বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রেল টিকিটের ক্ষেত্র বেশ পরিবর্তিত হয়েছে। স্বচ্ছতার জন্য আজকাল ফোন এবং কম্পিউটারের মাধ্যমেই বেশির ভাগ টিকিট বিক্রি হয়ে থাকে। এমনকি মার্চ ২০২৩ থেকে অনলাইনে টিকিট কিনতে জাতীয় পরিচয়পত্রও ব্যবহার হয়। টিকিট কালোবাজারি বন্ধ করতে তথা যিনি টিকেট কিনেছেন তিনিই ভ্রমণকারী কি না সেটি নিশ্চিত করতেই আসলে এই নিয়ম চালু করা হয়েছে। প্রথম দেখায় রেল টিকিট কেনার পুরো প্রক্রিয়াটি ত্রুটিহীন মনে হলেও, অবৈধ উপায়ে (বিশেষ করে কাউন্টার থেকে) টিকিট বিক্রি করা হয়ে থাকে। এই বেআইনি কাজ বন্ধ করতে প্রথমে রেল টিকিট কালোবাজারি কীভাবে হয়ে থাকে সেটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। তা না হলে মিডিয়ায় সাময়িক চমক দেখানোর উদ্দেশ্যে কিছু কালোবাজারিকে গ্রেফতার করা হলেও এতে কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না। এই আকস্মিক ধরপাকড়ের ঘটনাটি একেবারেই লোকদেখানো এবং এতে আজ পর্যন্ত টিকিট কালোবাজারি সমস্যার সমাধান হয়নি; হবেও না।
টিকিট কালোবাজারি দুইভাবে হয়ে থাকে—১. রেলওয়ে বুকিং এজেন্টদের মাধ্যমে, যারা যাত্রীদের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য তথ্যা অবৈধভাবে ব্যবহার করে সিস্টেম থেকে টিকিট কিনে থাকে। ২. ‘বৈধ’ টিকিট ক্রেতাদের মাধ্যমে, যারা বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে টিকিট কিনে থাকে।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে টিকিট কালোবাজারির কোনো অস্তিত্ব নেই, কারণ সেখানে যাত্রী ট্রেনে ওঠার আগে তাদের পরিচয়পত্র ঠিকভাবে যাচাই করে নেওয়া হয়। যদিও আমরা শুনি, বাংলাদেশ রেলে যাত্রীর টিকিট তার জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে যাচাই করা হয়; কিন্তু প্রচুর ট্রেন ভ্রমণ করা সত্ত্বেও, ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনোদিন এই যাচাই প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হইনি। এমনকি আমি প্রায় ৯/১০টি এমন দৃষ্টান্ত দেখেছি, যেখানে যাত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা হয়নি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে যথেষ্ট লোকবলের অভাবে এই যাচাই প্রক্রিয়া ঠিকভাবে কার্যকর করা যায় না। ট্রেন টিকিট কালোবাজারি রোধ করতে হলে এই সমস্যার অবশ্যই সমাধান করতে হবে।
অন্যদিকে ওটিপি ব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে বুকিং এজেন্টদের যাত্রীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অবৈধভাবে অগ্রিম রেল টিকিট বুকিং করা বন্ধ করা যায়। এই ওটিপি ব্যবস্থায় একটি কোড যাত্রীর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে পাঠানো হয় এবং এরপর ঐ ওটিপি কোডটি যাত্রীকে সিস্টেমে প্রদান করে টিকিট কিনতে হয়। যেহেতু একজন যাত্রীর সাধারণত সীমিত সংখ্যক ফোন নম্বরই থেকে থাকে, সেক্ষেত্রে এই ওটিপি পদ্ধতির মাধ্যমে টিকিট কালোবাজারি কমানো সম্ভব। তবে বর্তমানে শুধু অনলাইন টিকিটের জন্য ওটিপি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কাউন্টার থেকে রেল টিকিট কেনার প্রক্রিয়া (যেখান থেকে বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ ট্রেন টিকেট কিনে থাকেন) যতদিন না ওটিপি পদ্ধতির আওতায় আসবে ততদিন পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান হবে না।
আরেকটি বিষয় হলো বুকিং এজেন্টদের সিস্টেম অপব্যবহার করে টিকেট কালোবাজারি করা। এই অপকর্ম রোধ করতে টিকিট কাউন্টারগুলোতে কারা টিকেট প্রিন্ট করছে সেটি সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে আনা হলে টিকিট কালোবাজারি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। সাধারণত ট্রেন টিকিটে কোন কাউন্টার এজেন্ট কখন টিকিট ইস্যু করেছেন সে তথ্য দেওয়া থাকে। কাজেই সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, রেলসেবা অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা রেল স্টেশনের কাউন্টার ছাড়া টিকিট বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশ রেলওয়ের ভাষ্যমতে শুধুমাত্র তাদের বুকিং এজেন্টদের মাধ্যমেই টিকেট বুকিং করা যায়। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে যেসব বুকিং এজেন্ট অবৈধভাবে রেল টিকিট ইস্যু করে থাকে তাদের কেন চিহ্নিত করা যায় না?
সহজ.কম রেল টিকিটিংব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকে ট্রেন টিকিট আরো সহজলভ্য হয়েছে। যারা টিকিট পান তাদের চাইতে যারা টিকিট পান না তাদের (যারা সংখ্যায়ও বেশি) অভিযোগই স্বাভাবিকভাবে বেশি শোনা যায়। তারপরও, বিগত বছরে যেসব যাত্রী ঈদে ট্রেন ভ্রমণ করেছেন তাদের তথ্য বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকাশ করেছে। এতে করে রেল টিকিট যে স্বচ্ছতার সঙ্গে ইস্যু করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা প্রমাণিত হয়েছে এবং নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ রেলওয়ের এ ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে।
পরিশেষ, টিকিটিং পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করে কখনোই রেল টিকিট কালোবাজারি বন্ধ করা যাবে না। তাই আমাদের উচিত সমস্যার মূলে গিয়ে এর সমাধান খোঁজা। রেল টিকিটিং পরিসরে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।