ভিডিওতে দেখা গেল প্রার্থীকে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা

নাটোরে জেলা নির্বাচন অফিসের সামনে থেকে সিংড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী দেলোয়ার হোসেনকে অপহরণ ও মারধরের ঘটনায় জড়িত অন্তত ১১ জনের পরিচয় জানা গেছে। ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। 

তাদের অধিকাংশই যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের নেতাকর্মী বলে স্থানীয় সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বরাতে জানিয়েছে দেশের একটি জাতীয় দৈনিক। তাদের মধ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী লুৎফুল হাবীবের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও গাড়িচালকও রয়েছেন। তবে পুলিশ ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় এখনো প্রকাশ করেনি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দেলোয়ার হোসেনকে অপহরণ করে যে গাড়িতে তোলা হয় সেটি তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী লুৎফর হাবীব রুবেলের। লুৎফুল হাবীব তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদের শ্যালক ও শেরকোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এছাড়া তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

দেলোয়ার হোসেনের পরিবার জানায়, সোমবার সকালে অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের জন্য ব্যাংকে জামানতের টাকা জমা দিতে বের হন দেলোয়ার। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন আলাউদ্দিন মুন্সি। তারা জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের সামনে পৌঁছালে সেখান থেকে একটি কালো মাইক্রোবাসে প্রথমে আলাউদ্দিনকে তুলে নেওয়া হয়। পরে দেলোয়ার হোসেন নির্বাচন অফিস থেকে বের হলে তাকেও মাইক্রোবাসে করে তুলে নেওয়া হয় এবং গাড়ির ভেতর তাকে মারধর করা হয়। 

পরে বিকেলে দেলোয়ারকে তার বাড়ির সামনে (সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের পারসাঐল গ্রাম) ফেলে চলে যায় মাইক্রোবাসটি। সেখান থেকে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে ও পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাত ২টার দিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়।

সিংড়ার দুজন সাংবাদিক ও একজন আওয়ামী লীগ নেতার বরাতে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিডিও ফুটেজে সিংড়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহন আলীকে (পাঞ্জাবি পরা) ঘটনার সময় জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের নিচতলায় সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। উপজেলার শেরকোল ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মজনু তালুকদারকে অপহরণ কাজে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সেখানে কলাপাতা রঙের গেঞ্জি পরা দেখা যায় কলম ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হোসেনকে (কাজল)। আকাশি রঙের গেঞ্জি পরে উপজেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক স্বপনের ভাগনে সরলকে ঘটনার সময় দেখা যায়। আর হলুদ রঙের পাঞ্জাবি পরেছিলেন স্থানীয় যুবলীগ কর্মী পিয়াস। 

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী লুৎফুল হাবীবের ব্যক্তিগত সহকারী জাহিদ হাসানকে সাদা গেঞ্জি ও জিনসের প্যান্ট পরে অপহরণে অংশ নিতে দেখা যায়। এ ছাড়া সেখানে ছিলেন শেরকোল ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি সেতু সরকার, সাধারণ সম্পাদক মজনু তালুকদার, সিংড়া মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস সাত্তার, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য আনোয়ার হোসেন, নাজমুল হক বাবু, শেরকোল ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সভাপতি সানোয়ার হোসেন। এ ছাড়া লুৎফুল হাবীবের গাড়িচালক সুজনকে (ইটালি গ্রামের নিতাইয়ের ছেলে) কালো গেঞ্জি পরে অপহরণের কাজে ব্যবহৃত কালো মাইক্রোবাসের চালকের আসনে বসতে দেখা যায়। পরে তিনিই মাইক্রোবাসটি চালিয়ে নিয়ে যান।

ওই ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়ে সংগঠনের জেলা কমিটির সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখব। আর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আরেক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী লুৎফুল হাবীবও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এদিকে দেলোয়ার হোসেনকে অপহরণ ও মারধরের ঘটনায় গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১২ টার দিকে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে নাটোর সদর থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগীর ভাই। আজ মঙ্গলবার সকালে অভিযান চালিয়ে এ মামলার দুই আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছেন সদর থানার ওসি মিজানুর রহমান। গ্রেপ্তাররা হলেন- সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা সুমন আহমেদ এবং একই উপজেলার শেরকোল ইউনিয়নের হারোবাড়িয়া এলাকার নাজমুল হক বাবু।

ওসি বলেন, রাতে দেলোয়ার হোসেনের ভাই অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তারও করেছে। পুলিশ এ ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।