কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সে দেশের রাজস্বনীতির সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উত্পাদন, সঞ্চয়, বিনিয়োগ প্রভৃতি বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের রাজস্বনীতি হয়ে থাকে। যেমন, কানাডার অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত রাজস্বনীতি দরিদ্র দেশগুলোর জন্য কার্যকর না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কোনো দেশ যখন রাজস্বনীতির কথা চিন্তা করে, তখন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আয়স্তর বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন—এসব বিষয় বিবেচনায় এনে থাকে। দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজন অর্থ এবং এ অর্থের একটি বিরাট অংশই এসে থাকে জনগণের প্রদত্ত ট্যাক্স অর্থাত্ করের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটি হাসপাতাল নির্মাণ, ব্রিজ নির্মাণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন অর্থ এবং সরকারের অর্থের অন্যতম উত্সই হচ্ছে জনগণের প্রদত্ত কর। সুতরাং কোনো দেশের জনগণের কাছ থেকে ট্যাক্স সংগ্রহ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু অতিরিক্ত ট্যাক্স সংগ্রহ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে অন্তরায় হতে পারে। তাই সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করার জন্য এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ করকাঠামো প্রয়োজন।
সাধারণত উত্পাদনমুখী শিল্পের প্রসার, রপ্তানি বৃদ্ধি, দেশজ শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, সম্পদের সুষম বণ্টন প্রভৃতি বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে কোনো দেশের রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে। রাজস্বনীতির দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বিবেচনায় রেখে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক খাতের জন্য অর্থসংগ্রহ করা এবং এ সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ এসে থাকে জনগণের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর আরোপের মাধ্যমে। অন্যটি হলো এসব অর্থের গুরুত্ব বিবেচনায় খাতভিত্তিক সঠিক ও কার্যকর বণ্টন। ভারসাম্যপূর্ণ কর সংগ্রহ এবং খাত ভিত্তিক সঠিক ও কার্যকর অর্থ বণ্টনের বিষয়টি বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।
আমাদের দেশের জিডিপির তুলনায় কর সংগ্রহের পরিমাণ যথেষ্ট নয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল ৪৪ লাখ ৩৯ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। ট্যাক্স রেভিনিউ ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। কর ও জিডিপির অনুপাত প্রায় ৮.৭ শতাংশ। কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভ্যাট ও ইনকাম ট্যাক্সের পরিমাণ বেশি। ২০২০-২০২৪ বাংলাদেশের মোট বাজেট ধার্য করা হয়েছে ৭ লাখ, ৬১ হাজার, ৭৮৫ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ২ লাখ, ৫৭ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণ বৈদেশিক অনুদান আমাদের ঘাটতি বাজেট পূরণের অন্যতম উত্স। আমাদের দেশের ঘাটতি বাজেট হ্রাস করার লক্ষ্যে কর কাঠামোর বিষয়টি বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। কর সংগ্রহজনিত সেবার মান উন্নত হওয়া প্রয়োজন। আয়-সংগ্রহের পরিসীমা বৃদ্ধির পরিকল্পনা প্রয়োজন।
খাত অনুযায়ী সম্পদের বণ্টনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এলে দেখা যায়, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বণ্টন ধরা হয়েছে ১৩.৭ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে ৫ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন ৬.৫ শতাংশ, কৃষিতে ৫.৭ শতাংশ এবং শিল্প খাতে ০.৭ শতাংশ। আমাদের দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে এ খাতগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে মানুষ শহরমুখী। জনগণের শহরমুখিতার কারণে বড় শহরগুলোতে বিশেষত ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামসহ সার্বিক পরিবেশ বসবাসের জন্য কষ্টকর এবং অনেক ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর। শহর অঞ্চলের মানুষদের গ্রামমুখী করার জন্য গ্রামে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। রেমিট্যান্সের প্রভাবে গ্রাম্য এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। গ্রাম অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান বৃদ্ধি করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা দরকার। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর হেলথ কমপ্লেক্স অথবা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর মান আশানুরূপ নয়। রয়েছে জনবল এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। চিকিত্সকের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রয়োজন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দক্ষতা ও একগ্রতা বৃদ্ধির জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সুশাসন জরুরি। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাট, ব্রিজ নির্মাণ করার গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষির ফলন বৃদ্ধির জন্য কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বীজ ও ফসল বণ্টনের ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রয়োজন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকার সংখ্যা হ্রাস করার জন্য শিল্পায়ন প্রয়োজন। দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়নে গ্রামকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
উপরিউক্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় গ্রামকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এবং গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, শিল্প প্রভৃতি খাতকে অত্যন্ত গুরুত্বের বিবেচনায় এনে এ খাতগুলোতে বাজেট বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সঠিক ও কার্যকর করকাঠামোর মাধ্যমে সরকারের প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের উন্নয়ন এবং গ্রামকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারসাম্যপূর্ণ রাজস্বনীতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
লেখক: অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট