ইতিহাস ঘড়ির কাঁটার মতো চক্রাকারে ঘোরে। সময়কে যেমন কোনো কিছু দিয়ে আটকে রাখা যায় না, ইতিহাসও তেমনি। নানা মত ও পথের ভুল ব্যাখ্যার আবরণে ইতিহাসের কিছু অধ্যায়ে সাময়িক স্থবিরতা হয়তো তৈরি করে রাখা যায়। কিন্তু ঠিক সময়ে এসে সত্যিটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জীবন রাঙায়, জাতিকে উজ্জীবিত করে আর রচনা করে ভবিষ্যতের ভিত্তি। একই সঙ্গে বর্তমানের মানুষকে মহাকালের গতিপথে সংযুক্ত করে নেয়। এটাই ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা। আমাদের বাঙালি তথা বাংলাদেশের ইতিহাসেও এমন অনেক দিন আছে, যা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আমাদের ভবিষ্যত্ পথ তৈরি করে দিয়েছে। তেমনই একটি ঐতিহাসিক দিন হচ্ছে ১৭ এপ্রিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আজকের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়েছিল, যা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার বা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত।
২৫ মার্চ ভয়াল কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচারে গণহত্যা এবং ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণার পর বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের কাছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় বাংলাদেশে সরকার গঠিত হবে তা অকল্পনীয় ছিল হানাদার পাকিস্তানিদের কাছে। অথচ এই অস্থায়ী সরকার গঠনের মধ্য দিয়েই বাঙালির সশস্ত্র স্বাধীনতার সংগ্রাম সত্যিকারের গতি পেয়েছিল।
ঐতিহাসিক এই ১৭ এপ্রিলের সঙ্গে আরো একটি দিন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো জড়িয়ে আছে—তা হলো ১০ এপ্রিল। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার এবং জারি করা হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। আর ১৭ এপ্রিল আম্রকাননে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করছিল। এই দিনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটি সম্পূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণাপূর্বক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় দেশব্যাপী বিক্ষিপ্তভাবে যে যুদ্ধ শুরু হয়, ১৭ এপ্রিল তা সংঘবদ্ধ রূপ লাভ করে।
এ প্রসঙ্গে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’তে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে সার্বভৌম গণ প্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম এবং তদ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ইতিপূর্বে ঘোষিত স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করিলাম এবং এতদ্বারা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, (ঘোষণাপত্রের নবম অনুচ্ছেদাংশ) এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রজাতন্ত্রের উপরাষ্ট্রপতি থাকিবেন এবং রাষ্ট্রপতি (এই ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু/সৈয়দ নজরুল) প্রজাতন্ত্রের সকল সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হইবেন।’ ১০ এপ্রিল যে ‘স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র’ (The Proclamation of Independence) গ্রহণ করা হয় এবং প্রবাসী বিপ্লবী সরকার গঠন করা হয়, তা ১৭ এপ্রিলে প্রকাশ্য ঘোষণা ও শপথ গ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা লাভ করে।
১০ ও ১৭ এপ্রিলের আগে স্বাধীনতাকামী মানুষ অসংগঠিত এবং অনেকটা বিশৃঙ্খলভাবেই দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসরদের মোকাবিলা করে যাচ্ছিল। মাত্র ১৫ দিনের মাথায় আমাদের জনপ্রতিনিধিগণ নিজেদের সংগঠিত করেন একক দায়িত্বে, যা দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধজয়ে সহায়তা করেছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুধু সশস্ত্রই ছিল না, নবগঠিত সরকারের অভ্যন্তরীণ বেসামরিক প্রশাসন, বৈদেশিক প্রচার-প্রচারণা, অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ, বিশ্ব রাষ্ট্রসমূহের সর্মথন আদায়, জাতিসংঘের অবিরাম প্রয়াস মুক্তিযুদ্ধকে ক্রমশ শক্তিশালী ও বিজয়কে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল।
বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সক্রিয় ও ইতিবাচক সর্মথনে, মার্কিনি ও চৈনিক সক্রিয় বিরোধিতা সত্ত্বেও আমরা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ ঘটিয়ে বিজয়ের পতাকা উড্ডীন করতে সক্ষম হই। এই সফলতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত তৈরি হয়েছিল ১০ ও ১৭ এপ্রিলের ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে।
তবে এ কথা সত্য, ১৭ এপ্রিলের ধারাবাহিকতায় পৌঁছাতে আমাদের পার হতে হয়েছে অনেক বন্ধুর পথ। নানা পথপরিক্রমা পেরিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতার পরিণতিই হচ্ছে ২৬ মার্চ। আর এই ২৬ মার্চের আনুষ্ঠানিক ও আইনগত রূপ হচ্ছে ১৭ এপ্রিল। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে ভিত্তি করে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে এম এ হান্নানের ঘোষণা, ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় মেজর জিয়ার ঘোষণা, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের যুদ্ধ সংগঠন, একই সময়ে ময়মনসিংহে মেজর সফিউল্লাহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মেজর খালেদ মোশাররফ, চুয়াডাঙ্গায় মেজর আবু ওসমান চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে বাঙালি সৈনিকদের এবং দেশব্যাপী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের যুদ্ধ সংগঠনের তত্পরতা উল্লেখযোগ্য। মোদ্দাকথা, ২৬ মার্চ থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ অসংগঠিতভাবে চলছিল।
