গ্যাং সংস্কৃতি লালন-পালনের পরিণাম

২০ হাজার বর্গমাইল ভূখণ্ড রীতিমতো তছনছ করিয়া দিতেছে মাস্তান বাহিনী! দেশের প্রধান কনটেইনার বন্দর কবজা করা, স্থানীয় পুলিশ স্টেশন বোমা মারিয়া উড়াইয়া দেওয়া, রাস্তাঘাট অবরুদ্ধসহ বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হইয়াছে হাইতিতে। মাস্তান বাহিনীকে লালনপালন ও হূষ্টপুষ্ট করিয়া তুলিবার ফলাফল দেশ ও জাতির জন্য কতটা ভয়াবহ হইতে পারে, হাইতির রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সে জ্বলন্ত আগুন তাহারই জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। গ্যাং সহিংসতার অগ্নিগর্ভে জ্বলিয়া-পুড়িয়া মরিতেছে উত্তর আমেরিকার ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের এই দেশ। ক্ষুদ্র এই দেশ যেন গ্যাং গ্রুপের আঁতুড়ঘর হইয়া উঠিয়াছে! অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতির পীঠস্থান পোর্ট অব প্রিন্সকে দোর্দণ্ড প্রতাপে নিয়ন্ত্রণ করিতেছে শত শত গ্যাং। দেশময় তাহাদের দৌরাত্ম্যপনায় এই জনপদের দেড় কোটি মানুষ জিম্মিদশায় নিপতিত।

মাস্তান বাহিনীর সহিত বাহাসে জড়াইয়া গতকাল পদত্যাগে বাধ্য হইয়াছেন হাইতির প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল হেনরি। ক্ষমতার চেয়ার ছাড়িয়াও তাহার নিষ্কৃতি মেলে নাই, বর্তমানে পুয়ের্তো রিকোতে তাহাকে আটকাইয়া রাখা হইয়াছে।  হাইতির সশস্ত্র গ্যাংগুলি হেনরিকে দেশে ফিরিতে দিতেছে না। অবস্থা কতটা বেগতিক হইলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়া দেওয়ার সাহস করে গ্যাং গ্রুপ! প্রধানমন্ত্রী হেনরিকে পদত্যাগ করিবার হুংকার দিয়া দেশটির শীর্ষ গ্যাং লিডার জিমি চেরিজিয়ার বারবিকিউ বলিয়াছিলেন, ‘যত দিন প্রয়োজন, যুদ্ধ তত দিন চলিবে।’ ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এই সকল গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের মুখে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিলেন বটে, তথাপি প্রশ্ন থাকিয়া যায়, ইহাতে হাইতির অস্থিরতা কি থামিয়া যাইবে? মোটেও তাহা নহে। কারণ, নেতৃত্বের হাত ধরিয়া যেই দেশে সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি, মান্তান-চাঁদাবাজদের উত্থান ঘটে, সেই দেশের ভবিষ্যত্ গভীর অন্ধকারে ঢাকিয়া যাইবে—ইহাই স্বাভাবিক।

হাইতির ঘটনা যেন উন্নয়নশীল বিশ্বের বাস্তবতাকেই চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতেছে। স্মরণ করাইয়া দিতেছে ফ্রাংকেনস্টাইনের ন্যায় পরিণতির কথা: সযত্নে পালিয়া-পুষিয়া যাহাকে গড়িয়া তোলা হইল, নিঃশেষ হইতে হইল তাহার হাতেই—মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি বটে! উন্নয়নশীল বিশ্বে আমরা সচরাচর ‘ফ্রাংকেনস্টাইন প্রবণতা’ লক্ষ করিয়া থাকি। এই সমস্ত দেশে একশ্রেণির উঠতি নেতা, পাতিনেতার দৌরাত্ম্য লাগামহীন হইয়া উঠে। রাজনৈতিক দলগুলিতে অনুপ্রবেশ করিয়া হেন অপরাধ নাই, যাহা তাহাদের দ্বারা সংঘটিত হয় না। পুলিশ-প্রশাসন হইতে শুরু করিয়া সরকারের স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলিও তাহারা ম্যানেজ করিয়া ফেলে। তাহাদের সঙ্গ দেয় সরকারের একশ্রেণির আমলা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের কেহ কেহ। এইরূপভাবে চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম। ভিন্ন দল, ভিন্ন মতাদর্শের রাজনীতিবিদ বা মানুষের উপর চালানো হয় অন্যায়-অত্যাচারের স্টিম রোলার। সবচাইতে বড় কথা, অবৈধ অর্থের জোরে ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতার চেয়ার পাইয়াও যায় অনেকে। ইহার পর যে কী হইতে পারে, তাহা বুঝিতে হাইতির দিকে তাকাইতে হইবে। গ্যাং গ্রুপ পোর্ট অব প্রিন্সের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একেবারে শীর্ষে বসিবার মিশন লইয়া আগাইতেছে বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে।

মাস্তানি বা গ্যাং কালচার কমবেশি সবখানেই আছে। তবে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে তাহাদের ব্যবহার করিলে স্বভাবতই অতি উচ্চ মাশুল গুনিতে হইবে। জানিয়া-বুঝিয়াই হউক কিংবা অজ্ঞাতে, দমনের পরিবর্তে অপকর্মকারীকে মদত জোগাইলে তাহা সর্বদাই বিভীষিকাময় হইয়া উঠে। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সতর্কতা অবলম্বনের বিকল্প নাই। রাজনৈতিক দলগুলিতে সব ধরনের লোকের আনাগোনা থাকে বটে; কিন্তু মাস্তান, গ্যাং গ্রুপ সেইখানে স্থায়ী আসন পাতিয়া বসিবার সুযোগ পাইলে তাহাতে দেশ ও দশের জন্য দুর্দিন ঘনাইয়া আসিতে পারে একটা সময়ে। চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা হাইতির অর্ধেকেরও বেশি মানুষকে দুর্ভিক্ষের মুখে ফেলিয়া দিয়াছে। মাস্তান বাহিনীকে দমন বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা বা উদাসীনতাই যে ইহার জন্য দায়ী, সেই কথা বলাই বাহুল্য।