‘আহলান সাহলান, ইয়া শাহরু রমাদান’—স্বাগত হে মাহে রমজান! দীর্ঘ ১১ মাসের ধারাবাহিক প্রতীক্ষার পর রমজান সমাগত আজ আপন পরিবারে, বিশ্ব মুসলিমের যাপিত জীবনে। আজ সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা গেলে আগামীকাল হবে এই মোবারক মাহে রমজানের প্রথম দিন। সূর্যাস্তের পরেই সূচনা হয় এই মহিমান্বিত মাসের ও মহামহিম দিবসের। চন্দ্র বছরে রাত আগে আসে, পরে দিন। এই হিসাবে পূর্ণ দিবসের প্রথম প্রহর শুরু হয় সূর্যাস্তের অব্যবহিত পরেই, মাগরিবের আজানের সময়। এজন্য শাবান মাসের উনত্রিশতম দিবসে রমজানের নতুন চাঁদ ওঠার অপেক্ষায় থাকতে হয়। নতুন চাঁদ দেখলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হয় এভাবে :হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এই চাঁদকে সামগ্রিক কল্যাণের চাঁদ করে দিন। হে আল্লাহ! এই চাঁদকে আমাদের জন্য সৌভাগ্য, বরকত, নিরাপত্তা, শান্তি ও ইমান-ইসলামের অবলম্বন করে দিন। আল্লাহ তো আমার প্রভু এবং আল্লাহ তো তোমারও প্রভু। (সুনানে তিরমিজি :৩৪৫১)
রসুলুল্লাহ (স.) এই-দোয়া করেছেন, আমাদের জন্যও চাঁদ দেখে এই দোয়া করা সুন্নত। আকাশ মেঘলা থাকলে বা অন্য কারণে চাঁদ দেখা না গেলে এবং চাঁদের উদয়ন শনাক্ত করা না গেলে শবান মাস ৩০ দিন পূরণ করতে হবে। তখন চাঁদ দেখা যাক বা না যাক, পৃথিবীবাসী কেউ চাঁদ দেখুক বা না দেখুক, রমজান শুরু হয়ে যায়। এভাবেই নিশ্চিত হতে হয় রমজান আগমনের। রমজানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সুন্নতের একটি হচ্ছে রমজানকে স্বাগত জানানো এবং রমজানের টেকসই প্রস্তুতি গ্রহণ, অন্যটি হচ্ছে রমজানের আগমন সুনিশ্চিত করে রমজান পালন। সহিহ হাদিসে এসেছে, কেউ রমজান নিশ্চিত না হয়ে সন্দেহের দিনে রোজা রাখলে সে তো মুহাম্মদ (স.)-এর সঙ্গে নাফরমানি করে। (সুনান নাসায়ি :২১৮৮)
এরপর মাগরিবের নামাজ, এশার নামাজ, তারাবিহ, নিদ্রা ও তাহাজ্জুদের নামাজ প্রভৃতি সম্পাদনের ধারাবাহিকতায় এই রোজা পরিপালনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় শেষ রাতে সাহরি ভক্ষণের মধ্য দিয়ে। সাহরি শেষে রোজাদার মণেপ্রাণে নিয়ত করেন দিনব্যাপী ত্যাগ ও সংযম যাপনের। ‘সাহরি ভক্ষণ’ রোজা যাপনের অন্তঃস্থ নিয়তের দৃশ্যমান অনুষঙ্গ বলে গণ্য হয়। এরপর রোজাদার জামাতের সঙ্গে মসজিদে ফজরের সালাত আদায় করেন। কেউ কেউ সূর্যোদয়ের পরে ইশরাক ও চাশতের নামাজও আদায় করেন এবং কুরআন তেলাওয়াত ও অধ্যয়ন করতে করতে একান্ত অপেক্ষায় থাকেন দ্বিপ্রহরের জোহর ও পড়ন্ত বিকালের আসরের নামাজের। সমগ্র দিন-রাতের নিরন্তর ইবাদতবন্দেগির মধ্যে আরো থাকে কুরআন তেলাওয়াত, জিকর-আজকার, তাওবা-ইস্তিগফার ও আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে নিবিড় দোয়া-প্রার্থনার। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে পরম আনন্দে রোজাদার তার প্রথম রোজার ইফতার করেন এবং অন্য রোজাদারদের ইফতার করান।
আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ‘রমজান এমন মাস, যে মাসে অবতীর্ণ করা হয়েছে আল-কুরআন; মানুষের পথনির্দেশ, সুস্পষ্ট পাথেয় ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী বিধানরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পায়, সে যেন রোজা পালন করে। (সুরা বাকারা :আয়াত ১৮৫)। এই আয়াতে উদ্ধৃত ‘সুতরাং’ সংযোজন দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে রমজান মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে বলেই কুরআন নাজিলের বদৌলতে রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহর সংস্পর্শ থেকে ছিটকে পড়া দিশেহারা বিশ্ব মানবতাকে এই কুরআনই তার অলৌকিক শক্তিতে আল্লাহর সঙ্গে পরম যত্নে সুসম্পর্কিত করেছে পর্যায়ক্রমে। মুসলিম উম্মাহ কুরআন নাজিলের সেই শুকরিয়া আদায় করে রমজানের রোজা পরিপালনের মধ্যে দিয়ে। এ কারণে রমজানের রোজা ও অন্যান্য এবাদতবন্দেগিকে মুমিন জীবনের সুপরিকল্পিত প্রশিক্ষণ বিবেচনা করা হলে এই প্রশিক্ষণের প্রধান পাঠ ও অনুকরণীয় বাধ্যবাধকতা হচ্ছে আল কুরআন। আমরা রমজানের প্রথম রোজায় সিক্ত হয়ে সুদৃঢ় সংকল্প করতে চাই, আমরা যেন ইমানের দাবি পূরণ করতে পারি আমাদের বাস্তব জীবনে কুরআন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন।
লেখক: প্রো-ভাইস চ্যানসেলর,
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা