শিমুল শাহিন
সিলেবাসের বইগুলো আদৌ খুলে দেখা হয়নি, অথচ এদিকে ফাইনাল পরীক্ষার রুটিন দিয়ে দিয়েছে! পরীক্ষার খাতায় কী লিখব ভাবতেই ভয়ে গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে যাচ্ছে! বন্ধুদের কাছ থেকে একটা সাজেশন নিয়ে এসে আকারে যতটা শর্ট করা সম্ভব তা করলাম। তারপরও একগাদা প্রশ্ন দেখে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল যেন! এর আগের বর্ষের পরীক্ষাগুলোয় যে খুব একটা পড়ে পরীক্ষা দিয়েছি, তা নয়। কিন্তু অন্যান্যবার কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা ছাড়াই পরীক্ষা দিয়েছি, কারণ কোনো বিষয়ে খারাপ করলে পরেরবার মানোন্নয়ন করার সুযোগ থাকে। অথচ এবার তা হচ্ছে না, ফাইনাল ইয়ারে কোনো বিষয়ে পা হড়কালেই পুরো একটা বছর লসের সমূহ আশঙ্কা!
ফেসবুক, টুইটার, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা সব ত্যাগ করে রীতিমতো নিজেকে গৃহবন্দি করে ফেললাম! আমার এমন করুণ অবস্থায় আমার বাড়ির লোকজনদের একটুখানি সহানুভূতি আশা করেছিলাম। অথচ আমার এ অসময়ে সহানুভূতি দূরে থাক, উল্টো তাদের কাছ থেকে বিদ্রূপাত্মক হাসি আর নানাধরনের খোঁচা সহ্য করতে হলো! ‘হাতি গর্তে পড়লে টিকটিকি লাত্থি মারে’ প্রবাদটার যথার্থতা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করলাম এতদিনে!
পরীক্ষা পাসের দুশ্চিন্তায় আমার স্বাভাবিক জীবন থমকে গেছে অনেকটাই! চুল-দাড়ি কাটানো হয় না অনেকদিন! আয়নাতে নিজেকে দেখলে নিজেই চমকে উঠি, উশকো-খুশকো নিজেকে চিনতে পারি না এমন অবস্থা! সন্ধ্যাবেলায় বাসার পাশের টংয়ের দোকানটায় চা খেতে গেলে এলাকার লোকজন এমন দৃষ্টিতে তাকায় মনে হয় যেন ভূত দেখছে! পরিচিত অনেকে আমার এই অবস্থা দেখে ধরেই নিয়েছে আমি নিশ্চয়ই প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে দেবদাসের ভাব ধরেছি!
রজত ভাই আমাদের এলাকার বড় ভাই, বেশ রসিক মানুষও বটে! প্রায় সন্ধ্যায় বাসা থেকে নামতেই উনার সঙ্গে দেখা হয়! দেখা হতেই আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করেন, ‘কী খবর সজীব, রুমাল হারাইছে নাকি?’ আমি পরীক্ষার যন্ত্রণায় ডুবে থাকার কারণে কে কী বলল তা নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর মতো অবস্থা ছিল না! রজত ভাইয়ের প্রশ্নটাকেও তেমন গুরুত্ব দিইনি, মুচকি হেসে এড়িয়ে গেছি!
তবে হঠাত্ একদিন সন্ধ্যাবলায় দেখা হতেই একইভাবে আবারও জিজ্ঞেস করলেন, ‘সজীব, গামছা হারিয়েছে নাকি?’
এত দিন এড়িয়ে গেলেও রজত ভাইয়ের আজকের প্রশ্নটা মনের ভেতর কৌতূহলের জন্ম দিল! কৌতূহলের কারণ হলো এর আগে তিনি জিজ্ঞেস করতেন আমার ‘রুমাল’ হারিয়েছে কি না! কিন্তু আজ জিজ্ঞেস করলেন ‘গামছা’ হারিয়েছে কী না! কৌতূহলবশত রজত ভাইয়ের কাছে ঘটনাটা কী তা জানার জন্য ঠিক করলাম! আমতা আমতা করে বললাম, ‘ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’
বললেন, ‘হ্যাঁ, বল!’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা রজত ভাই, এতদিন জিজ্ঞেস করতেন রুমাল হারিয়েছে কি না, কিন্তু আজ বললেন গামছার কথা! আমার তো কিছু হারায়নি, রোজ এরকম প্রশ্নের করার কারণ কী? খুলে বলেন তো!’
রজত ভাই হাসলেন! তারপর বললেন, ‘শোন, এক কিপটে লোকের একবার একটা রুমাল হারিয়ে গেছিল। সে তো রুমাল হারানোর শোকে একদম ভেঙে পড়ল! হঠাত্ তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল! সে চিন্তা করে দেখল, কয়েক সপ্তাহ যদি দাড়ি না কাটে তবে যে টাকাটা সাশ্রয় হবে তা জমিয়ে রুমাল হারানোর ক্ষতিটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে! উপরন্তু সাশ্রয়ের টাকাটা দিয়ে সে চাইলে আরেকটা রুমাল কিনতে পারবে! যেমন ভাবনা তেমন কাজ, এরপর সে কয়েক সপ্তাহ দাড়ি কাটা বন্ধ করে দিল!’
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তো সেই কিপটের সাথে আমার কী?’
কিঞ্চিত্ হেসে বললেন, ‘তোমার মুখেও এমন খোঁচা খোঁচা দাড়ি দেখে ওই গল্পটার কথা মনে পড়ে! তোমার এমন অবস্থা দেখে ভাবলাম তোমারও রুমাল টুমাল হারিয়েছে নিশ্চয়!’
রজত ভাইয়ের এমন রসিকতায় আমি নিজেই হাসি থামিয়ে রাখতে পারলাম না! জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা বুঝলাম, কিন্তু রুমাল থেকে আজ হঠাত্ গামছায় চলে এলেন কেন?’
উনি হেসে উত্তর দিলেন, ‘মাস খানেক থেকেই তোমার এমন অবস্থা দেখছি! রুমাল হারালে তো এতদিনে টাকা উঠে যেত! তো এতদিন ধরে যেহেতু দাড়ি কাটছ না তাতে ভাবলাম তোমার রুমাল নয়, নিশ্চয়ই গামছা বা তোয়ালে হারিয়েছে!’
রজত ভাইয়ের এমন কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে হঠাত্ পরীক্ষার কথা মনে পড়ে গেল! মুখটা চিমসে করে বললাম, ‘ভাই, সামনে আরো কয়েক মাস দাড়ি কাটা হবে না! রুমাল-গামছা নয়, ধরে নেন কম্বল হারিয়েছে!’
রাজশাহী।