গণহত্যার স্বীকৃতির নতুন দ্বার উন্মোচন

গণহত্যা বিশ্বে বহুল পরিচিত শব্দ দুটির অর্থ হচ্ছে, বহু মানুষ হত্যা। একটি ভৌগোলিক অংশে একযুগে বা অপেক্ষাকৃত কম সময়ে বহুসংখ্যক মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা বোঝায়। জাতি, বর্ণ, ধর্ম বা নৃতত্ত্বীয় গোষ্ঠীভুক্ত মানুষকে মেরে ফেলা। গণহত্যা অস্বীকার করা গণহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। গণহত্যা শুধু রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হয় না; হিংসা, ক্ষমতার দাপট ও মানসিক বিকৃতি অন্যতম কারণ। বাঙালির স্বাধীনতার দাবিকে চিরতরে নির্মূল করতে অপারেশন সার্চলাইট নামে গণহত্যা চালায় পাকসেনারা।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনা খুলনার চুকন নগরে। এক প্লাটুন পাকসেনা চার ঘণ্টায় ব্রাশ ফায়ার করে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করে। ভদ্রা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ায় সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। এ গণহত্যায় শহিদদের বেশির ভাগ লোক চুক নগর ডুমুরিয়া বা খুলনার বাসিন্দা ছিলেন না। ঢাকার জিঞ্জিরায় ২ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। মিরপুর আলোকদি গ্রামে প্রায় ৩ হাজার মানুষকে বিহারি-রাজাকারদের সহায়তায় টুকরা টুকরা করে কুয়ায় লাশ ফেলে দেয়। মিরপুরের সিরনিল টেক্সস্থানে ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। মিরপুরে ২৩টি বধ্যভূমির মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমিতে। স্বাধীনতা পর পচা ও নষ্ট হওয়া ৬০ বস্তা মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়। দিনাজপুরে টিএনটি টর্চার সেলে প্রায় ১০ হাজার বাঙালিকে হত্যা পর টর্চার সেলের মেঝেতে তিন থেকে চার ইঞ্চি রক্ত পর্যন্ত জমাট বাঁধা পাওয়া গিয়েছিল। চট্টগ্রামের ১১৬টি বধ্যভূমির মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে দামপাড়া বধ্যভূমিতে। নীল ফামারি গুলাহাটে ৪৪৮ জন মাড়োয়ারিকে হত্যা করে বিহারি ও পাকসেনারা। সৈয়দপুরে ১৫০ জন বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে ১৮ দিন নির্যাতনের পর রংপুর সেনানিবাসের পশ্চিম পাশে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রামের লালখান বাজারে পাকিস্তানি ও বিহারি মিলে আড়াই হাজার লোককে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র বলেছে, তারা এ পর্যন্ত ২০টি জেলায় ৪ হাজার ৬০০ বধ্যভূমি, গণকবর ও নির্যাতনের কেন্দ্র চিহ্নিত করতে পেরেছেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ভয়াবহ গণহত্যা বড় প্রমাণ মিলেছে, পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী গওহর আইয়ুবের লেখা ‘স্লিমফসেস ইন্টু দ্য করিডর অফ পাওয়ার’ বইয়ে। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে লেখা সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। তাতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের এক বছর পর পাকিস্তানের রাওয়াল পিন্ডির এক সামরিক হাসপাতালে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক সামরিক অফিসারকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মানসিক রোগে আক্রান্ত এ অফিসারের যুদ্ধের কথা (১৯৭১) মনে হলে তার পুরো শরীর খিঁচুনি দিয়ে জ্বর উঠত, ঘুমাতে গেলে তার ঘুম ভেঙে যায়, কে যেন বলত, ‘তোকে ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশে, সেখানে থাকা হিন্দুদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। নয়তো তোর মুক্তি নাই।’ সেই সেনা কর্মকর্তা, সে নিজেই একা ১৪ হাজারের বেশি নিরীহ মানুষকে হত্যা, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ২০১২ সালে পাকিস্তানে মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা, ‘এস্টেনুর ইন মাই ওন কান্টি’ নামে অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি প্রেস প্রকাশিত আ্ত্তজীবনী বইতে বলেছেন, টিক্কা খান খাদিম রাজাকে অপারেশন সার্চ লাইটের পকিল্পনা চূড়ান্ত করতে মৌখিক নির্দেশ দেন এবং তিনি রাউ ফরমান আলিকে নিয়ে গণহত্যার চূড়ান্ত রূপরেখা করে অপারেশন চূড়ান্ত করেন।

২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ইতিমধ্যে গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে, জেনোসাইড ওয়াচ এবং লেমকিন ইন্সটিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন। সংস্থা দুটি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গণহত্যাকে স্বীকৃতি দানের আবেদন জানিয়েছে। স্বীকৃতি দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব জেনোসাইড ইস্কোলার্স। ২০১৭ সালের ১১ মার্চ মহান জাতীয় সংসদে, ২৫ মার্চকে জাতীয় গণহত্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ২৫ মার্চ রাতে সারা দেশে এক মিনিট প্রতীকী ব্ল্যাক আউট পালন করা হয়। পশ্চিমা দেশের মতো কানাডা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার হলোকাস্ট, রুয়ান্ডা, মিয়ানমার, গণহত্যাসহ আটটি গণহত্যাকে দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃতি দিলেও ৭১ সালের বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি এখনো দেয়নি।  কানাডার হাই কমিশনার ড. খলিলুর রহমান ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ম্যানিটোবা অঙ্গরাজ্যের রাজধানি ইউনিফেগে বঙ্গবন্ধু সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ এই কানাডার প্রচার শুরু করেন এবং কানাডিয়ান মিউজিয়াম ফর হিউম্যান রাইটস জাদুঘরের কিউরেটর আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধ গণহত্যার বিশেষজ্ঞ ড. জেরেমি ম্যালবিন ম্যারন ৭১-এর গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরার পর ঢাকা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় গণহত্যার প্রদর্শনীর আবেদন করেন।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ম্যানিডোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাডাম মূলার Canadian Museum for human rights কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ড. জেরেমি সেলভিন মেরনকে ঢাকায় প্রেরণ করলে, তিনি রাজধানীর সংঘটিত গণহত্যার স্থান পরিদর্শন ও শহিদদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনাসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। গণহত্যার স্থায়ী প্রদর্শন আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর হতে পারে। তারপর দেশটির সংসদ সদস্যরা হাউজ অব কমান্সে বিল উত্তাপন করে পাশ হলে গণহত্যার স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই স্বীকৃতি পেলেই বিশ্বে গণহত্যার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। শহিদদের আ্তাা শান্তি পাবে এবং ইতিহাসের দায়মুক্তি ঘটবে।

লেখক : কলামিস্ট ও সমাজবিশ্লেষক