পৃথিবীর চুম্বকক্ষেত্র, বায়ুমণ্ডল, সমুদ্র, অন্তরিক্ষ, ওজন আচ্ছাদন, জ্ঞানভান্ডার ইত্যাদি সর্বজনীন সম্পদ। জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসারের সঙ্গে এই সম্পদগুলির বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ছে এবং অধিকাংশ ব্যবহারই ব্যক্তিক অর্থাত্ ব্যক্তিবিশেষ বা ক্ষুদ্র ব্যক্তিসমষ্টির সংস্থা ব্যবহার করছে।
তারবিহীন ফোন কোম্পানি ব্যক্তিক। দেশে দেশে হাজারো ব্যক্তিক কোম্পানি পৃথিবীর চুম্বকক্ষেত্র (ম্যাগনেটিক ফিল্ড) ব্যবহার করছে। ঐ ম্যাগনেটিক ফিল্ড সর্বজনীন সম্পদ বলে তাতে সব মানবের সমান হিস্যা আছে। সর্বজনীন ঐ ম্যাগনেটিক ফিল্ড ব্যবহার করে মূল্য গ্রহণপূর্বক যে সেবা প্রদান করা হচ্ছে, সেই গৃহীত মূল্যে ব্যক্তি-মানুষের পাওনা কত এবং তা পরিশোধিত হচ্ছে কি না, তা বিচার্য। ট্যাক্স প্রদানের প্রচলিত অবকাঠামো যথাযথ কি না, সংগৃহীত ট্যাক্স জনগণের উপকারে আনুপাতিক হারে পৌঁছাচ্ছে কি না, কিংবা ফোন ব্যবহার করে ব্যবহারকারী যে মূল্য প্রদান করছে, তা পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন কি না, জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার্থে বিষয়গুলি বিশ্লেষণের দাবি রাখে এবং জনসাধারণের জ্ঞাতার্থে সেই বিশ্লেষণের ফলাফল সেবা গ্রহণকারী ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মালিকের স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
বিশ্বময় ম্যাগনেটিক ফিল্ড-নির্ভর যা কিছু চলছে, যেমন—ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব বা সামগ্রিক ইন্টারনেট; প্রায় সর্বক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানাধীন সব প্রতিষ্ঠানই অবিশ্বাস্য পরিমাণ সম্পদ কুক্ষিগত করছে। নিঃসন্দেহে ঐ সম্পদের অতি বৃহদাংশ সব সাধারণ মানুষের ম্যাগনেটিক ফিল্ড ব্যবহারজনিত অংশ আত্মসাত্ করা প্রাপ্যতার সম্পদ এবং ঐ অর্থ যথাসম্ভব শিগিগর ফেরত প্রদান না করা অন্যায্য। ঐসব কুক্ষিগত সম্পদের ৭০-৮০ শতাংশ কনফিস্কেট করে একটি ‘সর্বজনীন তহবিল হিসাব’ গঠন করে সেই হিসাবে জমা করার বিষয়ে বিশ্ববিবেক সোচ্চার হবে বলে আমরা আশা করি। জাতিসংঘ এখানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এখানে এই প্রণিধানও জরুরি যে, এরূপ যথেচ্ছ ব্যবহার পৃথিবীর চুম্বকক্ষেত্রের কী সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করতে পারে এবং মানবগোষ্ঠী ভবিষ্যতে কী ঝুঁকির সম্মুখীন হবে, তাও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিকভাবে বিমান চলাচলেও সর্বজনীন বায়ুমণ্ডল ব্যবহার করে ব্যবসার মাধ্যমে আয় করা হয়। বায়ুমণ্ডল ব্যবহার করে লব্ধ আয়ে সব মানুষের প্রাপ্যতা রয়েছে, সে যে দেশেরই বাসিন্দা হন না কেন। কারণ বিশ্বের সব মানুষই একই বায়ুমণ্ডল দ্বারা যুক্ত, প্রত্যেকে বায়ুমণ্ডলের