বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব

আমরা এরই মধ্যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্যে প্রবেশ করেছি। ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ টাস্ক ফোর্সকে একটি দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন কর্মশক্তি গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় যে, চলমান ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক বছর আগের আনুমানিক ছয় শতাংশ থেকে কমে ৫.৬ শতাংশ হয়ে যেতে পারে। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক সিচুয়েশন অ্যান্ড প্রসপেক্টস (ডব্লিউইএসপি) ২০২৪’ শীর্ষক জাতিসংঘের ফ্ল্যাগশিপ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে ২০২৫ অর্থবছরের জন্য ৫.৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক তাদের গত বছরের দৃষ্টিভঙ্গিতে (আউটলুক) ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জন্য একই প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যদ্বাণী করে। এতে মুদ্রাস্ফীতি সমাধানের জন্য আর্থিক ও রাজস্ব নীতির সংস্কারের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। এভাবেই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদেশি বিনিয়োগ মানে শুধু অর্থের প্রবাহই নয়; বরং প্রযুক্তি, জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতারও প্রবাহ। বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। নানা গবেষণায় উঠে এসেছে এবং এটি প্রমাণিত, উন্নয়নশীল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বেশ লাভজনক প্রভাব ফেলে।       

গত পাঁচ দশক ধরে অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে শক্তিশালী উদ্যোগ গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের দেওয়া সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তারা এদেশে বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এবং বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে। এইচএসবিসির ‘জার্নি টু সাকসেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জেনারেল ইলেকট্রনিকস (জিই), শেভরন, এক্সেলারেট এনার্জি, মেটলাইফ, পেপসিকো ও কোকা কোলার মতো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দেশের বিদ্যুত্ খাতের সঙ্গে জিই খুব গভীরভাবে জড়িত। এই প্রতিষ্ঠানটি দেশে তিন গিগা ওয়াট শক্তি সরবরাহ করে এবং ২ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কোকা কোলা ২২ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ব্র্যাকের সঙ্গে মিলিতভাবে মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত অতি দরিদ্র পরিবারকে সাহায্য করতে ১.৪ মিলিয়ন মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেছে পেপসিকো ফাউন্ডেশন। কেয়ার বাংলাদেশ-এর মতো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয়, পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন সুবিধা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। ২০২১ অর্থবছরে কেয়ার ৭.৫৫ মিলিয়ন মানুষকে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা প্রদান করেছে, যার ৫৬ শতাংশই নারী।

তৈরি পোশাকশিল্প এ দেশের গর্ব। বিশ্ববাজারে টেক্সটাইল রপ্তানির ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। ২০২৩ অর্থবছরে দেশের জিডিপিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ছিল ১০.৩৫ শতাংশ, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাকি পৃথিবীর ওপর নির্ভরশীল, তা বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে হোক অথবা আমাদের রপ্তানিকৃত পণ্যের জন্য বিদেশি বাজারে চাহিদা তৈরি করার মাধ্যমেই হোক। কিন্তু চলমান বৈশ্বিক বিরোধের কারণে তা একটি সমস্যায় পরিণত হয়। এই সংকটের কারণে কাকে, কীভাবে সমর্থন করা হবে, তা নিয়ে পুরো পৃথিবী বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশেও এটি একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। একদিকে কেউ কেউ নৈতিকতার প্রশ্নে বিভিন্ন দেশসহ মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বয়কটের ডাক দিচ্ছেন, অন্যদিকে বর্তমান কর্মশক্তির একটি বড় অংশ বিভিন্ন খাতে এসব বিদেশি কোম্পানিতে কর্মরত। ধরে নিই, আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এসব বিদেশি কোম্পানিতে কাজ করব না, তাদের বয়কট করব। তাহলে কেন আমরা শুধু আমাদের দেশে অবস্থিত কোম্পানিগুলোকেই বয়কট করব? যেসব কোম্পানিতে আমাদের পণ্য রপ্তানি হয়, তাদের কেন বয়কট করব না? এর কারণ কি এটাই যে, আমরা রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং আমাদের সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সঙ্গে আপস করতে চাই না? সেটাই যদি হয়, তাহলে কেমন হবে, যদি কোনো একদিন আমরা হঠাত্ করে শুনতে পাই, যেসব দেশে আমরা তৈরি পোশাক রপ্তানি করি, সেসব দেশ উলটো আমাদেরই বয়কট করে বসেছে? এমন আঘাত এলে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কী অবস্থা হবে? আমাদের এসব প্রশ্ন নিয়েও ভাবতে হবে, সেই সঙ্গে এগুলোর উত্তর নিয়ে।

বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে আমরা সোনার বাংলায় পরিণত করব। ভবিষ্যতের বাংলায় মায়েদের মুখে হাসি ফুটবে, শিশুরা খেলা করবে। এই সমাজ হবে শোষণমুক্ত সমাজ। খেতে, খামারে, কারখানায় উন্নয়নের আন্দোলন গড়ে তুলুন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা অবশ্যই এই দেশকে আবার গড়ে তুলতে পারি। আসুন, আমরা একসঙ্গে কাজ করি, যেন সোনার বাংলা আবার সোনালি হয়ে ওঠে।’

২০২৪ সালে এসে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় বসবাস করছি। গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জোরালো প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বদলে গেছে, এ দেশটিকে এখন এশিয়ার রাইজিং টাইগার হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। পিতার লক্ষ্য পূরণে প্রধানমন্ত্রীর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং শিগিগর আমরা স্বল্পোন্নত দেশের স্তর থেকে উন্নীত হব। বয়কট ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আমরা নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছি। তবে এর নেতিবাচক আর্থসামাজিক পরিণতি সম্পর্কেও আমাদের সচেতন হতে হবে।

লেখক :লেখক ও গবেষক