জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার বা নিজে নিজে কিছু করা স্বপ্ন অনেকেরই থাকে কিন্তু সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে অনেক সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ হয় না। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে চাই কঠোর পরিশ্রম, শক্ত মনোবল এবং সঠিক দিক নির্দেশনা। সফল উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব হতে হলে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যেতে হয় ঠিকই, কিন্তু জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য নিজেকে ঢেলে সাজাতে হয়। আসলে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য স্বপ্নের জাল বুনতে হয়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবুল কালাম যথার্থই বলেছেন, 'স্বপ্ন সেটা নয়, যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না'।
আসলে নিজেকে যে ভাবে দেখতে চাই, সে ভাবে গড়তে হয়। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধান মন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল বলেছেন, 'একজন হতাশাবাদী প্রতিটি সুযোগে অসুবিধা দেখেন; একজন আশাবাদী প্রতিটি অসুবিধায় সুযোগ দেখেন।' অর্থাৎ সফলতা পেতে গেলে আশাবাদী হতে হবে এবং বিভিন্ন বিপর্যয়ের মধ্যেও সুযোগ খুঁজতে। অনেকে তরুণ উদ্যোক্তা হবার বাসনা নিয়ে থাকে। তাদের চোখে আমি অনেক স্বপ্ন দেখতে পাই। যারা এই লেখা পরছে তারা হয়ত প্রতিষ্ঠিতদের কাছ থেকে কিছু না কিছু জানতে চায় যেটা তাদের জীবনে কোন না কোন ভাবে কাজে লাগতে পারে।
কিছু ইতিবাচক উদাহরণ আমি পাঠকদের সাথে শেয়ার করতে চাই যাতে সবাই অনুপ্রেরণা পায়। প্রথমে আমি নিজের ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠা পাবার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই, আমি ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে ২০০১ সালে স্নাতক একই বিভাগ থেকে ২০০৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করি। পড়াশোনা শেষ করে যখন চাকরির বাজারে প্রবেশ করি সেই সময়টাতে সরকারি চাকরি বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চাকরি অনেক বেশি লোভনীয় ছিল। ২০০৫ সালে জনপ্রিয় চাকরির বাইরে এসে ভাল কিছু চ্যালেঞ্জ নিয়ে আবাসন খাতে কর্মজীবন শুরু করি। অনাগত প্রজন্মের জন্য আরও ভালো সুযোগ তৈরি করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে রিয়েল এস্টেট শিল্পের জন্য এখনও নিরন্তর কাজ করে চলেছি।
তাছাড়া আমার কাছে মনে হয়েছিল এরকম একটা সেক্টরকে আমি বেছে নিই যে সেক্টরটা সেই সময়ে আসলে একটু পেছনের সারিতে ছিল। ভাল কিছু করে দেখানোর স্বপ্নে আমি বিভোর থেকে আন্তরিক ভাবে কাজ করেছি। লক্ষ্য পূরণে আমি ছিলাম অবিচল ফলে মাত্র ১৬ বছরে নির্বাহী থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হয়েছি দেশের অন্যতম আবাসন খাত রূপায়ন সিটির মেগা প্রকল্পে। এই যাত্রা সহজ ছিল না। অন্যদের যেখানে পদোন্নতি পেতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর সময় লাগে, আমি সেখানে অর্জন করেছি অতি অল্প সময়েই। এর পেছনে ছিল একান্ত নিষ্ঠা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার। এই ষোল বছরে রিয়েল এস্টেট সেক্টরকে এমন কোন বিভাগ নেই যেখানে আমি হাতে কলমে কাজ করিনি। আমি সবসময় একজন ভালো টিম প্লেয়ার হিসেবে কাজ করেছি। ২০২১ সালে রূপায়ণ সিটি উত্তরার দায়িত্ব নেয়ার আগে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের বিভিন্ন বিভাগ যেমন প্রশাসন, মানবসম্পদ, লজিস্টিকস, বিজ্ঞাপন , ব্যবসা উন্নয়ন, ব্র্যান্ড এবং মার্কেটিং, গ্রাহকসেবা, অপারেশনস, বিক্রয় এবং রাজস্ব, আবাসনের নকশা উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিভাগে কাজ করেছি।
আবাসন খাতে তরুণ উদ্যোক্তা হতে আগ্রহীদেরকে বলতে চাই জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে একই সাথে কাজের প্রতি একাগ্রতা ও আগ্রহ থাকতে হবে। অন্যের বাজে কথা না শুনে লক্ষ্য স্থীর রেখে এগিয়ে যেতে হবে। সাথে সাথে আপনি যেটা করবেন সেটার জন্য আপনাকে কৌশল অবলম্বন করতে হবে, এটাকে বলা হয় ‘ইন্সপায়ার অ্যাকশন’ (Inspire action) । এর মানে হলো আপনি যেটা করতে চান সেটা আপনাকে কল্পনা করা করার ক্ষমতা থাকতে হবে। আপনি প্রতিদিন অনুভব করবেন যে আপনি এটা হয়ে গেছেন। এই কল্পনাটা যখন আপনি খুব গতিশীল উপায় করতে পারবেন দেখবেন আপনি ওই জায়গাতে পৌঁছে গেছেন।