অংশীদার ও ক্ষতির সম্মুখীন। অধিকাংশ এয়ার প্লেন পরিচালনা ব্যক্তিমালিকানাধীন। বায়ুমণ্ডল ব্যবহারের জন্য এয়ারলাইনকে দেশীয় শুল্ক, কর ইত্যাদির বাইরে নির্দিষ্ট হারে সর্বজনীন বায়ুমণ্ডল ব্যবহার করার জন্য সারচার্জ প্রদান করা যুক্তিসংগত। মানবগোষ্ঠীর যৌথ সম্পদ ব্যবহারের জন্য এয়ারলাইনগুলি সর্বজনীন তহবিল প্রদান করতে ন্যায্যত বাধ্য। দেশে দেশে বিমান ব্যবহারের সংখ্যার তারতম্য বায়ুমণ্ডল ব্যবহারের পার্থক্য ঘটাচ্ছে। এই তারতম্য এক দেশের মানুষের সঙ্গে অন্য দেশের মানুষের ভোগ ও দুর্ভোগে বৈষম্যের সৃষ্টি করছে। এখানে সমতা আনায়নের প্রশ্ন ঊহ্য থাকতে পারে না।
দেশে দেশে পৃথক পৃথক অধিভার হার প্রয়োগের মাধ্যমে তুলনামূলক সমতা লাভ করা যেতে পারে। জিএইচএস-দূষণ, শব্দদূষণ, ক্ষুদ্র পাখির মৃত্যু ও তাপ বৃদ্ধি ইত্যাদি বিভিন্নভাবে বায়ুমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজ চলাচল বা সমুদ্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বজনের ক্ষতিপূরণ আরো অধিক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাহাজ চলাচলের পরিধি অনেক বিস্তৃত, যদিও জাহাজ চলাচল তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। জাহাজডুবি, তেল ও প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্যদূষণ, জাহাজের আঘাতে তিমি, সিকাউ ও অন্যান্য জন্তুর প্রাণহানি ইত্যাদি সর্বজনীন সম্পদের ব্যক্তিক ব্যবহারজনিত ক্ষতি সাধিত হয়ে চলেছে। সমুদ্র-সম্পর্কিত শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারিত হারে ‘সর্বজনীন তহবিল হিসেবে’ অধিভার প্রদান করতে হবে।
স্যাটেলাইটের ব্যবহার ব্যাবসায়িক এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিক; অন্তরিক্ষ সর্বজনীন। বিশ্বে সব মানুষই ঐ ব্যাবসায়িক মুনাফার অংশীদার। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশের ঐ ব্যাবসায়িক মুনাফায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের অংশ আছে। স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ ওজন স্তরের (Ozone layer) জন্য নতুন হুমকি এবং বিশ্বের প্রত্যেক মানুষই এই হুমকির সম্মুখীন। ক্ষতি হোক বা না-ই হোক, অন্তরিক্ষ ব্যবহার করার জন্য বিশ্ববাসীকে অন্তরিক্ষ ব্যবহারকারী ভাড়া প্রদান করবে—এটাই ন্যায্য। অতএব বর্তমানে প্রচলিত শুল্ক, কর ইত্যাদির অতিরিক্ত সর্বজনীন অধিভার প্রযোজ্য। স্যাটেলাইট ব্যবহারকারীরা নির্ধারিত হারে সর্বজনীন তহবিল হিসেবে অধিভার প্রদান করবে।
বর্তমান কালের উন্নত বিশ্বের অতীতে মাত্রাতিরিক্ত কয়লা ও ফসিল ফিওয়েলের অসংখ্য গাড়ির ব্যবহার, শিল্পের উদিগরণ ইত্যাদি সর্বজনীন সম্পদ বায়ুমণ্ডল, ওজন লেয়ার ও সমুদ্রের অমেরামতযোগ্য ক্ষতি সাধান করেছে এবং করে চলেছে। এতে মানবগোষ্ঠী যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবিদার। কার্বন প্রিন্টের ক্ষতিপূরণের একটি বৃহদংশ সর্বজনীন তহবিল হিসেবে জমা করার দাবি সোচ্চার হওয়া সমীচীন।
