সমস্যার মধ্যে বসবাস!

সমস্যা ছাড়া কোনো মানুষ নেই। সবাই নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে বসবাস করে। সবাই সমস্যার মধ্যে থাকলেও, সমস্যা কাকে বলে এটা সবাই সহজ ভাষায় বর্ণনা করতে পারে না। সাধারণত যা সমাজের মানুষের জন্য কষ্টদায়ক, তা-ই সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। অভিধানে সমস্যার মানে বলা আছে :জটিল ও কঠিন প্রশ্ন বা বিষয়; সংকট; কর্তব্য নিরূপণের পক্ষে কঠিন অবস্থা। অভিধান এটাও বলে যে, সমস্যা একধরনের উপলব্ধি; অসুবিধা; কোনো বস্তুর অবস্থানগত কারণে অস্বাচ্ছন্দ্য; কারও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যকার অসামঞ্জস্য। সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, যা মানুষের জীবন চলার পথকে বাধাগ্রস্ত করে, তাকে সমস্যা বলে।

আমাদের জীবনটা আসলে ছোট-বড় অসংখ্য সমস্যার সমষ্টি। সুশাসনের সমস্যা, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সমস্যা, জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা, দূষণ সমস্যা, অধিক জনসংখ্যার সমস্যা, বেকার সমস্যা, নারীর ক্ষমতায়নের সমস্যা, দেশে আর্থিক প্রবৃদ্ধির সমস্যা, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের সমস্যা—এমন অনেক বড় বড় সমস্যায় দেশ নিপতিত। আবার ছোট ছোট সমস্যাও একেবারে কম নেই। এবারের রোজায় খেজুর খাবেন না, বরই খাবেন—এটাও অনেকের কাছে সমস্যা। সিয়াম সাধনার মাসকে ‘রমজান’ বলবেন, না ‘রামাদান’ বলবেন—এটাও অনেকের কাছে সমস্যা! দ্রব্যমূল্য, রেমিট্যান্স, চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস-অপহরণ সমস্যা, আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে সদ্ভাব প্রতিষ্ঠায় সমস্যা, ডলারের সংকট, আন্তর্জাতিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ—এমনি নানা সমস্যায় দেশ ও জাতি বর্তমানে হাবুডুবু খাচ্ছে। এসব সমস্যা এখন মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু কোনো সমস্যারই সমাধান মিলছে না। অবশ্য তাতেও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সবাই দিব্যি খাচ্ছে-দাচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। সমস্যা জিনিসটা বুঝি এমনই!

এক আধুনিক কবি লিখেছেন, ‘সেই যে লোকটা বলেছিল,/ তার কোন সমস্যা নেই।/ আসলে সেই লোকটা নিজেই একটা সমস্যা।’ কবির কথাই হয়তো ঠিক। সমস্যা ছাড়া মানুষ হয় না, হতে পারে না। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার কথাই ধরা যাক। বিচিত্র ও অন্তহীন সমস্যায় আমাদের জীবন জর্জরিত। অনেকের জীবনে আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা নেই। চাকরি নেই। চাকরি আছে তো বেতন নেই। চাকরি, বেতন সব আছে তো প্রমোশন নেই। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। অথচ এর সঙ্গে সংগতি রেখে বেতন বা আয় বাড়ছে না। দোকান কিংবা বাজারে ঢুকতে আমরা ভয় পাই। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়াতে বলেন, অন্যথায় বাড়ি ছাড়তে বলেন। ছেলেমেয়েকে কাঙ্ক্ষিত স্কুলে ভর্তি করা যায় না। ছেলের চাকরির দরখাস্তের উত্তর আসে না। মেয়ের বিয়ে হয় না। বিদ্যুত্ থাকে না। রাস্তায় বেরিয়ে বাসে ওঠা যায় না। নির্দিষ্ট গন্তব্যে নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো যায় না। জটিল জটিল কঠিন কঠিন রোগ হয়, সুচিকিত্সা হয় না। ডাক্তার-ক্লিনিক-ওষুধের দোকান পর্যন্ত ঘুরতে ঘুরতে ফতুর হতে হয়; কিন্তু রোগ সারে না। অভাব, না পাওয়া, দুশ্চিন্তা, জঙ্গি-সন্ত্রাসী-ছিনতাইকারীর আতঙ্ক, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে আমাদের সমস্যার কোনো শেষ নেই। সমস্যা ছাড়া কোনো মানুষই নেই। মানুষের জীবনকে অনন্ত সমস্যার সমাহার বললেও ভুল হবে না। সবার জীবনেই কম-বেশি সমস্যা আছে। ছোট সমস্যা, বড় সমস্যা, মাঝারি সমস্যা, হরেক রকম সমস্যা। জ্ঞানী-গুণীরা মনে করেন, সমস্যা আছে বলেই জীবন আছে, বেঁচে থাকার তাগিদ আছে। মানুষের জীবনে যদি কোনো সমস্যা না থাকত, সবকিছু ঠিকঠাকমতো হতো বা চলত, তাহলে জীবনের মজাটাই শেষ হয়ে যেত। সে ক্ষেত্রে কোনো রকম জঙ্গি দলের সদস্য না হয়েও মানুষ হয়তো দলে দলে ‘আত্মঘাতী’ হতো। জনসংখ্যা কমানোর জন্য রাষ্ট্রকে গলদঘর্ম হতে হতো না। হত্যা-খুন নয়, আত্মহত্যা ঠেকানোটাই রাষ্ট্রের কাছে মুখ্য বিষয়ে পরিণত হতো।