রিয়েল এস্টেট শিল্পের সর্বকনিষ্ঠ সিইও হিসেবে বলতে চাই, বর্তমান সময়ে আমাদের তরুণরা বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট সেক্টরে অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানির চেয়ে ভালো সুযোগ-সুবিধা অর্জন করতে পারছে। অর্থাৎ এই খাত সন্তোষজনক পেশায় পরিণত হয়েছে, নানা সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের পাঠ্যসূচিতে এই বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে। আমি বিশ্বাস করি, অদূর ভবিষ্যতে আবাসন শিল্প দেশে আরও বিকাশ লাভ করবে এবং তরুণদের এই শিল্পে উদ্যোগ নেয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। কিছু উদ্যোগ গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি এখানে।
বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ এর বেশি এবং এটি ক্রমবর্ধমান। মানুষ বর্তমানে কর্মসংস্থানের জন্য শহর মুখি হচ্ছে। বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই পরিবার গুলো নিজের আবাস্থল নিশ্চিত করার জন্য ফ্ল্যাট গুলোকেই পছন্দ করে থাকেন। শহর গুলোতে মানুষের বাড়তি চাপ অন্যদিকে জমি স্বল্পতা। তাই মানুষের আবাসস্থল নিশ্চিত করার জন্যে বহুতল ভবন নির্মান খুবই জনপ্রিয়।
আবাসন খাত দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্য অনুযায়ী, আবাসন খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে ১২-১৫ শতাংশ অবদান রাখছে। এই খাতের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় ২৬০টি সংযুক্ত খাত, যার মধ্যে রয়েছে নির্মাণ, ইস্পাত, সিমেন্ট, কংক্রিট, কাঠ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পরিবহন, যোগাযোগ ইত্যাদি। আবাসন খাতের প্রবৃদ্ধি এই সমস্ত খাতকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে আবাসন খাতে চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই চাহিদা পূরণের জন্য নতুন নতুন আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠছে। এর ফলে আবাসন খাতে ব্যবসার সম্ভাবনাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আবাসন খাত একটি বিনিয়োগযোগ্য এবং লাভজনক খাত। এই খাতে তরুন উদ্যোক্তাদের জন্যও রয়েছে ব্যাপক সুযোগ। তরুন উদ্যোক্তারা নিজেদের সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাধারার মাধ্যমে এই খাতে সফল হতে পারেন।
অনেক তরুণরাই আছেন যারা আবাসন খাতে বিনিয়োগ করে ব্যাবসা করতে চান কিন্তু প্রয়োজনীয় মূলধন না থাকার কারনে তারা হতাশ হয়ে পরেন। আমি আগেই বলেছি সাফল্য পেতে হলে আশাবাদি হতে হবে। সব কিছু শূন্য থেকেই শুরু করতে হয়। আবাসন খাতের ব্যবসা বৃদ্ধি পাবার কারণে, অন্যান্য যেসব ব্যবসা করলে সফল হবার সম্ভাবনা রয়েছে তা সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
নির্মাণ সামগ্রী: আবাসন নির্মাণের জন্য বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। এই নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধির ফলে এই ক্ষেত্রে ব্যবসা করার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্মাণ সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ইট, বালি, সুরকি, রং, দরজা-জানালা, গ্রিল (সিমেন্ট, টাইলস, রড) ইত্যাদি।
স্থাপত্য ও প্রকৌশল সেবা: আবাসন নির্মাণের জন্য স্থাপত্য ও প্রকৌশল সেবার প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন স্থাপত্য ও প্রকৌশল সেবা প্রদানকারী কোম্পানিগুলো প্রতিবছর নতুন নতুন প্রকল্পে কাজ করছে। আবাসন খাতের বৃদ্ধির ফলে স্থাপত্য ও প্রকৌশল সেবার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইন্টেরিয়র ডিজাইন: ক্রেতারা তাদের আবাসস্থলকে সুন্দর ও আরামদায়ক করে তুলতে চান। তাই আবাসন নির্মাণের পর এর অভ্যন্তরীণ নকশার জন্য ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তিগত সেবা: বর্তমান যুগে বহুতল ভবন নির্মাণের পর বিভিন্ন ধরনের আধুনিক প্রযুক্তিগত সেবা প্রয়োজন হয়। এই সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে লিফট, সিসি টিভি ক্যামেরা, ইন্টারকম, স্যাটালাইট ক্যাবল, ব্রডব্যান্ড ইত্যাদি। অন্যদিকে কর্পোরেট ভবন গুলোতে রয়েছে এস্কেলটর,কার্গো লিফট, অফিস গুলোর মেইন গেটে আইডি কার্ড পাঞ্চ মেশিন ডোর ইন্সটল ইত্যাদি।
সিকিউরিটি সার্ভিস: আবাসনের নিরাপত্তার জন্য সিকিউরিটি সার্ভিস প্রয়োজন। সিকিউরিটি সার্ভিস প্রধানকারী কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়তই নতুন লোকবল নিয়োগ দিচ্ছেন। তাই এই সব ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেবার অনেক সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশের আবাসন খাতে ব্যবসার সম্ভাবনা ব্যাপক। তরুণ উদ্যোক্তারা এই খাতে সফল হতে পারেন। তবে সফল ব্যবসা করতে হলে সঠিক ধারণা, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দক্ষতা থাকা জরুরি।
লেখক: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), রূপায়ন সিটি উত্তরা
mrahman.rcu@rupayangroup.com