ইন্দ্রমোহন সুইটসের খতিয়ান!

আহসান জোবায়ের

 

কথায় আছে ‘মিঠার লোভে এঁটে চাটে’। হ্যাঁ, মিষ্টি প্রায় সকলেই কমবেশি পছন্দ করেন। আর দেশের বিভিন্ন এলাকা ভিন্ন ভিন্ন খাবারের জন্য বিখ্যাত। কোনো শহরের মিষ্টি তো কোনো শহরের দই, খই, চমচম, আবার কোনো জায়গার কাঁচাগোলা! আর এই খাবারগুলোরও রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস। দেশের প্রায় সব স্থানেই চোখে পড়ে মিস্টির দোকান। তেমনই খুলনা শহরের বড়বাজার রোডের প্রবেশমুখে চোখে পড়বে হলুদরঙা পুরোনো একটি ঘরের দরজার ওপরে কালোর মাঝে সাদা রঙে লেখা ইন্দ্রমোহন সুইটস। সরু দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখতে পাবেন শ্যাওলা জমেছে ভেতরের দেয়ালে। দেয়ালের কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে।

ঐতিহ্যবাহী ইন্দ্রমোহন সুইটসের প্রতিষ্ঠাতার নাম ইন্দ্রমোহন দে। ১৯৭২ সালে তিনি  ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দোকানের হাল নিজেই ধরে রেখেছিলেন। পরে ছেলে বেনীমাধব গদিতে গিয়ে বসেন। এরপর চালান তাঁর নাতি। ইন্দ্রমোহনের নাতি মানে বেনীমাধবের ছেলে। নাম সঞ্জয় দে। তবে কালের বিবর্তনে আর নগরায়ণের ছোবলে এখন বন্ধ হয়ে গেছে শতবর্ষের পুরোনো খুলনার ঐতিহ্যবাহী এই ইন্দ্রমোহন সুইটস। প্রতিষ্ঠানটির আগের ভবনটি ভেঙে সেখানে নতুন ভবন করবে মালিকপক্ষ। এ জন্য ১৩০ বছরের পুরোনো ঠিকানা গুটিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।

প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের আগ পর্যন্ত সেখানে কলাপাতায় মিষ্টি

পরিবেশন করা হতো। ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ ও মিষ্টি বিতরণের পুরোনো রেওয়াজ, সব মিলিয়ে দোকানটি খুলনার মানুষের কাছে অন্যরকম জনপ্রিয় ছিল। দেশি-বিদেশি পর্যটক ও রাষ্ট্রীয় অতিথিরা খুলনায় এলে এই মিষ্টি পরিবেশন করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতসহ অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তি ইন্দ্রমোহনের জরাজীর্ণ দোকানে গিয়ে মিষ্টি খেয়েছেন। ইন্দ্রমোহনের মিস্টির সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও ছড়িয়ে পড়েছে আরো আগে।

মিষ্টি তৈরির নিমিত্তে প্রতিদিন আশেপাশের এলাকার ঘোষদের কাছ থেকে গরুর খাঁটি দুধ সংগ্রহ করে সেখান থেকে ছানা তৈরি করা হতো। দুধ থেকে পাওয়া ছানা দিয়ে পানতুয়া, রসগোল্লা ও সন্দেশ বানানো হতো। প্রতিদিন পানতুয়া, রসগোল্লা ও সন্দেশ তৈরি করতে ব্যবহূত হতো ৫০ থেকে ৬০ কেজি ছানা। পানতুয়া, রসগোল্লা মাঝে আটা, সুজি ব্যবহার করা হয় না। শুধু বেকিং পাউডার, ডিম ব্যবহার করা হয়। এখনকার পানতুয়া ছিল একেবারেই নরম। একবার কেউ বানানো পানতুয়া খেলে আরেকবার তাঁকে খেতেই হবে এমন রেওয়াজ ছিল। পানতুয়া, রসগোল্লার পাশাপাশি মজাদার সন্দেশ তৈরি করা হতো, যার ছিল অতুলনীয় স্বাদ।

ইন্দ্রমোহন সুইটসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য গত ৫০ বছর সেখানে একই মানের এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ মিষ্টি তৈরি হতো। বিকেলে তৈরি মিষ্টি সন্ধ্যা ৭টার আগেই সব বিক্রি হয়ে যেত। মিস্টির চাহিদা বাড়লেও কখনো তাঁরা উত্পাদন বাড়ায়নি। পরিবেশও বদলায়নি। প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে ঢুকে মনে হতো এখনো ব্রিটিশ আমলে পড়ে আছেন এখনকার মানুষ। পাঁচ রকমের সুস্বাদু মিষ্টি ইন্দ্রমোহনের বিশেষত্ব। সংখ্যাটি শুরুতেও এটাই ছিল। আর বাড়েনি তারপর। বাজারের সঙ্গে পাল্লা দেয়নি ইন্দ্রমোহন, বরং ধরে রেখেছিল গুণ ও মান। আরেকটি ব্যাপারও খেয়াল করার মতো যে, কেজি দরে মিষ্টি হতো না এখানে। পিস হিসেবে বিক্রি হতো। ইন্দমোহনের এই পিস হিসেবে বিক্রি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বন্ধের আগ পর্যন্ত চলেছে। বংশ পরম্পরায় ইন্দ্রমোহন তাঁদের ঐতিহ্য লালনে কার্পণ্য করেনি।