এই যুদ্ধকে পূর্বাঞ্চলে সংগঠিত রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় ৪ এপ্রিল। এই দিনে কর্নেল ওসমানী ও লে. কর্নেল এম এ রব হবিগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমানায় অবস্থিত তেলিয়াপাড়ায় পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক করেন। এ বৈঠকে মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর কাজী নূরুজ্জামান, মেজর নূরুল ইসলাম, মেজর মমিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। তারা ওসমানীকে প্রধান এবং এম এ রবকে উপপ্রধান করে মুক্তি ফৌজ গঠন করেন। এখানে এ কথা বলা অসমীচীন হবে না যে, ইতিমধ্যে কালুরঘাটের ক্ষণস্থায়ী বেতারকেন্দ্রটি পাকিস্তানিদের দখলে চলে গেলেও মুক্তিকামী বাঙালি হতোদ্যম হয়ে পড়েনি। মাটি হাতছাড়া হলেও উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে কেউ বিচ্ছিন্ন হননি। যার যার অবস্থানে থেকেই তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সর্বজনাব তাজউদ্দিন আহম্মেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানসহ প্রায় সব এমএনএ ও এমপিএ ভারতে পৌঁছে নিজেদের একত্রিত করে ফেলেছেন এক জায়গায়। পৌঁছে গেছেন ছাত্র-যুব নেতৃবৃন্দও।
১৭ এপ্রিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এক সর্বাত্মক ও সংগঠিত রূপ লাভ করে। শুধু অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ নয়, শুরু হয় রাজনীতি, প্রচার ও কূটনৈতিক যুদ্ধ। সশস্ত্র যুদ্ধের চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রচারযুদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কোনোভাবেই কম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনি। এখানেই ১৭ এপ্রিল ১৯৭১-এ দিনটির ঐতিহাসিকতা। সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকে মুজিবনগর সরকার একটি দৃঢ় সাংগঠানিক রূপ দিয়েছিল। মুজিবনগর সরকার না হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আদৌ সফলতার মুখ দেখত কি না, তা বিবেচনার দাবি রাখে। বিবেচনার দাবি রাখে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকার বিষয়টিও। তারা পশ্চাত্পসরণ করলে মুক্তিযুদ্ধ কখনোই কী সংগঠিত রূপ নিত? আমরা মনে করি, ১৭ এপ্রিলের বিজয়ের পথ ধরেই জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা লাভ করে এবং পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছাড়িয়ে আনতে সক্ষম হই। তাই ১০ ও ১৭ এপ্রিল ঘিরে বাংলার মুক্তিসংগ্রামের যে ঘনঘটা, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। এপ্রিলের এই সব ঘটনাবলিকে ইতিহাসের বাস্তবতার নিরিখে বিচার করতে হবে।
মুজিবনগরের প্রথম বাংলাদেশ সরকার এবং তাজউদ্দিন-নজরুল-মনসুর আলী-কামারুজ্জামানের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি (খুনি) মোশতাকের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডকেও বিবেচনায় নিতে হবে। মোশতাকের নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র অথচ কুটচালে তত্পর গোষ্ঠীটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিপথগামী করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। ষড়যন্ত্রকারী মোশতাকের ষড়যন্ত্রকে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে গুরুত্ব না দেওয়ায় শান্তিকামী ভাবাদর্শ আমাদের সমাজকাঠামোয় বহালতবিয়তে রয়ে যায়। এমনকি এদের একটি অংশ এখনো সর্বোতভাবে বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি। জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা প্রশ্নে তাদের অনীহা, ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক অবস্থানের বিপরীতে ওদের অবস্থানই মোশতাকের ধারার ফল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও মুজিবাদর্শে দৃঢ় অবস্থানই স্বাধীনতাবিরোধী এই চক্রকে মোকাবিলা করতে সক্ষম।
রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রবিরোধীদের অবাধ তত্পরতার সুযোগ হাজার বছরের শৃঙ্খলভাঙ্গা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য কখনো সুখকর হতে পারে না। এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে সুদৃঢ় ও মজবুত করতে পারবে না। রাষ্ট্র জন্মের ৫৩ বছর অতিবাহনেও স্বাধীনতাবিরোধীদের অপতত্পরতাকে আদর্শিক ও রাষ্ট্রিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে আমাদের রাষ্ট্রদর্শনের ভবিষ্যত্ অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে। আমরা মনে করি, এ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকার বিষয়গুলো সিরিয়াসলি নিতে হবে। আর দেরি নয়, এখনই সময় এসব বিষয়ে ভাবার।
সামগ্রিক বিবেচনায় বলতে চাই, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মুজিবনগর দিবসকে খাটো করে দেখার প্রয়াস থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ইতিহাসের সঠিক পাঠ অপূর্ণ থেকে যাবে। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পাঠ হবে খণ্ডিত। কিন্তু ইতিহাস তো ইতিহাসই। যত চেষ্টাই অকালকুষ্মাণ্ডরা করুক না কেন, তারা সফল হতে পারবে না। কেননা, ইতিহাস কোনো কল্পকাহিনী নয়। বহু মানুষের শ্রম-ঘাম আর লড়াইয়ের ফসল ইতিহাস। আজকের ঐতিহাসিক এই দিনে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক :মাননীয় মন্ত্রী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, মুক্তিযোদ্ধা
এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রতিরোধযোদ্ধা