পালটা প্রশ্ন করিলে উত্তর দিবে কে?

ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচন আসন্ন। ইহা লইয়া বৃহস্পতিবার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসিয়াছিলেন নির্বাচন কমিশন। ঐ বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের নিকট মাঠ প্রশাসনের পক্ষ হইতে, অর্থাত্ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররা মন্ত্রী-এমপিদের ভূমিকা লইয়া ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করিয়াছেন। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত গতকাল শুক্রবারের এক রিপোর্টে বলা হইয়াছে—তাহারা জানিতে চাহিয়াছেন, মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে কমিশন তাহাদের পক্ষে থাকিবে কি না। মাঠ কর্মকর্তাদের কেহ কেহ অভিযোগ করিয়াছেন, তাহাদের উপর চাপ রহিয়াছে। এহ্ বাহ্য! ‘এ কি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে!’ এই ধরনের অভিযোগের কথা শুনিলে সাধারণ দেশবাসী কি হাসিবে না? কারণ তাহারা ইতিপূর্বে পরিচালিত নির্বাচন দেখিয়া আসিতেছে। আমরাও এই মাঠ প্রশাসনের অধীনেই জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন দেখিয়া আসিতেছি। মাঠ প্রশাসন হইল নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। মাঠপর্যায়ের ইচ্ছা এবং সহযোগিতা ছাড়া কোনো দেশে কোনোভাবেই নির্বাচনকে অর্থবহ করা সম্ভব নহে। অভিযোগ রহিয়াছে, এই প্রশাসনই ‘সোনার হাতে সোনার অলংকারের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়াছেন বারংবার! বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থীর ভোটার-প্রতি ব্যয় ১০ টাকা অথবা মোট ব্যয় সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষ টাকা ধার্য করা হইয়াছিল। এই মাঠ প্রশাসনের সার্বিক দায়িত্বে যাহারা ছিলেন এবং এখনো রহিয়াছেন, তাহাদের চোখের সামনেই একজন প্রার্থী কত টাকা প্রকাশ্যে ব্যয় করিয়াছে—সেই কথা তাহারা সবচাইতে ভালো জানেন। শুধু কি তাহাই, কোথাও কোথাও একজন প্রার্থীর প্রতি ‘বিশেষ দুর্বলতা’র কারণে প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করা হইয়াছে, প্রতিপক্ষের কর্মীদের আটকাইয়া রাখিবার ‘সুবন্দোবস্ত’ করা হইয়াছে। এমনকি ঐ কাজে রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগকেও ব্যবহার করা হইয়াছে। তখন কেন আপনাদের কাছে কোনো কিছুকেই ‘উদ্বেগজনক’ বলিয়া মনে হয় নাই?

বর্তমান স্থানীয় নির্বাচনেও নির্বাচন কমিশন চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জন্য ব্যয়সীমা ২৫ লক্ষ টাকা ধার্য করিয়া দেওয়া হইয়াছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিকট প্রশ্ন, আপনাদের সম্মুখেই প্রকাশ্যে যে ব্যয় হইতেছে, তাহা কি আপনাদের অজানা? আপনারা তো ভিনগ্রহ কিংবা উত্তর মেরু হইতে এই দেশে নূতন আসেন নাই। আপনাদের অজানা তো কিছু নাই। একটু-আধটু অনিয়ম হইলে এক কথা ছিল, স্থানীয় নির্বাচনে দেখা যাইতেছে, কোনো কোনো ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া থাকেন। কিন্তু ইহার জন্য তাহাকে কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হইতে হয় নাই! কেহ কেহ নিজেদের কাকের মতো চালাক মনে করেন। কাক যেমন কোনো কিছু লুকাইবার সময় চক্ষু বন্ধ করিয়া ভাবে, সে চোখ বন্ধ করিয়া কিছু দেখিতেছে, অর্থাত্ পৃথিবী অন্ধ হইয়া গিয়াছে, পৃথিবীর কেহই কিছু দেখিতেছে না—তেমনি কেহ কেহ প্রকাশ্যে চক্ষু মুদিয়া এমন সব কাজ করিতেছে, যাহা সকলেই দেখিতেছে, কিন্তু ভাবখানা এই রকম, যেন কেহই কিছু দেখিতেছে না। 

নির্বাচন কমিশন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করিয়াছে পাশে থাকিবে বলিয়া। কমিশন ইহাও স্বীকার করিয়াছে যে চাপ থাকিবেই। কিন্তু হলফ করিয়া কি বলা যাইবে যে, আপনারা সর্বক্ষেত্রেই সমান করিয়া চাপ অনুভব করেন? দেশবাসী জানে, যেইখানে ‘আপস রফা’ হয়, সেইখানে আর কোনো চাপ অনুভূত হয় না। যেইখানে মহলবিশেষের সঙ্গে সমঝোতা হয়, সেইখানে আর চাপ থাকে না। এই ধরনের কৌশল করিয়া সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কেবল দেশের মানুষকেই তাহাদের ইচ্ছার প্রতিফলন হইতে বঞ্চিত করিতেছেন।