আমাদের জীবনে যা কিছু কাঙ্ক্ষিত, আনন্দময়, কল্যাণকর, তা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপনের মধ্যে তেমন কোনো শান্তি-স্বস্তি-সুখ নেই। আছে শুধু বিরক্তিকর একঘেয়েমি। আর আছে অফুরন্ত, অজস্র বিচিত্র সব সমস্যা। নিঃশ্বাসে সমস্যা, বিশ্বাসে সমস্যা। চলতে ফিরতে উঠতে বসতে দিনে রাতে সব সময় বিভিন্ন সমস্যা আমাদের তাড়া করে ফেরে। আমাদের জীবনে সমস্যার কোনো শেষ নেই। একের পর এক সমস্যা এসে ভিড় করে। এক সমস্যায় হাবুডুবু খেতে খেতেই আরেকটি সমস্যা এসে দেখা দেয়। এরপর আরেকটা, তারপর আরেকটা—এভাবে চলতেই থাকে। কিন্তু সমস্যার সমাধান খুব একটা হয় না। মাঝে মাঝে বড় বড় সমস্যা এসে ছোট সমস্যাগুলোকে গুরুত্বহীন করে তোলে এই যা। এর বাইরে আমাদের জীবনে অন্য কোনো উপাচার  নেই।

আমাদের জীবনে কোনো সমস্যারই টেকসই সমাধান হয় না, অথচ নিত্য নতুন সমস্যা এসে জেঁকে বসে। এই অবস্থা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে চলছে। এই পরিস্থিতি বর্তমানে আমাদের অনেকটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে। সমস্যার নালা থেকে নদী, নদী থেকে সাগর, সাগর থেকে মহাসাগর—এভাবেই চলছে আমাদের জীবননৌকা। সমস্যার চাপে পিষ্ট হতে হতে আমাদের জেরবার অবস্থা। অথচ এর থেকে আমরা পরিত্রাণ পাচ্ছি না।

কখনো অনাবৃষ্টি, কখনো অতিবৃষ্টি। কখনো যানজট, কখনো জলজট। কখনো বার্ড ফ্লু, কখনো সোয়াইন ফ্লু। কখনো সন্ত্রাস নৈরাজ্য দুঃশাসন। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, হত্যা-খুন, গণপিটুনি, ‘ক্রসফায়ার’। সড়ক দুর্ঘটনা। লুটপাট-দুর্নীতি। মৌলবাদী তত্পরতা, জঙ্গি উত্থান। কখনো দলাদলি কোন্দল। আর লোডশেডিং তো বারোমাসি সমস্যা। এমনি হাজারো সমস্যা চলছে তো চলছেই। একটা সমস্যারও সমাধান হয় না, হচ্ছে না। অথচ নিত্যনতুন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এসব সমস্যা নিয়ে হইচই মাতামাতির শেষ নেই। অনেক সময় জোড়াতালি দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়, তাতে অবশ্য সমস্যা আরো বাড়ে।

আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, এমপি, আমলা, জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবীদের রয়েছে অসাধারণ সহ্যক্ষমতা। তারা কখনো কোনো সমস্যাতেই বিচলিত হন না। বরং তারা যেকোনো সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা উপস্থাপনের ক্ষমতা রাখেন। যে কোনো সমস্যার কারণ, উত্স, ফলাফল, প্রতিকারের উপায় ইত্যাদি যাবতীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে পারেন। শুধু পারেন না কোনো সমস্যার সত্যিকার সমাধান করতে। সম্ভবত তারা তা ইচ্ছে করেই করেন না। যদি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, সব প্রত্যাশা যদি প্রাপ্তির খাতায় জমা হয়, তাহলে তো তারা বেকার হয়ে যাবেন! সম্ভবত সে কারণেই তারা কোনো সমস্যার কার্যকর সমাধানের পথে বড় বেশি পা মাড়ান না।

অবশ্য সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাক এটা আমরাও চাই না। জীবনে যদি কোনো সমস্যাই না থাকে, চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে সব ব্যবধান যদি ঘুচে যায়, আমরা যদি মাথা ঘামাবার মতো, ভাববার মতো উপাদান খুঁজে না পাই, তাহলে কি আমাদের পক্ষে বেঁচে থাকা আদৌ সম্ভব? না, তা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বলেই আমরা নিত্য নতুন সমস্যা সৃষ্টি করি, সমস্যা অনুসন্ধান ও চর্চা করি। সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে যতটা পছন্দ করি, সমস্যা সমধানের জন্য তার তিল পরিমাণ চেষ্টাও করি না। আসলে আমরা সমস্যা ছাড়া বাঁচতে পারি না।

আমাদের সমাজের হর্তা-কর্তা-বিধাতাদের ধন্যবাদ যে, তারা আমাদের কোনো সমস্যার সমাধান না দিয়ে উলটো সমস্যাগুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত খেলছেন। সমস্যা জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রাণপণ ভূমিকা পালনের পাশপাশি নিত্যনতুন সমস্যার উদ্ভাবন ও উত্পাদন করে চলেছেন। এমন মহান ব্যক্তিদের সমালোচনা বা নিন্দা করা মোটেও উচিত নয়। যারা দেশনায়কদের সমালোচনা করেন, তাদের বিরুদ্ধাচরণ করেন, তারা অবশ্যই অতিশয় নীচ এবং ঘৃণ্য। তাদের নিন্দা করা উচিত। যেসব জনগণনন্দিত ব্যক্তি একের পর এক সমস্যা উপহার দিয়ে আমাদের পানসে জীবনকে ব্যস্ত ও বৈচিত্র্যময় করে তুলছেন, আসুন আমরা তাদের সম্মানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট হাততালি দিই।

জীবন সমস্যাসংকুল কোনো সন্দেহ নেই। অনেকে মনে করেন, এটাই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সৌন্দর্য। এখন সমস্যা কীভাবে ম্যানেজ করতে হবে, তা জানার বদলে কেবল সমস্যা বাড়িয়ে কী লাভ? আমরা সমস্যার সমাধানে কম আগ্রহী বলে একটা সমস্যার সমাধান না করেই অন্য সমস্যা নিয়ে মাতামাতি করি।

পুনশ্চ :রোগী এসেছে ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বললেন, আপনার সমস্যাটা কী? রোগী বলল, সমস্যার তো কোনো কূল-কিনারা নাই। শরীরে বাত; সকাল-সন্ধ্যা জ্বর, কাশি আছে, হাঁপানি আছে। পেটের ট্রাবল দীর্ঘদিন ধরে। ইদানীং আমাশা হয়েছে। যুবক বয়সে যক্ষ্মা হয়েছিল। ছোটবেলায় হয়েছিল হুপিং কফ। এখন চোখেও কম দেখি। আর এই দেখুন, গায়ে কী যেন চাকা চাকা বের হয়েছে।

ডাক্তার সাহেব বললেন, এক কাজ করুন, ঝড়-বৃষ্টির সময় সাত ফুট লম্বা একটা লোহার ডান্ডা নিয়ে মাঠে হাঁটাহাঁটি করুন।

:কেন?

:আপনার তো সবই হয়েছে, শুধু বজ্রপাতটা বাকি। এটাই বা বাদ থাকবে কেন? বজ্রপাতও হয়ে যাক!

আমাদেরও কি একটা বজ্রপাত দরকার?

লেখক :রম্য রচয়িতা