৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে ফিলিস্তিনি গ্রুপ হামাস প্রথমে আক্রমণ করে। পালটা জবাবে ইসরায়েল এরই মধ্যে ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি হত্যা ও ৭০ হাজারের ওপর মানুষকে আহত করেছে। অনেকে এখনো নিখোঁজ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামাসকে শেষ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পুরো গাজা উপত্যকা এখন ধ্বংসস্তূপ। ৭ মার্চ ঘটনার পাঁচ মাস পূর্ণ হয়। এটি কেবল ইসরায়েল ফিলিস্তিন নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষৎ বদলে দিতে পারে।
৭ অক্টোবরের হামলা দেখিয়ে দিয়েছে নেতানিয়াহুর সরকার আসলে কতটা শক্তি রাখে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাশে থাকুক আর না থাকুক তারা এগিয়ে যাবে। জাতীয় পরিচয় ও সার্বিক জনকল্যাণের জন্যই ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলকে বোঝাপড়ায় আসতে হবে। দ্বন্দ্ব জিইয়ে রেখে স্বাভাবিক রাষ্ট্রের মতো টিকে থাকা সম্ভব নয়। দিনটি ইসরায়েলের ইতিহাসে টার্নিং পয়েন্ট হতে চলেছে। শান্তি অথবা যুদ্ধ-এই দুইয়ের একটি তাদের বেছে নিতে হবে।
এখন লেবানন সীমান্তে হিযবুল্লাহ গেরিলাদের সঙ্গে সংঘাত নিয়মিত ঘটনা। ওদিকে লোহিত সাগরের প্রবেশ দুয়ারে ইরানপন্থি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা নিজেদের পশ্চিমা নৌযানের ওপর হামলা শুরু করেছে। ইরাক, সিরিয়া ও জর্ডানের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নিয়মিত গেরিলা হামলা হচ্ছে। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্য এত বৃহত্ পরিসরে লড়াই আর প্রত্যক্ষ করেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২৫ অক্টোবর বলেন, ‘৬ অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েল যে দেশটি ছিল ৭ অক্টোবর থেকে আর সেই দেশ নাই। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত যে স্ট্যাটাস কিউ বজায় ছিল তাতে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়।’ যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত মাইকেল হারজগকে তিনি ঐ কথা বলেন। জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহও অক্টোবরের শেষের দিকে এই মর্মে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন যে, পুরো অঞ্চল সম্ভবত এক অনিশ্চয়তার গহবরে পড়তে চলেছে। এসব ভবিষৎবাণী সঠিক হতে পারে, ভুলও হতে পারে। তবে ঘটনা শুরুর পাঁচ মাস পরও কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না।
যুদ্ধের পর শান্তি আসে এটা অতীতে অনেক সময় দেখা গেছে। যেমন ১৯৭৩ সালে মিশর-ইসরায়েল যুদ্ধের দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৭৮ সালে। ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করেন এরপর উপসাগরে যুদ্ধ ও ১৯৯১ সালের অক্টোবরে মাদ্রিদে শান্তি আলোচনায় বসে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিরা। ১৯৮৭ সালে শুরু হওয়া প্রথম ইন্তিফাদা অসলো শান্তিচুক্তির পথ প্রশস্ত করে। বর্তমান বিপর্যয়ের কোনো ইতিবাচক পরিণতি আশা করা যায় কি ? উত্তর হ্যাঁ হওয়ার সম্ভবনা কম। এর দুটো কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে—প্রথমত, উপযুক্ত নেতৃত্ব ছাড়াই যে জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই করছে তাদের হয়ে বৈরী প্রতিপক্ষের সঙ্গে দর কষাকষি করবে কে? দ্বিতীয়ত লড়াই এখন ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আঞ্চলিক কয়েকটি পক্ষ জড়িয়ে গেছে এর সঙ্গে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান নিজের আঞ্চলিক অবস্থান আরো সংহত করেছে। লেবাননে হিযবুল্লাহ ও ইয়েমেনে হুতি মিলিশিয়া, সিরিয়া ও ইরাকে নিজেদের পছন্দমতো গ্রুপদের দিয়ে মার্কিন ঘাঁটি টার্গেট করে হামলা শুরু করেছে। লড়াই শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করে। লক্ষ্য ছিল সীমান্ত এলাকা থেকে হিযবুল্লাহকে প্রত্যাহার করে লেবানিজ সৈন্য মোতায়েন করা। তবে আলোচনা বেশিদূর এগোয়নি। ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে ইরানপন্থি গ্রুপগুলো সক্রিয় হলেও পারস্য উপসাগর তুলনামূলক শান্ত রয়েছে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এখনই ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াক সেটি সৌদি আরব ও আরব আমিরাত চায় না।
গাজার ভবিষৎ কী হতে পারে? ইসরায়েল মাসের পর মাস সামরিক হামলা চালিয়েও হামাসকে শেষ করতে পারেনি। ইসরায়েলি গোয়েন্দা জানান হয়েছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হামাস একটি ‘সন্ত্রাসী গ্রুপ বা গেরিলা গ্রুপ’ হিসেবে টিকে থাকবে। রাজনৈতিক পর্যায়ে ঐ তথ্য শেয়ার করা হয়েছে। হামাসের ৭ অক্টোবরের অনুরূপ আরেকটি হামলার সামর্থ্য অদূর ভবিষ্যতে হয়তো হবে না, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যে কোনো ভবিষৎ উদ্যোগে তাদেরকে বাদ দিয়ে হবে না। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো সংঘাত আগে শুরুর জন্য হামাসকে দায়ী করলেও যুদ্ধের ফলে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনিরা তাদের এই দুর্গতির জন্য ইসরায়েলকে দুষছে, সাম্প্রতিক জনমত জরিপে এটা দেখা গেছে। হামাসের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) ব্যর্থতা। আব্বাসের নেতৃত্বে থাকা ফাতাহ এখন পিএর দায়িত্বে আছে। তবে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের এখন কোনো ভূমিকা নাই।