চট্টগ্রামে অকার্যকর ওষুধে মশা মরছে না

চট্টগ্রাম নগরীতে মশার রাজত্ব চলছে। দিনে রাতে সমানে চলছে মশার রাজত্ব। নগরজীবনকে অতিষ্ট করে তুলেছে মশা। চসিকের ছিটানো ওষুধে মশা আমলে নিচ্ছে না। অকার্যকর ওষুধ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অথচ মশা নিধনের নামে চসিক বছরে বিপুল অর্থ ব্যয় দেখাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন চসিকের মশা নিধনের ওষুধ পর্যাপ্ত কার্যকর নয়। তারা ভেষজ ওষুধ ব্যবহারে পরামর্শ দিয়েছেন। সামনে ডেঙ্গুর প্রদুর্ভাব নিয়েও জনমনে আশঙ্কা বেড়েছে।

বৃষ্টি হলে ডেঙ্গু মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। কিন্তু ডেঙ্গুর প্রজনন ক্ষেত্র চিহূিত করতে জরিপ ও প্রজনন ধ্বংসের  চসিকের বিশেষ কার্যক্রম নেই। বাজারের মশার কয়েল, স্প্রে কোনো কিছুইতে মশা থেকে নিস্তার মিলছে না। নগরবাসীর অভিযোগ এলাকায় চসিকের স্প্রেম্যানদের দেখা যায় না। অথচ হাতেকলমে মশার ওষুধ ছিটানোর নামে চসিক তাদের নানা কথা বলে বেড়াচ্ছে।

নগরীতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে। মশার প্রজনন বৃদ্ধির সমস্ত ক্ষেত্র নগর জুড়ে বিরাজমান। বাসাবাড়ির আঙ্গিনায়, পথেঘাটে খালি ডাবের খোসা, খালি প্লাস্টিকের বোতল, খালি ড্রাম, যত্রতত্র পলিথিন পড়ে রয়েছে। নগরীতে বিভিন্ন বাসাবাড়ির ছাদ বাগানে প্লাস্টিকের খালি ড্রাম রাখা হয়েছে। বিশেষ করে অভিজাত এলাকায় ছাদবাগান ব্যাপকতা বেড়েছে। ফলে এসব স্থানে আগাম ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রচারণা, প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা নিয়ে চসিকের কোনো কর্মতত্পরতা দেখা যাচ্ছে না। নগরীর বিভিন্ন স্থানে খাল, নালায় ময়লা-আবর্জনায় ভর্তি রয়েছে। জলবদ্ধতা প্রকল্পের কাজের কারণে খালের বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এতে অনেক খালে পানি জমে রয়েছে। জমাটবদ্ধ পানিতে ভাসমান উদ্ভিদ জেগে উঠেছে। এসব ভাসমান উদ্ভিদ পুরুষ মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৫ কোটি টাকা। বিশেষ বরাদ্দের জন্য দাবি জানানো হলেও বরাদ্দ মেলেনি। এত অল্প বরাদ্দ দিয়ে নগরীতে মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব নয়। কয়েক মাস আগে চসিকের পরিচ্ছন্নকা বিভাগ কিছু ওষুধ সংগ্রহ করেছে। তার মধ্যে রয়েছে এলার্ডিসাইট সাড়ে ৫ হাজার লিটার, কালো তেল ১৬ হাজার লিটার, লার্ভিসাইট ৩ হাজার লিটার। লার্ভিসাইটের সঙ্গে নির্ধারিত পরিমাণে পানিমিশ্রণ করে ছিটানো হয়। কিন্তু এসব ওষুধ মশা নিধনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় চসিক মশা নিধনে ব্যবহূত ওষুধ ক্রয়ের আগে ঢাকায় আইইডিসিআরে মান পরীক্ষা করতে হয়। ওষুধ কেনার আগে বোতলে করে নমুনার মান যাছাইয়ের জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়। এতে ওষুধের ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ কার্যকারিতা থাকলে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু চসিকের ক্রয় করা এসব ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে পরিচ্ছন্নতা বিভাগের অনেকের প্রশ্ন তুরেছেন। মশার প্রজনন ধ্বংসে কার্যকর হচ্ছে না।

চসিকের মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনায় ফগার মেশিন রয়েছে ১৫০টি, স্প্রে মেশিন রয়েছে প্রায় ২২০টি আর পাওয়ার স্প্রে মেশিন রয়েছে ছয়টি। পাওয়ার স্প্রে মেশিনগুলো নিয়ে পাইপ লাইনের মাধ্যমে অনেক দূরে ওষুধ ছিটানো যায়।

সম্প্রতি চবির গবেষক দলের আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেলের নেতৃত্বে গবেষণা করা হয়। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদ সংগ্রহ করে এর পাতা, মূল ও কাণ্ড আলাদা করি। সেগুলো থেকে বিশুদ্ধ নির্যাস সংগ্রহ করা হয়। সেই রস জীবিত লার্ভার ওপর ওয়ান-ড্রপ, টু-ড্রপ, থ্রি-ড্রপ এভাবে প্রয়োগ করে পর্যবেক্ষণ করি। এ ছাড়া পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। সেখানে ইথানল-মিথানলসহ আরো কিছু রাসায়নিক মিশিয়ে সেগুলো লার্ভার ওপর প্রয়োগ করা হয়। এরপর ২৪ ঘণ্টা ধরে সেগুলো রেখে দেওয়া হয়। উভয় পরীক্ষার পর আমরা দেখতে পেয়েছি, লার্ভা দ্রুত মারা যাচ্ছে, সেটা আমরা পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখি। ১৫ ধরনের উদ্ভিদের নির্যাস আমরা পেয়েছি, যেগুলো ব্যবহারে পাঁচ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে লার্ভা মারা যাচ্ছে। আমরা এই ১৫ প্রজাতির উদ্ভিদকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। ঔষধি উদ্ভিদ প্রয়োগের মাধ্যমে লার্ভা নিধন করা হলে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি হবে না।’