অন্যান্য কারণের মধ্যে সমরাস্ত্র নির্মাণ যুদ্ধের জন্য সর্বাধিক দায়ী। যুদ্ধ সর্বজনীন শান্তি ও সমৃদ্ধি বিনষ্ট করে। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের বৃহদংশ সমরাস্ত্র উত্পাদনকারীরা বহন করবে। সমরাস্ত্র উত্পাদনকারী দেশে কতিপয় ব্যক্তিমালিকানাধীন সমরাস্ত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত উচ্চ মুনাফার লোভে সামরিক খাতে অধিক বাজেট বরাদ্দের জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখে। উত্পাদিত পণ্য বিক্রয়ের জন্যই যুদ্ধের প্রয়োজন। যেহেতু সমরাস্ত্র উত্পাদন একটি ঘৃণ্য গর্হিত কাজ এবং বিশ্বশান্তি বিনষ্ট করাসহ হাজারো ক্ষতির কারণ সেহেতু সমরাস্ত্র নির্মাণকারীরা সমরাস্ত্র বিক্রয়মূল্যের তিন থেকে পাঁচ গুণ ‘জনসাধারণ ক্ষতিপূরণ শুল্ক’ দিতে বাধ্য থাকবে। উত্পাদনকারী X-Work-এ ধার্যকৃত শুল্ক সর্বজনীন তহবিল হিসেবে জমা প্রদান বাধ্যতামূলক করা যুক্তিসংগত। এটা পৃথিবীকে যুদ্ধ বন্ধের দিকে এক ধাপ অগ্রসরমাণ করবে।
মানুষের জ্ঞানভান্ডার দিনে দিনে তিলে তিলে হাজার হাজার বছরে গড়ে উঠেছে, বিভিন্ন মানবপ্রজাতির ও প্রজন্মের বিন্দু বিন্দু অবদানসংবলিত, এটা সর্বজনীন। একজন নোবেলবিজয়ীর অর্জন ব্যক্তিক হিসেবেই পরিগণিত হয়ে থাকে। ১৯২২ সালে আইনস্টাইন সূর্যশক্তির ওপর নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কিন্তু সূর্যশক্তির প্রথম বাস্তব ধারণা প্রদান করেন এডমন্ড বিকুইরেল ১৮৩৯ সালে। এরও বহু আগে থেকেই এই বিষয়ে চিন্তাভাবনা ছিল। আইনস্টাইনের অর্জনের পেছনে যদি জ্ঞান অর্জন মুখ্য হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে জ্ঞান বিস্তারের মাধ্যম ভাষা, বই আকারে সঞ্চিত জ্ঞানভান্ডার। অতএব ছাপাখানা, পাঠশালা, সহপাঠী, বিভিন্ন সময়ের শিক্ষকদের আলোচনা, দিকনির্দেশনা বা আলোকপাত, আলো ও শক্তির আদি মূল ধারণা, অঙ্ক শাস্ত্রের অবদান কোনো কিছুরই কম গুরুত্বের নয়। হাজার মানুষ কোনো পথপরিক্রমায় রয়েছে, এক জনের নজরে একখণ্ড হীরা পড়লে ওটি তার সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। কারণ হাজার জন শামিল হয়েছে বলেই পথপরিক্রমা সম্ভব হয়েছে, পথ প্রস্তুত হয়েছে এবং চলার সঙ্গে পথ অগ্রসরমাণ। অগ্রসরমাণ পথ এবং হাজার মানুষের মিছিল হীরা পর্যন্ত পৌঁছেছে বলেই হীরা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। নোবেল পুরস্কার ব্যক্তিক বিবেচিত হওয়া অসমীচীন। মানবগোষ্ঠীর জ্ঞানভান্ডার থেকে বিন্দুবত্ জ্ঞান পৃথক করে তা ব্যক্তিক বানিয়ে ফেলা অগ্রহণযোগ্য বলে অনেকে মনে করেন।
