আমার স্বাস্থ্য আমার অধিকার

স্বাস্থ্যের অধিকারকে স্বীকৃতি দিন

মানবাধিকারের মধ্যে রয়েছে জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার, দাসত্ব ও নিপীড়ন থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার, কাজ ও শিক্ষার অধিকার, সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকার অধিকার এবং আরো অনেক কিছু। তেমনি স্বাস্থ্যের অধিকারকেও স্বীকৃতি দিতে হবে। মানুষ হিসেবে আমাদের এবং আমরা যাদের যত্ন করি তাদের স্বাস্থ্য একটি দৈনন্দিন উদ্বেগ। সবার জন্য স্বাস্থ্যের অধিকারের অর্থ হলো— প্রত্যেকের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য এবং আর্থিক পরিষেবাগুলোতে আর্থিক প্রতিকূলতা ছাড়াই অ্যাক্সেস বা প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। এই কারণে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৪ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করেছে ‘আমার স্বাস্থ্য, আমার অধিকার’। আজ ৭ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হচ্ছে নানা অনুষ্ঠান ও আয়োজনের মাধ্যমে।

এই দিবসের উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব জুড়ে দরিদ্র এবং কম ভাগ্যবানদের স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যকর খাওয়া ও নিজেদের আরো ভালো যত্ন নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া। স্বাস্থ্যের অধিকার সবসময়ই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য একটি মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ক) অনুচ্ছেদ স্বাস্থ্যসেবাকে সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং এই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়। অনুচ্ছেদ ১৮(১) বলে যে খাদ্যের মান উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। এটি ক্রমবর্ধমানভাবে স্বীকৃত যে একটি সুস্থ জনসংখ্যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির মূল চালক। তাই স্বাস্থ্যই বাংলাদেশ সরকারের (জিওবি) অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

সুস্বাস্থ্য একটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কারণ জন্ম থেকেই ভালো স্বাস্থ্য আমাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। দুর্বল স্বাস্থ্য আমাদের স্কুলে যাওয়া বা কাজ করতে, পারিবারিক দায়িত্ব পালন বা সমাজে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে পারে। এই কারণে আমরা নিজেদের এবং আমাদের পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে অনেক সময় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকি। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য মানেই কেবল প্রতিরোধযোগ্য রোগ প্রতিরোধ করা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের একটি উপযুক্ত ও উপযোগী জীবন যাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা এবং আচরণ অর্জন করতে; এবং ব্যক্তিগত, সমাজ ও দেশের কল্যাণের স্বার্থে অবদান রাখতে সক্ষম করা। সহজ কথায়, যখন আমরা সুখের কথা বলি তখন আমরা সাধারণত স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করি। তাই  আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের বয়স, লিঙ্গ, স্বাস্থ্য এবং জাতি নির্বিশেষে, স্বাস্থ্য আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

অতএব, স্বাস্থ্য আমাদের সাধারণ দায়িত্বও বটে। রাষ্ট্রের একার পক্ষে এসব অর্জন করা সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্যতা, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ শহরাঞ্চলের চিকিত্সা সুবিধার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেও গ্রামীণ এলাকা আজও অবহেলিত। করোনা মহামারির সময় প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কতটা দুর্বল। বাংলাদেশের সংবিধান গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার। এসডিজি-৩ হলো জীবনকে সুস্থ করে তুলুন এবং প্রতিদিন সব মানুষের জন্য স্বাস্থ্যের প্রচার করুন। এর লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস করা; প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যুর সমাপ্তি; এইডস এবং অন্যান্য রোগের অবসান বা হ্রাস; সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজ অ্যাক্সেস, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা; ভ্যাকসিন গবেষণা এবং ওষুধের অ্যাক্সেস। এই মৌলিক মানবাধিকারগুলো ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (UHC) ছাড়া অর্জন করা যায় না।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার কতিপয় সুপারিশ রয়েছে। যেমন— ক. আমাদের উচিত সরকারের নীতি, কৌশল, অপারেশনাল প্ল্যান এবং অন্য পরিষেবাগুলো ইক্যুইটি, সমতা, দক্ষ এবং কার্যকর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিষেবাগুলোর নীতিগুলো মেনে চলছে তা নিশ্চিত করা। খ. উপযুক্ত বরাদ্দ এবং দক্ষ ব্যবহারের সঙ্গে জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ন্যায়সঙ্গত অ্যাক্সেসের জন্য টেকসই অর্থায়নের ব্যবস্থা করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের ক্ষেত্রে অগ্রগতি লাভ করা। গ. এই পরিষেবাগুলো সম্পর্কিত স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নীতিগুলো বিকাশ, বাস্তবায়ন ও প্রচার করা এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে স্বাস্থ্যসেবার সমান অ্যাক্সেস নিশ্চিত করা । ঘ. সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য সুবিধার জন্য একটি উন্নতমানের দক্ষ স্বাস্থ্য কর্মী বাহিনী গড়ে তোলা।

ঙ. প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য প্রণোদনা চালু করা। চ. কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবার মান উন্নত করা, উন্নত মা ও শিশু স্বাস্থ্যের জন্য এএনসি (ANC), ডেলিভারি ও পিএনসি (PNC) নিশ্চিত করা। ছ. সংক্রামক এবং অন্যান্য রোগ থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য প্রতিরোধমূলক  কর্মসূচি গ্রহণ করা। জ. আমাদের নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি এবং বজায় রাখা। এজন্য এনআইডি (NID) ভিত্তিক  সুসংগঠিত রেফারেল সিস্টেম প্রবর্তন করা ও ইলেকট্রনিক মেডিক্যাল রেকর্ড (EMR) রাখা। ঝ. বেসরকারি খাতের জন্য রেগুলেশন ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা। সর্বোপরি ঞ. বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকে মানবাধিকার হিসেবে প্রচার করা।  পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার জন্য ন্যায়সঙ্গত এবং সর্বজনীন প্রবেশাধিকার একটি জাতীয় নৈতিক দায়িত্ব। সুতরাং, স্বাস্থ্যের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্য খাতের নিয়ন্ত্রণের উন্নতি বাধ্যতামূলক।

লেখক : স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ এবং পেডিয়াট্রিক ইউরোলজিস্ট। মহাসচিব, বাংলাদেশ হেলথ

ইকোনমিস্ট ফোরাম