২০১০ সালেও বাংলাদেশি জাহাজ অপহরণ করেছিল জলদস্যুরা

২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল এমভি জাহানমনি নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। সেই জাহাজের মালিক ছিল চট্টগ্রামের কবির গ্রুপ। ১৩ বছর পর কাকতালীয়ভাবে একই মালিকের আরেকটি জাহাজ সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়েছে।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টায় ২৩ জন নাবিক ও ক্রুসহ এমভি আবদুল্লাহ নামে কবির গ্রুপের আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজের দখল নিয়েছে সোমালিয়ার দস্যুরা। জাহাজটি মোজাম্বিকের মাপুতু বন্দর থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে যাওয়ার পথে জলদস্যুদের কবলে পড়ে। 

২০১০ সালের ১১ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে এমভি জাহানমনি। সিংগাপুর বন্দরে যাত্রাবিরতি শেষে ২৭ নভেম্বর গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয় জাহাজটি। জাহাজে ২৫ জন নাবিক ও প্রধান প্রকৌশলীর স্ত্রীসহ মোট ২৬ জন ছিলেন। ৫ ডিসেম্বর আরব সাগরে ছিনতাই হয় জাহাজটি। ছিনতাইকারীরা জাহাজটিকে সোমালিয়ার দিকে ঘুরিয়ে দেয়। জাহাজটি ১১ ডিসেম্বর সোমালিয়ার উপকূলের কাছে নোঙর করে।

ঐদিনই নাবিকেরা জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। সে সময় তাদের সঙ্গে কথা বলেন লিওন নামে এক ব্যক্তি। তিনি জলদস্যুদের পক্ষে দরকষাকষি করেন। জলদস্যুরা ৯ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ দাবি করেছিল। দুই মাস ধরে আলোচনার পর ২২ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হয়। এরপর জাহাজের কর্মকর্তারা জলদস্যুদের কাছ থেকে মুক্তির বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা পান। ১২ মার্চ এমভি জাহানমনিতে দুটি বিশাল সুটকেস পাঠানো হয়।

এতে মুক্তিপণের জন্য ৪ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানির খরচ বাবদ ১ লাখ ডলার পাঠানো হয়েছিল। সুটকেসগুলো দেখে জলদস্যুরা আনন্দে চিত্কার করে উঠেছিল। জলদস্যুরা টাকা গুনে ও যাচাই করে নিয়েছিল। এরপর জলদস্যুরা দ্রুত আলোচকদের কাছে সংকেত পাঠায় যে মুক্তিপণ গ্রহণযোগ্য। অবশেষে ১৩ মার্চ ভোরে প্রায় ১০০ দিন জলদস্যুদের আস্তানায় বন্দি থাকার পর জাহাজের নাবিকেরা মুক্তি পান। ২১ মার্চ ওমান হয়ে দেশে ফেরেন তারা।

এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিককে মুক্ত করার ক্ষেত্রে জাহানমনির অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে বলে ধারণা করছে কবির গ্রুপ কর্তৃপক্ষ। কবির গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ব্রেভরয়েল শিপিংয়ের তত্কালীন মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন মেহেরুল করিম ‘জাহানমনি’ জাহাজের নাবিকদের উদ্ধারের জন্য জলদস্যুসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলাপ-আলোচনা চালিয়েছিলেন। ১০০ দিন দর কষাকষির পর তিনি সবাইকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মেহেরুল করিম বর্তমানে এমভি আবদুল্লাহর মালিক প্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনিই জিম্মি জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে প্রথম কথা বলেন। নাবিকদের মুক্ত করার কাজটি এবারও তিনিই দেখছেন।

জানতে চাইলে মেহেরুল করিম ইত্তেফাককে বলেন, জিম্মি মুক্তির ক্ষেত্রে প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলদস্যুদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা এবং মুক্তির বিভিন্ন শর্ত নির্ধারণ করে মুক্তিপণের বিষয়টির সুরাহা করা। তারা (জলদস্যু) এখনো কোনো ধরনের মুক্তিপণ দাবি করেনি। জাহাজটি এখনো সোমালিয়া উপকূল থেকে বেশ কিছুটা দূরে। হয়তো উপকূলের কাছাকাছি যাওয়ার পর তাদের কাছ থেকে কোনো বার্তা আসতেও পারে। জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়েছে, তারা সুস্থ আছেন। আগে সোমালি দস্যুরা যোগাযোগ করুক, তারপর বোঝা যাবে।

তিনি আরও বলেন, আগের বার ১০০ দিনের মধ্যে জলদস্যুদের সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ অনেক বিষয়ে কথা হয়েছে। তারপর ফল এসেছে। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এবারও বিভিন্নভাবে কথা বলতে হবে। আর শেষ পর্যন্ত কীভাবে কাজটা করা হবে, সেটাও আমাদের বের করতে হবে। এখনো মাত্র জিম্মি করেছে। অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলো প্রকাশ পেলে জিম্মি মুক্তিতে সমস্যা হতে পারে। সে কারণে সতর্কতার সঙ্গে আমাদের এগোতে হবে। জাহাজে পর্যাপ্ত খাবার, পানি এবং জ্বালানি আছে। জাহাজটি উপকূলের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জেনেছি। নাবিকরা সবাই সুস্থ আছেন।