বাবার অনিচ্ছা, নানুর সহযোগিতায় ক্রিকেটার হয়েছেন তানভীর

টাইগার শিবিরে গেল কয়েক বছর ধরে বাঁহাতি অফ স্পিনার বললেই নাম আসতো নাসুম আহমেদ, না হলে তাইজুল আহমেদের। তবে আসন্ন বিশ্বকাপে টাইগার স্কোয়াডে জায়গা পাননি তাদের কেউই। ঐ জায়গায় টাইগার নির্বাচকরা একপ্রকারের বাজি ধরেই স্কোয়াডে সুযোগ দিয়েছেন স্পিনার তানভীর ইসলামকে। এই স্পিনারের লাল-সবুজদের হয়ে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে আন্তর্জাতিক অভিষেক গেল বছর হলেও এখন পর্যন্ত তিনি খেলেছেন মাত্র চারটি ম্যাচে। আর সেসব ম্যাচে তার অর্জনও বলার আহামরি নয়। তবে চলতি বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত হওয়া বিপিএলে তিনি ছিলেন বল হাতে দুর্দান্ত। এরপর ডিপিএলেও বেশ ভালোই পারফরম্যান্স করেছিলেন আর তাতেই প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন।

দলের সঙ্গে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে তানভীর। তবে দেশ ছাড়ার আগে ভিডিও বার্তায় কথা বলে গেছেন তিনি। সেটি গতকাল প্রকাশ করেছে বিসিবি। সেখানেই তানভীর শুনিয়েছেন তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পথচলার গল্প। বলেন, ‘একদম ছোটোবেলা থেকেই আমি নানুর কাছে বড় হয়েছি। আমার মা সরকারি চাকরি করত, বাবাও ঢাকায় চাকরি করত তাই তাদের সঙ্গে থাকা হতো না। নানুও সরকারি চাকরি করত। কিন্তু মাসশেষে আমার নানুর কাছে একটা আবদার থাকত, ব্যাট-বল স্টাম্পসহ কিনে দিতে হবে। ছোটবেলায় বড়দের সঙ্গে অনেক খেলেছি। কারণ আমার সব কিছু (বল-ব্যাট-স্ট্যাম্প) ছিল এবং তারা আমাকে নিত অংশগ্রহণের জন্য।’

তানভীর এসএসসি পরীক্ষার পর ক্রিকেটার হওয়ার বিষয়টি বাসায় জানান। সে সময় এই পেশার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়ায় তার বাবা না করেন দেন। তবে তার নানুর কথায় পরে সে সম্মতি দেয়, যদিও সময়সীমা বেঁধে। যদি ফল না আসে দুই বছরে, তাহলে ক্রিকেট ছেড়ে ফিরতে হতো তানভীরের। এ নিয়ে বলেন, ‘বরিশাল বুলস নামে বিপিএলে একটি দল হয়েছিল, সেখানে লারা নামের একজন দলের সহকারী ছিলেন আমার এলাকার। আমরা সবাই জানতাম তিনি একজন খেলোয়াড়। তিনি আমাকে ঢাকা এসে কোনো একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার জন্য বলেন। কিন্তু আমার আব্বু রাজি ছিল না। তিনি বলেছেন, না, তোমার ক্রিকেটে যাওয়ার দরকার নেই। এটা অনিশ্চিত একটা জিনিস। এটার সুফলটা আসবে দেরিতে, না আসার সম্ভাবনা বেশি। সে সময় আমার আব্বু আমাকে চারটি ভবিষ্যতের মধ্যে ইচ্ছেমতো একটি বেছে নিতে বলেছিল। প্যারামেডিক্যাল, জেনারেল, ডেন্টাল, না হলে পুলিশ—এসব লাইনে পড়াশোনা করার অর্থ, যেন আমি মোটামোটিভাবে স্বচ্ছন্দে জীবন ধারণ করতে পারি। তখন নানু আব্বুকে জোর দিয়েই ক্রিকেটের বিষয়টা বলেছিল। পরে আব্বু তার কথা শুনে আমাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। সে সময় আব্বু আমাকে দুই-এক বছর সময় দিয়ে বলেন, এখানে কিছু না হলে আবার এই পেশায় ফিরে আসতে হবে।’

এদিকে তানভীর ঢাকায় এলেও সহযোগিতা পায়নি লারার। পরে তার বাবাই নিজে নিয়ে যান বিভিন্ন একাডেমিতে। এরপর সিসিএস নামে একটি একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন। পরবর্তীকালে সেখান থেকেই তৃতীয় বিভাগের একটি দলে সাত ম্যাচ খেলেছিলেন তানভীর। ক্রিকেটার হিসেবে যাত্রা শুরু তার সেখান থেকেই। এ বিষয় জানিয়ে বলেন, ‘একদিন আব্বু বলেন, চল আবাহনীর দিকে যাই, ওটা অনেক বড় ক্লাব। আবাহনীর মাঠে গিয়ে দেখলাম, অনেকগুলো একাডেমি, পরে আব্বু প্রতিটি একাডেমিতে গিয়ে সপ্তাহে সাত দিনের অনুশীলন করানো হয় দেখে সিসিএস নামের একটি একাডেমিতে ভর্তি করান। আব্বু বলেছিলেন, তুই তো কিছুই পারিস না, জানিস না। তাই তোর প্রতিদিনই অনুশীলন করা উচিত। ভর্তি হওয়র তিন-চার মাসের মধ্যেই রায়েরবাজার প্রগতিতে একটি থার্ড ডিভিশন টিমে সাত ম্যাচ খেলি। পরে ওনারা আমাকে টাকা নেওয়ার কথা বললে আমি নিতে অস্বীকার করি। কারণ আমি জানতাম না যে, খেললে টাকা দেয় বা পারিশ্রমিক দেয়, তা নিতে হয়।’

তবে তৃতীয় বিভাগে খেলে মন ভরেনি তানভীরের। তিনি ঠিক করেন ফাস্ট ডিভিশনের ঢাকা লিগে খেলার। যেমন চিন্তা তেমনি কাজ, যোগ দেন খেলাঘর ক্লাবে। তবে সুযোগ পাচ্ছিলেন না ক্লাবটির দলে। আর যখনি সুযোগ পান সেটাই কাজে লাগিয়ে করে ফেলেন বাজিমাত। পরবর্তীকালে নজরে পড়ে নাফিস ইকবাল ও সে সময়কার বিপিএলের দল খুলনা টাইটান্সের কোচের। এর পরই বদলে যায় তানভীরের ক্রিকেট ক্যারিয়ার। এ নিয়ে বলেন, ‘খেলাঘরের তিন ডিভিশনেই দল আছে। ঢাকা রয়েল নামে থার্ড ডিভিশনে তাদের একটা দল ছিল। ঐ দলেই আমি নিশ্চিত করি। কিন্তু খেলাটা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় ফাস্ট ডিভিশনের খেলা। সেবার প্রথমে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হয়েছিল। সে সময় খেলাঘরের ফাস্ট ডিভিশনের দলে দুটি বাঁহাতি স্পিনার ছিল আর তারা খুব বাজে করছিল। পরবর্তীকালে আমাকে তাদের জায়গায় সুযোগ দেওয়া হয়। বিকেএসপিতে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ হয়, ঐখানে আমি ভালো করেছিলাম। পরদিনই রেজিস্ট্রেশন করে থার্ড থেকে ফাস্ট ডিভিশনে চলে আসি। ঐবার আমি আট-নয় ম্যাচ খেলেছিলাম এবং অনেক ভালো করেছিলাম। ২৭ উইকেট পেয়েছিলাম। পরের মৌসুমে আবার ফাস্ট ডিভিশনের দলে ছিলাম। সেবার আরো ভালো করি। একটা উইকেট বেশি পাই। ঐ মৌসুমেই আমাদের দল প্রিমিয়ার লিগ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। সেখানে নাফিস ইকবাল ভাই আমাদের ম্যানেজার হন। প্রিমিয়ার লিগে ৯ ম্যাচে ২৮ উইকেট পাই। সে সময় নাফিস ভাই আমাকে বলেন, খুলনা টাইটান্সের (বিপিএলের দল) কোচ এনাম স্যার তোকে পছন্দ করেছে, তো তুই ফ্রাঞ্চাইজিটিতে খেলিস। জবাবে আমি বলি, ঠিক আছে ভাই। তখনো কীভাবে দলের সঙ্গে টাকা-পয়সা নিয়ে আলাপ করতে হয়, আমি বুঝি না, নাফিস ভাই বলে, আমি সব কিছু করব। সেবারই আমি প্রথম বিপিএল খেলি, একটা ম্যাচে সুযোগ পেয়েছিলাম। তারপর এতদূর আসা।’