অসহ্য গরমে কাহিল হয়ে পড়েছে জীবন। তাপপ্রবাহের একটানা এমন অস্বাভাবিক ব্যাপ্তিকাল আগে কখনো দেখেনি বাংলাদেশ। এপ্রিলের সূচনাভাগ থেকে এত দীর্ঘ মেয়াদে তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার রেকর্ড নেই। কার্যত ইতিহাসের দীর্ঘতম তাপপ্রবাহের আবর্তে পড়েছে বাংলাদেশ। হিট স্ট্রোকে গতকাল পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত মানুষের মৃত্যুর যে রেকর্ড হয়েছে, তা অতীতে কোনো কালে হয়নি। গতকাল চতুর্থ বারের মতো বৃদ্ধি করা হয়েছে তিন দিনের হিট অ্যালার্ট। এর আগের গত ৩, ১৯ ও ২২ এপ্রিল তিন দিন করে ৯ দিন হিট অ্যালার্ট জারি ছিল। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহের তীব্রতা আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতিদিন বাড়বে। তারপর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বৃষ্টির সম্ভাবনা।
খুলনা বিভাগ যেন গনগনে আগুন: গতকাল যশোরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। সেখানে ‘অনুভূত’ তাপমাত্রা ছিল ৪৬ ডিগ্রি। চুয়াডাঙ্গায় গত ২৬ দিন ধরে মরুভূমির লু হাওয়ার মতো পরিস্থিতি। গতকাল চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ছিল ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খুলনায় ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ৪১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বাগেরহাটের মংলায় ৪০ ডিগ্রি, সাতক্ষীরায় ৪০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় তাপমাত্রা ওঠে ৩৯.১ ডিগ্রি। বৃষ্টির জন্য সারা দেশে ইসতিসকার বিশেষ নামাজ আদায় করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, এপ্রিলের বাকি দিনগুলোতেও তাপপ্রবাহে বিরতি আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। মে মাসের ৩-৪ তারিখ পর্যন্তও এভাবে অব্যাহত থাকতে পারে। অন্যদিকে কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, আগামী ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, এরপর একটি শক্তিশালী পশ্চিমা লঘু চাপের প্রভাবে মে মাসের ৩ তারিখ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশের বেশির ভাগ জেলার ওপর দিয়ে শক্তিশালী কালবৈশাখী, তীব্র বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি হতে পারে। তিনি আরো বলেন, পশ্চিমা লঘু চাপের প্রভাবে মে মাসের ৩ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী জেলাগুলো, মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জি ও আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মে মাসের ৫ তারিখের পর থেকে পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগ ও কিশোরগঞ্জের জেলার হাওর এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, একই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে ১০০-১৫০ মিলিমিটার এবং বরিশাল, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলোর ওপর ৫০-১০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। মে মাসের ৩ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে সবচেয়ে কম পরিমাণে বৃষ্টি হবে।
এবার এত তাপমাত্রা কেন: বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে এখন বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করছে। এর কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদরা জানান, বাংলাদেশের ঐ অঞ্চলের দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তর প্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যের অবস্থান। এসব প্রদেশের তাপমাত্রা অনেক বেশি। এসব জায়গায় বছরের এই সময়ে তাপমাত্রা ৪২ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, যেহেতু ঐগুলো উত্তপ্ত অঞ্চল, তাই ঐখানকার গরম বাতাস চুয়াডাঙ্গা, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং তা আমাদের তাপমাত্রাকে গরম করে দেয়।
নতুন করে ‘হিট অ্যালার্ট’: সারা দেশে আবার তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা বা ‘হিট অ্যালার্ট’ জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এটি আগামী তিন দিন অব্যাহত থাকবে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এই সতর্কবার্তা জারি করেছে আবহাওয়া অফিস। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বুলেটিনে বলা হয়, পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার জন্য তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা জারি করা হলো।
হিট স্ট্রোকে চার জনের মৃত্যু: শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে দায়িত্ব পালনকালে রুহুল আমিন নামে এক ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের মৃত্যু হয়েছে। রুহুল আমিন যশোরের বেনাপোল পৌরসভার শার্শার কোরবান আলীর ছেলে। গতকাল বৃহস্পতিবার শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজ্জাদ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের অধীন সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। অন্যদিকে আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, আনোয়ারায় রোশমিয়া জেবিন (১৬) নামের দশম শ্রেণির এক স্কুল শিক্ষার্থী হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। বুধবার রাতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় জেবিন মারা যায় বলে নিশ্চিত করেন তার স্বজন মঈনদ্দিন গফুর খোকন। নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, হিট স্ট্রোকে বেগমগঞ্জে এক স্কুলশিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। মৃত ঋতু সুলতানা (১৭) উপজেলার ছয়ানী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাদারি গ্রামের মো. ইসমাইলের মেয়ে। স্থানীয় ছয়ানী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন ঋতু। অন্যদিকে ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে হিট স্ট্রোকে ফাতেমা বেগম (৫৭) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার রাত ১১টায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।