তিস্তা: প্রকৃতির বিষণ্নতার একটি রূপ

পৃথিবীতে সকল সভ্যতার সূচনা হয়েছে নদীকে কেন্দ্র করে। বাংলাও গড়ে উঠেছে নদীকে আঁকড়ে ধরেই। তাই তো বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। দেশটির প্রধান অর্থনীতি কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকাংশে নদীকেন্দ্রিক। নদী বিহীন এ দেশের অস্তিত্ব কল্পনা করা দায়। কয়েক শতাব্দী আগে এ দেশে হাজারেরও বেশি নদী থাকলেও এখন আছে ২৩০টির মতো। কোনো রকমে টিকে থাকা অনেক নদীই এখন মৃত্যুর দিকে প্রবহমান। বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর প্রবাহিত অভিন্ন নদী আছে ৫৪টি। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী তিস্তা। মানুষের সভ্যতার স্বার্থে বিলীনপ্রায় তিস্তার কান্না আজ সকলের সামনে দৃশ্যমান।

তিস্তা নদীর উত্পত্তি ভারতের সিকিমে। এই নদীকে ভারতের সিকিম ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ‘জীবনরেখা’ বলা হয়ে থাকে। এই নদীর ওপর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। বর্তমানে বাংলাদেশে নদীটি বিপর্যস্ত। শুষ্ক মওসুমে এখন পানি পাওয়া যাচ্ছে না। নদীর নাব্যতা হারাতে বসেছে। বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ সেচপ্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারেজ’ও হুমকির মধ্যে রয়েছে। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের ১০০ কিলোমিটার উজানে জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় তিস্তা নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে। ফলে বাংলাদেশে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়।

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয় যে, ২৫ শতাংশ পানি নদীর জন্য সংরক্ষণ করা হবে এবং ৩৬ শতাংশ পানি বাংলাদেশ, ৩৯ শতাংশ পানি ভারত পাবে। কিন্তু কীভাবে পানি বণ্টনের ব্যবস্থা করা হবে, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না। ধীরে ধীরে ভারত শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে তিস্তার পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বর্ষাকালে ভারত তিস্তার অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় অতিরিক্ত পানির ধকল সইতে হয় বাংলাদেশকে। তখন তিস্তার দু পাড়ের মানুষকে পড়তে হয় নানা বিপর্যয় ও ভোগান্তির মধ্যে। গজলডোবার বাঁধ ছাড়াও ভারত তিস্তা নদীতে আরো পাঁচ-ছয়টি বাঁধ তৈরি এবং তিস্তা নদীর সঙ্গে যেসব উপনদী সংযুক্ত হয়েছে সেগুলোতে ৪১টি বাঁধ দিয়ে মোট ৫০,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করেছে।

এভাবে দিন দিন তিস্তার শক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে। নদীর ওপর বিদ্যমান মানুষের জীবনের গতিবিধিও আজ ধীরে ধীরে গতিহীন হয়ে যাচ্ছে। মানুষের হস্তক্ষেপে এ নদীর জীববৈচিত্র্যেও পড়ছে মারাত্মক হুমকি। প্রবাহ কমে যাওয়ায় জলজপ্রাণীর চলাচল ও জীবনধারণের এলাকা সংকীর্ণ হয়ে আসছে। প্রভাব পড়েছে এর জলজসম্পদের ওপর নির্ভর করা মানুষদের। তিস্তার কান্না আজ ছড়িয়ে পড়েছে সে মানুষগুলোর মধ্যেও। তাছাড়া বর্ষার মৌসুমে অতিরিক্ত পানিপ্রবাহ ছেড়ে দেওয়ায় সারা বছরের স্বাভাবিক গতি হঠাত্ই পালটে যায় এবং বন্যারূপে চলতে থাকে ধ্বংসলীলা। অতিদ্রুত তিস্তার স্বাভাবিক গতি ফিরে না এলে অদূর ভবিষ্যতে তার গতিবিধি আরো ক্ষীণ হতে থাকবে।

মরুকরণের হাত থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে তিস্তাসহ সকল অভিন্ন নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিস্তাসহ অভিন্ন সকল নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করে, সমতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। ভাটির দেশের সঙ্গে আলোচনা ও সম্মতি ছাড়া নিষিদ্ধ করতে হবে উজানে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। এই নীতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশের জনগণ ‘তিস্তা চুক্তি’ স্বাক্ষর করার দাবি জানিয়ে আসছে। দুটি দেশের মধ্যে যখন কোনো সমঝোতা বা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন দুই দেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত। ‘আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশন’ অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন খুব দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে।

শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা