম ও বিশ্রামের অভাবে পুলিশ সদস্যদের নানা রকমের শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ কেবল দেশেই নয়, দেশের বাইরেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তথ্য মতে, জনশৃঙ্খলায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন ৩৭৬ জন। যাদের অনেকেই দায়িত্ব পালনকালে নির্মমতা ও নৃশংসতার শিকার হয়েছেন। কর্তব্যরত অবস্থায় ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন ১২৮ জন, ২০১৭ সালে ১৩০ জন, ২০১৮ সালে ১৫৮ জন, ২০১৯ সালে ১৭৯ জন, ২০২০ সালে ২০৮ জন, ২০২১ সালে ১৩৮ জন, ২০২২ সালে ১২১ জন এবং ২০২৩ সালে ১৩৪ জন। তন্মধ্যে মহামারী-অতিমারী করোনায় সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে আত্মোৎসর্গকারী বীর পুলিশ সদস্য সংখ্যা ১০৭ জন। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত থেকে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিদেশের মাটিতে লাল-সবুজের আবরণে মৃত্যুবরণ করেছেন ২২ জন এবং ১২ জন সদস্য আহত হয়েছেন।
পুলিশ আইন, ১৮৬১ (১৮৬১ সালের ৫ নং আইন) এর ২২ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘এই আইনের উদ্দেশ্যে প্রত্যেক পুলিশ কর্মচারী সর্বদা দায়িত্বরত বলে বিবেচিত হবে এবং যেকোনো সময় জেলার যেকোনো স্থানে তাকে পুলিশ অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করা যাবে।’
তাই বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যগণ চব্বিশ ঘণ্টাই মাঠে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। জনগণের সেবা করাই পুলিশ বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের পবিত্র দায়িত্ব। পুলিশ রাষ্ট্রের সেই অর্পিত গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়েই নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। প্রশিক্ষণ সমাপনীতে যে শপথ পাঠ করানো হয় প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে তারই প্রতিফলন হয় কর্মে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্য দিয়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত পুলিশ সদস্যদের কৃতিত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানকে স্বরণ করা হয়। বাংলাদেশ পুলিশেও ২০১৭ সালের ১ মার্চ থেকে কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গকারী পুলিশ সদস্যদের স্মরণে ‘পুলিশ মোমোরিয়াল ডে’ পালন করে আসছে। কর্তব্যের তরে করে গেলে যারা আত্মবলিদান/প্রতিক্ষণে স্মরি রাখিবো ধরি তোমাদের সম্মান।
লেখক: পুলিশ সুপার, নৌ পুলিশ, সিলেট অঞ্চল।