ইন্দ্রমোহনের ভেতরে টেবিল মোটে একটি। বসার জায়গা বলতে টেবিলের দু-ধারে দুটি টুল। প্লেট আর স্পুন চলে না ইন্দ্রমোহনে। কলাপাতায় দেওয়া মিষ্টি খেতে হতো হাত দিয়ে। চাইলেও চামচ পাবেন কি-না সন্দেহ। ইন্দ্রমোহনের নাতি সঞ্জয় বলেন, ‘বাবার কাছে শুনেছি, শুরু থেকেই কলাপাতায় দেওয়ার চল। এখানে যাঁরা আসতেন তাঁরা এতদিনে ব্যাপারটি জেনে গিয়েছিলেন। যুগের বদল হলেও আমরা নিয়ম বদল করিনি কখনো। বলতে পারেন, পরিবারের ঐতিহ্য রক্ষা করেছি।’ রসগোল্লা, দানাদার, পানতুয়া, চমচম ও সন্দেশ ৫ পদের মিষ্টি পাওয়া যেত ইন্দ্রমোহনে। লোকে বলে, যাঁরা মিষ্টি আদৌ পছন্দ করেন না তাঁরাও ইন্দ্রমোহনের চার-পাঁচটি মিষ্টি খেয়ে নিতে পারতেন। একবার যে এর স্বাদ পেয়েছেন সে ভোলেননি কখনো। একটি রসগোল্লার দাম আকারভেদে ১০ থেকে ২০ টাকা। দানাদার, পানতুয়া, চমচম প্রতিটি ১০ টাকা। তবে এখানে সন্দেশ বিক্রি হতো কেজি দরে। ১ কেজি সন্দেশের দাম ছিল ৪০০ টাকা। সঞ্জয় দে বলেন, ‘আমাদের এখানে ভেজাল পেত না কেউ। খাঁটি দুধ আর মাপও সঠিক রেখে ব্যবসা চালাতাম। তাই বাজারের তুলনায় একটু বেশি দাম ছিল।’

ইন্দ্রমোহনের এই মিষ্টি তৈরির কারিগর ছিলেন ৩ জন। ধীরেন, কমল সিং ও কমল চৌধুরী। ৩ জনই দোকানের পুরোনো কারিগর। তবে দোকান বন্ধ হয়ে তাঁরা বিপাকে পড়েছেন বলে জানান। ধীরেন আছেন ১৯৭৩ সাল থেকে। তিনি বলেন, ‘ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে মানুষ আমাদের মিষ্টি খেতে আসতেন। খুব ভালো লাগতো যে, সারাদেশের মানুষ আমাদের প্রশংসা করতেন।’ কমল সিং কাজ করেন ১৯৮১ সাল থেকে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভেজাল দিতাম না। মানুষ তাই খেয়ে আরাম পেতেন।’ তাঁদের তুলনায় কমল চৌধুরী ইন্দ্রমোহনের নবীন কারিগর। ভিড় এই দোকানে সারাদিনই থাকতো। অনেকে এমনকি বিদেশেও আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠাতো এই মিস্টি। পূজা আর ঈদের মতো অনুষ্ঠানে বেশি চাপ হতো। সঞ্জয় বলেন, ‘আমি মান ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে গেছি আজীবন। নিয়ম বা স্থান বদলের কোনো পরিকল্পনা ছিল না আমাদের।’

ইন্দ্রমোহনের ছেলে বেণীমাধব দে জানান, প্রথমে গোলের ঘর, এরপর টিনের ঘর এবং সব শেষে দোতলা দালানে তাঁরা ১৩০ বছর ধরে ব্যবসা করেছেন। তবে জমি নিয়ে মালিকের সঙ্গে  মামলার কারণে ১৩০ বছরের পুরোনো ঠিকানা গুটিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয়রা জানান, ১৮৯০ সালে ভৈরব নদের তীরে খুলনা বড়বাজার এলাকার কালিবাড়ি ঘাটে ইন্দ্রমোহন দে’র হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ইন্দ্রমোহন সুইটস। ধীরে ধীরে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এই ইন্দ্রমোহন সুইটসকে কেন্দ্র করে আজকের হেলাতলা মোড়ের গোড়াপত্তন হয়। আশেপাশের পরিবেশের পরিবর্তন ঘটলেও সেই আগের মতোই ছোট্ট ঘরে ব্যবসা ধরে রেখেছিলেন ইন্দ্রমোহনের ছেলে ও নাতি।