উহারা টার্ডিগ্রেডের মতো টিকিয়া আছে

বিজ্ঞানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্য সৃষ্টি হইয়া পুনরায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে কয়েক বার। ছোট-বড় কোনো প্রাণীই, এমনকি ব্যাকটেরিয়াও বাঁচিয়া থাকিতে পারে নাই। একমাত্র টার্ডিগ্রেড নামের আট পা-বিশিষ্ট ছোট্ট প্রাণী টিকিয়া গিয়াছে। শুধু টিকিয়াই থাকে নাই, উহারা একমাত্র প্রাণ, যাহা জলে, স্থলে এমনকি আউটার স্পেসেও বিরাজমান আছে ঠান্ডা, গরম এবং প্রায় অক্সিজেনশূন্যতাকে তোয়াক্কা না করিয়া। আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনেও আমরা টার্ডিগ্রেডের ন্যায় একটি গোষ্ঠী বা শ্রেণি দেখিতে পাই, যাহাদের কোনো কিছুর প্রতিই তোয়াক্কা নাই। ইহারা বিভিন্ন রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন হইতেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার করিয়া টিকিয়া আছে। ইহাদের বিলুপ্ত তো দূরের কথা, সংখ্যা দিনে দিনে সম্প্রসারিত হইতেছে। পত্রপত্রিকা শুরু হইবার পর হইতেই ইহাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার রহিয়াছে। কম লেখালেখি হয় নাই, কম সম্পাদকীয় রচিত হয় নাই।  কিন্তু ঠান্ডা-গরম-অক্সিজেনশূন্যতার মতো ইহাদেরও কোনো বিকার নাই, কোনো পরিবর্তন নাই। দুর্নীতি-অনিয়ম পূর্বেও যেমন ছিল, এখনো তেমনি আছে। বরং বর্তমানে ইহার মাত্রাই কেবল বৃদ্ধি পায় নাই,  বিভিন্ন দেশে নতুন করিয়া ফরমালিন-কারবাইড ব্যবহার শুরু হইয়াছে। ফরমালিন-কারবাইডের মতোই যোগ হইয়াছে রাতের কারবার দিনে আর দিনের কারবার রাতে। দিনের ভোট রাতে হইবার নজিরও এই সকল দেশে দেখিতে পাওয়া যায়। আমরা অনতিদূর ইতিহাস হইতে দেখিয়া আসিতেছি, একেকটি দেশে সংবিধান রহিত করিয়া ছড়ি হাতে লইয়া সামরিক শাসন আসিয়াছে। তাহারা দুর্নীতিমুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়া শাসনভার হাতে তুলিয়া লইয়াছেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তাহারা নিজেরাই দুর্নীতিতে গা ভাসাইয়া দিয়াছেন। আবার বেসামরিক সরকারের সময় দেখিয়াছি, নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়া, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের কথা বলিয়া তাহারাই সর্বাগ্রে প্রশাসনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করিয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিয়াছে। আর এই কাজে সহযোগিতা করিতে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে ঐ টার্ডিগ্রেড সম্প্রদায়, যাহারা রাষ্ট্রযন্ত্রের শুরু হইতেই আছেন। রাষ্ট্রের জন্য প্রশাসন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রশাসনবিহীন রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। কিন্তু এই প্রশাসনের অপব্যবহার একটি রাষ্ট্রের মাথা তুলিয়া দাঁড়াইবার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় অন্তরায়। শুধু প্রশাসন কেন, কোন খাতে এই টার্ডিগ্রেড সম্প্রদায় টিকিয়া নাই? শিক্ষায়, শাসনে, স্বায়ত্তশাসনে, ব্যবসায়—সর্বত্র ইহারা বিরাজমান। পূর্বে শিক্ষক-ছাত্র সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল আদর্শিক সম্পর্ক। এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে পরকীয়ার মতো ঘটনাও দেখিতে পাওয়া যায়। ধৈর্যচ্যুত হইয়া শিক্ষার্থীকে গুলি করিতেও দেখা যায়।

পরিবর্তনের কারণে অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে ভলিউম বাড়িয়াছে। সম্পদ বাড়িয়াছে, বাড়িয়াছে সরকারের অনুদানের পরিমাণ। কাবিখা, টাবিখার মতো প্রকল্পের বরাদ্দ বাড়িয়াছে। কিন্তু যেই ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য পূর্বে বরাদ্দ আত্মসাত্ করিতেন, সেই সদস্য পদধারীর বৈশিষ্ট্য এখনো তেমনি আছে—কেবল ব্যক্তি রিপ্লেসড হইয়াছেন। প্রশাসনে বসিয়া যিনি ছড়ি ঘুরাইয়া অর্থ উপার্জন করিতেন এবং নীতিনির্ধারকদের ভুলাইয়া রাখিতেন, তাহারা একই কাজ করিতেছেন। ইহার যেন কোনো ব্যত্যয় নাই। এইভাবে চলিতে পারে না কিংবা চলিতে দেওয়াও উচিত নহে। ইহাতে কাঠামোগত পরিবর্তন চোখে পড়িলেও জাতি অন্তঃসারশূন্যই হইয়া থাকে। বলিবার মতো ভালো কাজ যে নাই, তাহা নহে। বরং অনেক ইতিবাচক উদাহরণই আছে। কিন্তু মেরুদণ্ডে রোগ লইয়া সোজা হইয়া দাঁড়ানো অতি কষ্টের, ইহা যাহাদের বোঝা সবচাইতে বেশি প্রয়োজন, তাহাদেরকে বুঝিতে হইবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ঐ বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে ‘সিস্টেমেটিক’ অনিয়ম-দুর্নীতি চালাইয়া যাওয়া হইতে বিরত করিতেই হইবে। দুর্নীতি-অনিয়ম পৃথিবীর সকল দেশেই অল্পবিস্তর দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু তাহা মহামারির আকার ধারণ করিলে একটি দেশের অস্তিত্বই সংকটে পড়িতে পারে।