আজ ২ এপ্রিল, কেরানীগঞ্জে গণহত্যা দিবস। বছর ঘুরে এ দিনটি ফিরে এলেই এলাকাবাসীর মধ্যে নামে শোকের ছায়া। গণহত্যা দিবস পালনে মুক্তিযুদ্ধে বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দিনের প্রথম প্রহরে স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবে সর্বস্তরের মানুষ। ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভোরের দিকে কেরানীগঞ্জের নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচারে মেশিনগান ও কামান থেকে গুলি ছুড়তে থাকে। কেরানীগঞ্জের দোলেশ্বর, মীরেরবাগ, কালীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, রবিশুর, নেকরোজবাগ, শুভাঢ্যা ও খোলামুড়া এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে ২০ থেকে ২৫টি গানশিপ থেকে মর্টার শেল ছুড়তে থাকে পাকিস্তানি সেনারা।
এলাকাবাসী জানায়, ফজরের নামাজ শেষ হতে না হতেই পাকিস্তানি হানাদাররা পাড়া-মহল্লায় ঢুকে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালায়। ভোররাত থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত এক দিনেই টানা আক্রমণ চালিয়ে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ প্রায় ১০ হাজার মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ঢাকা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা ৩-এর সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা মহসীন মন্টু জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে দেশ স্বাধীন করার জন্য তিনি ও খসরু (কামরুল আলম খান) পরবর্তীকালে (চিত্রনায়ক খসরু) ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ, দোহার, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও ধামরাইসহ প্রায় ৩ হাজার মুক্তিবাহিনীর সদস্য নিয়ে কেরানীগঞ্জের নেকরোজবাগ এলাকায় গেরিলা প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। এলাকার রাজাকাররা এ খবর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেয়। তখন তারা পূর্বপরিকল্পিতভাবে রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে আজকের এ দিনে কেরানীগঞ্জে নির্বিচার গণহত্যা চালায়। কেরানীগঞ্জের ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে জিঞ্জিরা, শুভাঢ্যা, তেঘুরিয়ায়, কোন্ডা, কালিন্দী, বাস্তা, শাক্তা ও কলাতিয়ার ৯টি ইউনিয়নের ৭৫টি গ্রামে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায় ও অগ্নিসংযোগ করা হয় । তার ভাষায়, মন্টু-খসরু গেরিলা বাহিনী কেরানীগঞ্জে পাকিস্তানি হানাদারদের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে।
এছাড়া রাজধানীর একাধিক সেনা ক্যাম্প ও বাংকার উড়িয়ে দিতে সক্ষম হন মুক্তিযোদ্ধারা। গণহত্যায় নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগ নারী-পুরুষ ছিলেন রাজধানী পুরান ঢাকার বাসিন্দা। ২৫ মার্চ কালরাত পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন ‘সার্চলাইট’ নামে রাজধানীর ঢাকা শহরে বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। আত্মরক্ষার জন্য রাজধানীর বাসিন্দারা প্রাণ বাঁচাতে কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নেয় অন্তত ২০ হাজার লোক। কেরানীগঞ্জে গণহত্যা দিবস পালনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে এলাকাবাসী। ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু জানান, দিবসটি পালনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, আওয়ামী লীগ কার্যালয়সহ এলাকার পাড়া-মহল্লায় কুরআনখানি, দোয়া মাহফিল ও গণভোজসহ আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম মামুন জানান, দিনটি পালনের জন্য আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন। তা ছাড়া বিএনপি, জাতীয় পার্টি, গণফোরাম, ঢাকা জেলা প্রেস ক্লাব, কেরানীগঞ্জ প্রেস ক্লাবসহ সামাজিক সংগঠনের নেতারা ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল ২ এপ্রিল হানাদারদের হাতে নৃশংস গণহত্যায় বীর শহিদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।