বর্তমানে বিশ্বে বুদ্ধিমত্তাসম্পদ ৫৭.৯০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বুদ্ধিমত্তাসম্পদ ব্যক্তিক হিসেবে বিবেচিত। উপরন্তু বর্তমান প্রচলিত বুদ্ধিমত্তার মূল্যায়নপদ্ধতি ভ্রান্ত। প্রতিযোগিতাবিহীন উত্তরণ একটি প্যাটেনটের অতি উচ্চমূল্য প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করে। পাহাড়সমান সম্পদ এরই ফল। কুক্ষিগত সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এই যে, তা আমেরিকার স্থায়ী নিট সম্পদের অর্ধেক, ভারতের ও ব্রিটেনের নিট সম্পদের প্রায় চার গুণ। অতি অধিক কেন্দ্রীভূত সম্পদ বিশ্বশান্তি বিনষ্টের একটি কারণ এবং বুদ্ধিমত্তাসম্পদের একটি একক দুষ্টগ্রহ। অন্তত ৭৫ শতাংশ সম্পদ অর্থাত্ ৪৩.৪২৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার উদ্ধার করে সর্বজনীন তহবিল হিসেবে জমা করা সমীচীন।
যে কোনো সর্বজনীন সম্পদ ব্যবহার করতে হলে রাষ্ট্রীয় শুল্ক, কর, লেভি ইত্যাদির বাইরে একটি যৌক্তিক নির্ধারিত হারে ‘সর্বজনীন প্রাপ্য পরিশোধ’ সারচার্জ হিসেবে ‘সর্বজনীন তহবিল হিসেবে’ জমা প্রদান করা যুক্তিযুক্ত। সর্বজনীন সম্পদ ব্যবহার করে ব্যবসা করলে অবশ্যই প্রত্যেক মানুষের ন্যায্য পাওনা প্রদান করতে হবে।
উপরন্তু যে কোনো সম্পদের ব্যবহার কোনো না কোনোভাবে ঐ সম্পদের ক্ষয় ও ক্ষতি সাধন করে। ক্ষতি হয় সবার। কিন্তু ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। ‘সর্বজনীন তহবিল হিসেবে’ জমাকৃত তহবিল থেকে ঐ ক্ষতিপূরণ মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।
‘সর্বজনীন তহবিল হিসেবে’ সংগৃহীত অর্থের রক্ষণ ও সর্বজনীন ইকিউটেবল (equitable) বিভাজনের মাধ্যমে বিশ্বের সব মানুষের হিস্যা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য মানবগোষ্ঠীর সামগ্রিক মঙ্গল সাধিত হয়, ঐরূপ খাতে বিনিয়োগ বাঞ্ছনীয়। বিশ্বে সম্পদের অসম বণ্টন বা কুক্ষিগত সম্পদ কোনো না কোনোভাবে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে সৃষ্ট। ঐ প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাত্ করা সম্পদের সব সাধারণ মানুষের ন্যায্য অংশ কনফিস্কেট করে ‘সর্বজনীন তহবিল হিসেবে’ জমা করলে এখনই ৫০.০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সঞ্চিত হতে পারে, অর্থাৎ বিশ্বের নিম্ন আয়ের বঞ্চিত ৫০ শতাংশ মানুষের মাথাপিছু ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার, যা পৃথিবীর ঐ ৫০ শতাংশ মানুষকে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষাসংবলিত স্বাচ্ছন্দ্য জীবন দিতে পারে এবং স্থায়ী বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করতে পারে।
লেখক :চেয়ারম্যান, আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ
লিমিটেড। সভাপতি, অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সপোর্ট
ওরিয়েন্টেড শিপ বিল্ডিং ইন্ড্রাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশ